দেলোয়ারার পা ছেড়ে হামিদা ততক্ষণে সোজা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোন ফাঁকে চোখের কোল বেয়ে নেমেছে কান্না। মুখে আঁচল চেপে নিঃশব্দে কাঁদছে সে।
হামিদার দিকে তাকিয়ে গভীর কষ্টের এক কান্না দবিরেরও বুক ঠেলে উঠল। সেই কান্না দমিয়ে ধরা গলায় সে বলল, আপনেরা যা কইবেন মাওলানা সাবে অহন হেইডাঐ হোনবো। আপনের বইনপোয় মজজিদ করতাছে গেরামে, মাওলানা সাবে অইবো হেই মজজিদের ইমাম। আপনেগো মজজিদের ইমাম আপনেগো কথা না হুইন্না পারবো না। বুজি, মাওলানা সাবরে খবরদা আপনে এই বাইত্তে আনান। আনাইয়া হেরে কন, নূরজাহান না বুইজ্জা কামডা করছে, পোলাপান মানুষ, অরে হেয় মাপ কইরা দেউক, অর কোনও ক্ষতি য্যান হেয় না করে।
দেলোয়ারা চিন্তিত গলায় বললেন, তর কি মনে হয় আমি কইলেঐ মাওলানা সাবে বেবাক ভুইল্লা যাইবো? কোনও ক্ষতি তর মাইয়ার করবো না?
হ আমার মনে অয়। আপনেগো কথা হালানের ক্ষমতা তার নাই। অহন হেয় আপনেগো কাছে বান্দা (বাঁধা)।
হামিদার মতন করে দবিরও ধরতে চাইল দেলোয়ারার পা। কিন্তু পায়ের দিকে হাত বাড়িয়েই অতি সংকোচে সেই হাত আবার সরিয়েও নিল। দেলোয়ারা বুজির পা ধরা কি তার ঠিক হবে? সে পুরুষমানুষ, হোক পা, তবু তো মেয়েমানুষের শরীর। বুজি যদি বিরক্ত হন, সহজ মনে না নেন ব্যাপারটা তা হলে খারাপ হবে! হামিদা ধরেছিল ঠিক আছে, দবির তো ধরতে পারে না!
পা ধরার কাজটা মুখেই সারতে চাইল দবির। করুণ দুঃখী গলায় বলল, বুজি, আমি আপনের পায় ধরি বুজি, আল্লারস্তে আমার মাইয়াডারে আপনে বাঁচান। আপনেরও তো মাইয়া আছে, মাইয়ার দরদ আপনে বোজেন, নিজের মাইয়া মনে কইরা আমার মাইয়াডারে আপনে বাঁচান।
শেষদিকে নিজেকে আর ধরে রাখতে পারল না দবির। হাউমাউ করে কেঁদে ফেলল।
দবিরের কান্না যেন কানেই গেল না দেলোয়ারার। দবির হামিদাকে যেন আর দেখতেই পেলেন না তিনি। চশমার ভিতর থেকে তাঁর চোখের দৃষ্টি চলে গেল বহুকাল পিছনে ফেলে আসা এক জীবনে। এই ঘরে, এই পালঙ্কেই এক দুপুরে ঘটেছিল ঘটনা। তাঁর মেয়ে মাফিনের তখন সাত-আট মাস বয়স। মেয়েকে এই পালঙ্কে শুইয়ে রেখে দেলোয়ারা গিয়েছিলেন রান্নাঘরে। খরালিকাল। মা তখনও বেঁচে আছেন। বড়বোন আনোয়ারা স্বামী-সন্তান নিয়ে থাকেন ঢাকায়। জিন্দাবাহার থার্ডলেনের চিপাগলির ভিতর বাসা। বাড়িটার এদিক ওদিক কোথাও কোথাও ছাপরাঘর, কোথাও কোথাও পাকা মেঝে, চারদিকে দেওয়াল আর মাথার ওপর টিন এমন খুপরি খুপরি ঘর। পুবদিকে কুয়াতলা, তার পাশ দিয়ে এক চিলতে স্যাঁতস্যাঁতে পথ চলে গেছে পায়খানাঘরে। বহু পুরনাকালের ইটের গাঁথনি তোলা পায়খানা, মল ধারণের জায়গায় মাটির গামলা বসানো। সিঁড়ি ভেঙে ভেঙে সেই পায়খানা ঘরে উঠলেই গায়ে কাঁটা দেয়। মলমূত্রের বীভৎস গন্ধে নাড়ি উলটে আসে, আর শরীর শক্ত হয়ে যায় পায়খানা ঘরের দেওয়াল জুড়ে স্থির হয়ে থাকা। তেলাপোকা দেখে। কী সাইজ একেকটার! কী রং!
পায়খানাঘরে যাওয়ার পথে কুয়াতলা থেকে আসা একখানা ড্রেন। বাড়ির পোলাপানরা। এই ড্রেনেই কর্ম সারে। হলুদ মলে থিকথিকা হয়ে থাকে ড্রেন। বাড়ির হাওয়ায় শুধুই মলের গন্ধ।
কত পদের ভাড়াটে সেই বাড়িতে! গেটের দিককার একটা ছাপরা ঘরে থাকে আমির, সে হচ্ছে চিনাবাদামঅলা, লায়ন সিনেমাহলের সামনে বসে চিনাবাদাম বেচে। কেরামতের বাপ রিকশাআলা, যতক্ষণ বাড়িতে থাকে বউর সঙ্গে শুধুই ঝগড়া, আজিজ হচ্ছে পৌরসভার ভূঁইমালি, ভিক্টোরিয়া পার্কে তার কাজ। ফল ফুলের গাছে পানি দেয়, খুরপি নিড়ানি চালিয়ে গাছের গোড়ার মাটি আলগা করে, আগাছা সাফ করে। বুড়া মতন একজন মিস্ত্রি আছে, নয়া বাজারে টুকরি মাথায় ঘুরে বেড়ায়। আর আছে নিয়াসা, প্রাণবন্ত এক যুবতী। ঢাকাইয়া কুট্টি। উর্দু-বাংলার মিশেল দেওয়া অদ্ভুত ভাষায় কথা বলে। নিয়াসার স্বামী কোথায় কী কাজ করে কে জানে! সকালে বেরিয়ে ফিরে অনেক রাতে। বাড়ির লোকজন তাকে দেখেই না। দেখে শুধু নিয়াসাকে। তাও নিজের ঘরে নিয়াসা বলতে গেলে থাকেই না। কখনও এই ঘরে, কখনও ওই ঘরে। হি হি করে হাসছে, ঠাট্টা মজা করছে। সবার সঙ্গেই আত্মীয়তা, সবার সঙ্গেই প্রাণের সম্পর্ক। একাই ওই বীভৎস বাড়িটি যেন আনন্দের বন্যায় ভাসিয়ে রেখেছে সে।
এই বাড়ির পশ্চিমে, বাড়ির অর্ধেক জুড়ে উত্তর-দক্ষিণে লম্বা একখান দালান ঘর। সামনে বিশাল চওড়া বারান্দা, বারান্দার পর দুইটা কামরা। উঠান থেকে পাঁচ ধাপ সিঁড়ি ভেঙে এই দালানে উঠতে হয়। বাড়ির দুইজন বনেদি ভাড়াটে থাকেন এই দুই কামরায়। উত্তরের কামরায় ফিরোজার বাপ। ফিরোজা মমতাজ আর বাবুল এই তিন সন্তান ভদ্রলোকের। বউ নিয়ে পাঁচজনের সংসার। পেশায় পুলিশের হাবিলদার। নাম তালেব আলী। দক্ষিণের কামরায় থাকেন গিয়াসউদ্দিন সাহেব। তার ডাকনাম গগন। দেলোয়ারার বড়বোন আনোয়ারার স্বামী। ডিএমসি অর্থাৎ ঢাকা মিউনিসিপ্যাল কমিটি, তারও আগে পৌরসভা, এই পৌরসভার কেরানি তিনি। নিরীহ, নরম ধরনের মানুষ। কারও সাতেপাঁচে নাই। আঠারো-উনিশ বছরেই বিয়ে সেরে ফেলেছিলেন। বছর বছর পিতা হচ্ছেন। তিনবছর আগে যমজ ছেলেমেয়ে হল এই বাড়িতে। তখন দেলোয়ারা এসে বোনের কাছে ছিলেন। তখনই খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে গিয়েছিলেন বাড়ির চেহারা। মন্দ লাগেনি পরিবেশটা। অসুবিধা করেছিল শুধু ওই পায়খানা ঘরের তেলাপোকাগুলি আর হাওয়ায় ভেসে বেড়ানো মলের গন্ধ। এই কারণেই ওই বাড়িতে আর কখনও যেতে চাননি দেলোয়ারা। বোনকে বলে গিয়েছিলেন, এরপর পোলাপান হওয়ার সময় যেন এই বাড়িতে আর না থাকেন তিনি, গ্রামের বাড়িতে যেন চলে আসেন।
