মাওলানা সাহেব নূরজাহানকে মাফ করে দিয়েছেন শুনে বেশ বড় রকমের একটা ধাক্কা খেল রাবি। মুখে কোনও কথা জুটল না তার। ভুরু কুঁচকে দবিরের দিকে তাকিয়ে রইল।
তাকিয়ে দেলোয়ারাও ছিলেন। মুখ দেখে বোঝা যায় তিনি যেন বেশ আশ্বস্ত হয়েছেন। বললেন, তয় তো ভালঐ অইছে। আমিও বুজছি, কামডা তর মাইয়ায় বুইজ্জা করে নাই। আথকা কইরা হালাইছে। তারবাদে গেছে ডরাইয়া। ডরাইয়াঐ কোনও বাইত্তে গিয়া পলাই রইছে।
কথা শেষ করে দবির হামিদার দিকে তাকালেন দেলোয়ারা। চশমার ভিতর থেকে নতুন করে যেন দেখতে পেলেন দুইজন মানুষের মুখের উপর চেপে থাকা অসহায়ত্ব। দেখে আশ্চর্য এক মায়া হল তার। বললেন, মাওলানা সাবে যহন মাপ কইরা দিছে তাইলে আর ডর নাই। যা, দেক কোন বাইত্তে পলাই রইছে মাইয়ায়। বিচড়াইয়া বাইর কর। তয় সিয়ানা মাইয়া, শইল্লে হাত উডাইচ না অর। মায় মারতে মারতে পারে মাইয়ারে, বাপের কইলাম উচিত না মাইয়ার শইল্লে হাত উড়ান। দউবরা, তুই কইলাম মারিচ না মাইয়াডারে। ধমক ধামক দিয়া শাসন করিচ, মরিচ না।
দবির বুঝে গেল তার মেয়েটির জন্য ভাল রকমের একখান টান দেলোয়ারা বুজির আছে। আজকের আগে এভাবে ব্যাপারটা সে কখনও টের পায়নি। দেলোয়ারার প্রতি ভারী। একটা কৃতজ্ঞতা বোধ জন্মাল। এই সুযোগে আসল কথাটাও বলে ফেলতে চাইল।
তার আগেই দেলোয়ারা বললেন, বয় তরা। খাড়ই রইলি ক্যা?
ঘরে ঢোকার পর থেকেই কেবিনের সিঁড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছে দবির হামিদা। এখন দেলোয়ারা বুজি বসতে বলেছেন শুনে দুইজন প্রায় একসঙ্গেই বসল কেবিনের সিঁড়িতে, গা ঘেঁষাঘেঁষি করে। বসেই বড় করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল হামিদা। তারপর কনুই দিয়ে দবিরকে একটা গুতা দিল। কথা কও বুজিরে।
হামিদার দিকে তাকিয়ে দবির বলল, হ কই।
দেলোয়ারা শুনলেন তাদের কথা। নিজ থেকেই বললেন, কী কথা রে?
আড়চোখে খাটাল এবং বারান্দার মাঝখানকার দরজার দিকে তাকাল দবির। রাবি এখনও দাঁড়িয়ে আছে কি না দেখল। না নাই। কোন ফাঁকে বারান্দার পুবকোণে গিয়ে ঢুকেছে। জায়গাটার উত্তর পাশে টিনের বেড়া, তারপর দুই-আড়াই হাত পরিমাণ ফাঁকা জায়গা তারপর চৌকি। এই ফাঁকা জায়গাটুকুতেই খাবারের হাড়ি পাতিল, থাল বাসন রাবির। সেখানে কুপি জ্বেলে বসেছে সে। খুবই মনোযোগ দিয়ে স্বামী সন্তানের ভাত বাড়ছে। বাদলা আর মতলা আসনপিড়ি করে বসে আছে চৌকিতে। কুপির আলোয় দেখা যাচ্ছে মতলার মুখে দুনিয়ার বিরক্তি। যেন ঘুম থেকে ডেকে তুলে ভাত খেতে বসিয়ে খুবই অন্যায় করা হয়েছে তার সঙ্গে। আর যে রাবি খানিক আগে খুবই চটাং চটাং কথা বলছিল মাওলানা সাহেবের পক্ষ ধরে, ছেলের সঙ্গে রাগারাগি করছিল, এখন স্বামী সন্তানের জন্য ভাত বাড়তে বসে কুপির আলোয় সেই মানুষটিই যেন অন্য মানুষ হয়ে গেছে। একই মানুষের ভিতর কত রকমের চেহারা যে বসিয়ে রেখেছেন আল্লাহতালা! কখন যে কোন চেহারা বেরিয়ে আসে, মানুষ নিজেও তা জানে না।
রাবি কাছেপিঠে নাই এবং এদিকে তার মনও নাই দেখে দবির খুবই স্বস্তি বোধ করল। দেলোয়ারার দিকে তাকিয়ে হাত কচলাতে কচলাতে বলল, মাওলানা সাবরে তো আপনে ভাল কইরাঐ চিনেন বুজি। মোকে আমারে ঠিকঐ কইছে যে আমার মাইয়ারে হেয় মাপ কইরা দিছে, এই হগল হেয় মনে রাকবো না, আমার মাইয়ার কোনও ক্ষতি করবো না, তয় আমি কইলাম তার কথা বিশ্বাস করি নাই।
দেলোয়ারা অবাক হলেন। ক্যা, বিশ্বাস করচ নাই ক্যা?
তার মোকে এক অন্তরে আরেক। বেবাকঐ হেয় মনে রাকবো। জাইত সাপের লাহান সুযোগ পাইলেঐ নূরজাহানরে হেয় খাইবো।
দেলোয়ারা চিন্তিত হলেন। হ, কথা মন্দ কচ নাই। মাওলানা অইলে কি অইবো, হেয় মানুষ ভাল না। তয় তর মাইয়াডারে সাবদানে রাকিচ। যহন তহন বাড়িত থিকা বাইর অইতে দিচ না, এমিহি ওমিহি যাইতে দিচ না।
দবির অসহায় গলায় বলল, হেইডা নাইলে না দিলাম, কিন্তু এই কইরা কি মাইয়াডারে আমি বাঁচাইতে পারুম! মাইয়ার ক্ষতি যুদি হেয় করতে চায় যেমতে অমতেঐ তো করতে পারবো! আর হের পোলায় তো আছে, আতাহার, বাপে যুদি খালি কয়, ধইরা লইয়া আয় ছেমড়িরে, রাইতে দলবল লইয়া আমার বাইত্তে আইয়া উটবো হেয়, দুয়ার ভাইঙ্গা আমার মাইয়ারে ধইরা লইয়া যাইবো। কেমতে আমি তাগো হাত থিকা আমার মাইয়ারে বাঁচামু?
দবিরের কথা শুনে চিন্তিত হয়ে গেলেন দেলোয়ারা। উদাস মুখে হারিকেনের আলোর দিকে তাকিয়ে রইলেন।
দেলোয়ারার এই উদাসীনতা খেয়াল করল হামিদা। এই ঘরে এসে ঢোকার পর থেকে তেমন কোনও কথা সে বলেনি। সুযোগের অপেক্ষায় ছিল। দেলোয়ারা উদাস হয়ে সেই সুযোগ এনে দিল। দবিরকে ঠেলেঠুলে উঠে দাঁড়াল সে। দেলোয়ারার সামনে এল। আচমকা শিশুর ভঙ্গিতে দেলোয়ারার পা চেপে ধরল। কাতর করুণ গলায় বলল, আমার মাইয়াডারে আপনে বাঁচান বুজি। নিজের মাইয়া মনে কইরা বাঁচান। আপনে ছাড়া অরে কেঐ বাঁচাইতে পারবো না।
দেলোয়ারা বিব্রত হলেন। পা থেকে দুই হাতে হামিদার হাত ছাড়াতে ছাড়াতে বললেন, হায় হায় করচ কী! ছাড়, পাও ছাড়। আমি কেমতে তর মাইয়ারে বাঁচামু?
হামিদার দেখাদেখি দবিরও ততক্ষণে উঠে এসেছে। হামিদা কথা গুছিয়ে বলতে পারবে ভেবে বলল, হ বুজি, আপনে ছাড়া আমার মাইয়াডারে কেঐ বাঁচাইতে পারবো না। মানুষ দুইজনকে আশ্বস্ত করার জন্য দেলোয়ারা বললেন, তগো কথা আমি ঠিক মতন বোজতাছি না। বয় তরা, কথাডা আমারে বুজাইয়া ক। কেমতে তগো মাইয়ারে আমি বাঁচাইতে পারি!
