দেলোয়ারা নিরীহ গলায় বললেন, হুনুম না ক্যা, হুনছি।
তারবাদে মাইয়া তো গাছির বাইত্তে যায় নাই।
শুনে দেলোয়ারা চমকালেন। তয় কই গেছে?
হেইডা কেঐ কইতে পারে না।
কচ কী? সব্বনাইশ্যা কথা। রাইত বিরাইত অইয়া গেছে, কই গেছে গা ডাঙ্গর মাইয়া!
দেলোয়ারার কথায় দবির বুঝে গেল এই বাড়িতে আসেনি তার মেয়ে, এই বাড়িতে সে নাই। হামিদাও বুঝল, বুঝেও অবুঝের মতো কথা বলল। আমি তো মনে করছি এই বাইত্তে আইয়া পলাই রইছে আমার মাইয়ায়। ও বুজি, যুদি পলাই থাকে, ডাক দেন অরে। আমরা অরে কিছু কমু না।
একথা শুনে রেগে যাওয়ার কথা দেলোয়ারার। কী, আমার কথা তুই বিশ্বাস করতাছচ? আমি তর লগে মিছাকথা কই? তর মাইয়ায় আমার কোনহানকার ইস্টিকুডুম যে তারে আমি আমার ঘরে পলাই থাকতে দিমু? আবার হেই মাইয়ার লেইগা আমি মিছাকথা কমু? রাইত বিরাইত অইয়া গেছে অহনও বাইত্তে যায় নাই দেইক্কা যেই চিন্তা আমি করছি, হেই চিন্তার পর এই কথা তর মনে অইল কেমতে?
কিন্তু দেলোয়ারা কিছু বললেন না। বুঝদার মানুষ, বুঝলেন মেয়ের চিন্তায় দিশাহারা হয়ে আছে বলে কথাবার্তার ঠিক নাই হামিদার। হামিদার জায়গায় যে-কোনও মা’ই এমন করত। আজ যদি তাঁর মেয়ের ক্ষেত্রে এমন কিছু ঘটত তিনি কি হামিদার মতোই আচরণ করতেন না!
তবে হামিদার কথাটা ধরল রাবি। দবির- হামিদাকে দেখেই বিরক্ত হয়েছে সে। যে মা বাবার মেয়ে এমন কাজ করতে পারে তাদের ওপর বিরক্ত না হয় কোন লোকে! ঘটনাটা রাবি দুপুরেবেলাই শুনেছিল। এই সমস্ত কথা পলকে ছড়িয়ে যায় সারাগ্রামে। বেপারি বাড়ির পুবের শরিকের রান্নাঘরের ঢেকিতে ধান বানছিল রাবি। তখনই যেন কে এসে ঘটনাটা বাড়িতে বলেছে। পলকে সেই কথা বাড়ির বউঝিদের মধ্যে ছড়িয়ে গেছে, রান্নাঘরে রাবির কানে এসেছে। তখন থেকেই নূরজাহান আর তার মা-বাপের উপর রেগে আছে রাবি। এত্তবড় সাহস অতডু ছেমড়ির! মাওলানা হুজুরের লাহান কামেলদার মাইনষের মাকে ছ্যাপ ছিড়াইয়া দেয়! এই মাইয়া জন্ম দিছে কেমুন মা-বাপে!
এখন হাতের কাছে দবির-হামিদাকে পেয়ে বুকের ভিতর চেপে থাকা রাগ ঝেড়ে দিতে চাইল রাবি। হামিদার দিকে তাকিয়ে আচমকা বলল, এই বাইত্তে আইয়া পলাই থাকনের সাহস তোমার মাইয়ার অইতো না। অইলেও অন্য শরিকের ঘরে অইতো, এই ঘরে অইতো না। দেলরা বুজি কিছু না কইলেও আমি অরে পলাই থাকনের জাগা দিতাম না। চুলে ধইরা বাইর কইরা দিতাম। ইতর মাইয়া, কোন সাহসে হুজুরের মোকে ছ্যাপ ছিড়াইয়া দিল? কাইস্যা অর কোনহানকার লাং অইছে যে তার লেইগা হুজুররে অপমান করবো?
লাং কথাটা শুনে বিরক্ত হলেন দেলোয়ারা। গম্ভীর গলায় ধমক দিলেন রাবিকে। এই ছেমড়ি, বকাবাজি করি না।
দেলোয়ারার ধমকে দমল রাবি কিন্তু সেই ভাব দবির-হামিদাকে বুঝতে দিল না। আগের মতোই তেজি গলায় বলল, বকাবাজি তো আপনেরঐ করনের কথা বুজি। আপনে করতাছেন না দেইক্কা আমি করতাছি। এইডা কেমুন কথা অইলো? হুজুরের লাহান কামেলদার মাইনষের মোকে ছ্যাপ ছিড়াইয়া দেয়! পরানে ডর নাই অর? ও জানে না। হুজুরে বড়দোয়া (বদদোয়া) দিলে ছারখার অইয়া যাইবো ও। আল্লার খাসবান্দা হ্যায়, মোক দিয়া যা কইবো তাঐ অইবো। বাদলার লেইগা তারে আমি কইছিলাম, অরে একখান ফুঁ দিয়া, দেন হুজুর, ও য্যান আর মোতালেইব্বাগো ওই মিহি কইতর দেকতে না যায়। হুজুরে যেদিন ফুঁ দিয়া দিল, হেদিন থিকা বাদলা আর কইতর দেকতে যায় না। ভাল অইয়া গেছে আমার পোলায়।
মায়ের কথা শুনে দেলোয়ারার পায়ের কাছে বসা বাদলা ফিক করে হাসল। না মা, মিছা কতা। ভাল আমি অই নাই। হুজুরের ফুয়ে আমার কোনও কাম অয় নাই। অহনও রোজঐ কইতর দেকতে যাই। মোতালেব কাকায় গাইল দেয় তাও যাই। হেদিন গর্দানডা ধইরা একখান ধাক্কা দিল, আরেকদিন একটা লাত্তি দিছে, তোমারে এই হগল কথা কই না। কইলে যে ওইমিহি তুমি আমারে যাইতে দিবা না! কইতর দেকতে আমার খুব মজা লাগে। কইতরের লেইগা লাত্তিগুতা খাওনও ভাল।
বাদলার কথা শুনে মুখ টিপে টিপে হাসতে লাগলেন দেলোয়ারা আর রাগে অপমানে রাবির গেল মুখ লাল হয়ে। চোখ পাকিয়ে ছেলের দিকে তাকাল সে। দাঁতে দাঁত চেপে বলল, চুপ কর গোলামের পো। মা’র মোকে মোকে কথা! রাক, কইতর দেহন তর আমি বাইর করতাছি।
মায়ের কথা একদমই পাত্তা দিল না বাদলা। সরল গলায় বলল, অহন আর প্যাচাইল পাইড়ো না মা। যাও, ভাত বাড়ো গিয়া। আমার খিদা লাগছে।
রাবি মুখ ঝামটে বলল, আমি বাড়তে পারুম না। যা, তর বাপরে ডাইক্কা উড়া, দুইজনে মিল্লা ভাত বাইড়া খা গা।
আদর্শলিপিটা বুকের কাছে ধরে পালঙ্ক থেকে নামল বাদলা। অতি নির্বিকার ভঙ্গিতে মায়ের পাশ দিয়ে বারান্দায় চলে গেল।
রাবির ভঙ্গিভাঙ্গি দেখে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল দবির-হামিদা। মাথা নিচু করেছিল। এখন প্রায় একসঙ্গেই মাথা তুলল দুইজনে। দেলোয়ারাকে দবির তার স্বভাবসুলভ বিনয়ী গলায় বলল, বুজি, আমার মাইয়ায় যে বিষম অন্যাই করছে হেইডা আমি বুজছি। বুইজ্জাঐ হুজুরের কাছে গেছিলাম।
দেলোয়ারা চমকালেন। কচ কী? মাওলানা সাবের বাইত্তে তরা গেছিলি?
হ। হেই বাইত থিকাঐ আপনেগো বাইত্তে আইলাম। মাওলানা সাব, আতাহার বেবাকতেঐ আছিল। আমরা মনে করছিলাম আতাহারে অর দলবল লইয়া মাইয়াডারে ধইরা নিয়া অগো বাইত্তে আটকাইয়া রাকছে। গিয়া দেকলাম, না। অমুন কাম অরা করে। নাই। বাপ পোলা দুইজনেঐ রাগ অইয়া রইছে, তারপরও মাওলানা সাবে আমারে কইলো, তর মাইয়ায় পোলাপান মানুষ, ভুল কইরা লাইছে, অরে আমি মাপ কইরা দিছি। যা।
