রাবির ঝিমুনি কেটে গেছে।
কী ব্যাপার, বাদলা বসল পড়তে, এখন দেখি মহা আনন্দে হাসছে।
স্বামীর হাত-পা টিপা ফেলে রাবি এসে দাঁড়িয়েছে খাটাল আর বারান্দার মাঝখানকার দরজায়। দাঁড়িয়ে দেখে দেলোয়ারা বুজির চশমা পরে তার ছেলে অচেনা মানুষ হয়ে গেছে। চোখের সামনে আয়না ধরে নিজেকে দেখছে আর তার সামনে বসে তাকে দেখছেন। দেলোয়ারা বুজি। এই দৃশ্য দেখে রাবিও খুব মজা পেল, নিজের অজান্তে ঠোঁটে তার ফুটে উঠল গভীর পরিতৃপ্তির হাসি।
মা’কে বাদলা দেখতে পেল না। চশমা পরার আনন্দে বিভোর হয়ে আছে। একসময়। আয়নায় নিজেকে দেখা শেষ করে কী মনে করে দক্ষিণ দিককার জানালার দিকে তাকিয়েছে। শীতসন্ধ্যা বসে যাওয়ার পরও জানালাটা আজ বন্ধ করা হয়নি। চশমা পরা চোখে সেই খোলা জানালার দিকে তাকাল বাদলা, তাকিয়ে আপাদমস্তক কেঁপে উঠল। শিরদাঁড়া বেয়ে লম্বা একটা ক্যারা যেন নেমে যেতে লাগল। এ কী, জানালার বাইরে দাঁড়িয়ে আছে কারা? পাশাপাশি দুইখান মুখ। দেখতে মানুষের মুখের মতো ঠিকই কিন্তু মানুষের মুখের তুলনায় পাঁচ-দশগুণ বড়। চোখগুলি একেকজনের গোরুর চোখের মতো, নাকগুলি ধুন্দুলের মতো মোটা, কানগুলি ধানঝাড়ার কুলার মতো। একজনের মুখে দাড়ি গোঁফ, আরেকজনের মাথার চুল লম্বা। কিন্তু চুলদাড়ি মানুষের চুলদাড়ির মতো না। মিয়াবাড়ির পুকুরে বছরভর যে কচুরিগুলি আছে সেই কচুরির ছোবার মতো ঝিমকালো, লম্বা মোটা চুলদাড়ি। তা হলে কি ঠাকুরবাড়ির বাঁশঝাড়ে যে দুইজন থাকেন তারা দুইজন আজ দূরে কোথাও না গিয়ে এই মেন্দাবাড়িতেই চরতে এসেছেন? বাগানের দিককার জানালা খোলা পেয়ে একত্রে দুইজন উঁকি মেরেছেন ঘরের ভিতর! মানুষের সংসার দেখছেন!
বাদলার দম বন্ধ হয়ে এল! চোখের চশমার কথা ভুলে গেল সে।
ঠিক তখনই জানালার বাইরে দাঁড়ানো দুইজনের একজন করুণ গলায় ডাকল, দেলরা। বুজি, ও দেলরা বুজি, দুয়ারডা ইট্টু খোলেন।
এই গলা শুনে ভয়টা বাদলার পলকেই কাটল। শিরদাঁড়া বেয়ে নামতে থাকা লম্বা মতো ক্যারা চট করেই যেন কোথায় উধাও হয়ে গেল। বাদলা বুঝল, না তেনারা ঠাকুরবাড়ির বাঁশঝাড় থেকে আসেননি! তেনারা মানুষ! চোখে চশমা আছে বলে মানুষের মুখ মানুষের মতো দেখতে পায়নি বাদলা, দেখেছে তেনাদের মুখের মতো।
আর চোখে চশমা নেই বলে দেলোয়ারার হয়েছে আরেক অবস্থা। চশমা ছাড়া চোখে প্রায় কিছুই দেখতে পান না তিনি। সবকিছুই অপরিষ্কার, সব কিছুর উপরই ফিনফিনা কুয়াশার আবরণ। চেনা মানুষের মুখ অচেনা, আবছা হয়ে যায়। যেন বাস্তবে দেখছেন না। তিনি, যেন দেখছেন স্বপ্নে কল্পনায়।
এখনও সেই অবস্থাই হয়েছে। জানালার বাইরে মানুষের গলা শুনে সেদিকে তিনি। তাকিয়েছেন ঠিকই, আবছা মতন দুইজন মানুষের মুখ দেখতেও পাচ্ছেন কিন্তু চিনতে পারছেন না মানুষ দুইজন কারা?
গলা কেমন পরিচিত! যেন বহুবার এই গলা শুনেছেন দেলোয়ারা। স্বভাব মতোই ধীর শান্ত গলায় তিনি তারপর জিজ্ঞাসা করলেন, কেডা?
জবাব আসার আগেই বারান্দা আর খাটালের মাঝখানকার দরজায় দাঁড়ানো রাবি বিরক্তির গলায় বলল, আপনে চিনতে পারেন নাই বুজি? গাছি আর গাইচ্ছানি।
ও আইচ্ছা। দুয়ার খুইলা দে রাবি।
বাদলার চোখের দিকে হাত বাড়ালেন দেলোয়ারা। দে রে ছেমড়া, চশমা দে।
বাদলার খুলতে হল না, দেলোয়ারাই চশমা খুলে নিলেন। আঁচলে চট করে দুইখান। মোছা দিয়ে চোখে পরলেন। বাদলা দেখতে পেল এই কিছুক্ষণ আগের দেলোয়ারা বুজি আর সেই বুজি নাই, অন্য মানুষ হয়ে গেছেন। চশমার কারবারটাই মজার। ভোজবাজির মতো। চোখে থাকলে একরকম না থাকলে আরেকরকম। সে নিজেই তো আজ চশমার গুণে অন্যরকম হয়ে গিয়েছিল। দবির হামিদাকে দেখেছে তেনাদের মতো। কালীসন্ধ্যায় জোড় বেঁধে যেন গ্রাম দেখতে বেরিয়েছিল। চশমা খুলতেই মানুষ হয়ে গেছে।
রাবি ততক্ষণে দরজা খুলে দিয়েছে, দবির-হামিদা ঘরে ঢুকেছে। দু’জনেরই মুখে। উৎকণ্ঠা। শরীরে (চেপে বসা শীতভাব যেন মুখের চামড়া টেনে ভিতর দিকে নিয়ে যাচ্ছে। ফলে চোখ মুখ নাক ঠোঁট যেন জায়গা মতো নাই তাদের, যেন এদিক ওদিক হয়ে গেছে।
ঘরে ঢুকেই দিশাহারা ভঙ্গিতে চারদিক তাকাতে লাগল হামিদা। সদ্য জন্ম-দেওয়া বাছুর চোখের আড়াল হয়ে গেলে যেমন দৃষ্টি হয় গাইগোরুর, হামিদার চোখের দৃষ্টি তেমন, চঞ্চলতা তেমন। ব্যাপারটা দেলোয়ারা বাদলা খেয়াল করল না, করল রাবি, করে মুখের বিরক্তভাব আরও বেড়ে গেল তার। হামিদার দিকে তাকিয়ে রাগী গলায় বলল, যেই চিন্তা কইরা এই বাইত্তে আইছো হেই চিন্তা বাদ দেও।
কথাটা বুঝতে পারলেন না দেলোয়ারা। রাবির মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, ওই ছেমড়ি, কী কচ তুই? কী চিন্তা কইরা আইছে?
আপনে বোজেন নাই বুজি?
না।
গাছি আর গাইচ্ছানি তো আইছে মাইয়া বিচড়াইতে!
তারপরও যেন ব্যাপারটা পুরাপুরি বুঝতে পারলেন না দেলোয়ারা। অবুঝের মতো মুখ। করে রাবির দিকে তাকিয়ে রইলেন।
দবির-হামিদার সঙ্গে কথা বলবার সময় রাবির চেহারা একরকম, রাগ বিরক্তিতে ভরা, দেলোয়ারার সঙ্গে কথা বলার সময় সেই রাগ বিরক্তির চিহ্নও থাকে না, একেবারেই অন্যরকম, বিনয়ী হাসিহাসিভাব মুখে। সেই মুখে দেলোয়ারাকে রাবি বলল, আপনে হোনেন নাই বুজি গাছির মাইয়ায় আইজ কী কাম করছে?
