না চশমা তরে দেওন যাইবো না।
একথা শুনে দমে যাওয়ার কথা বাদলার কিন্তু সে দমল না। সে যেন জানতই এভাবেই বলবেন দেলোয়ারা। যেন পরের কথাটা বলবার জন্য তৈরিই ছিল। সেভাবেই বলল, আমি বহুত সাবদানে লাগামু। ভাঙবো না। একবার লাগাইয়া আপনেরে দিয়া দিমু।
দেলোয়ারা বললেন, না হের লেইগা না রে ছেমড়া।
তয়?
চশমার আয়নায় পাওয়ার আছে। ছোড জিনিস বড় দেহা যায়। চোক্কের জুতি কইম্যা আইলে, ছোড জিনিস চোকে যহন মাইনষে দেকতে পারে না তহন চকু পরীক্ষা কইরা ডাক্তাররা চশমা লাগাইতে দেয়। যাগো চকু ভাল, পাওয়রআলা চশমা লাগাইলে তাগো ভাল চকু খারাপ অইয়া যায়। তুই পোলাপান মানুষ, তর চক্ক ভাল। আমার চশমা লাগাইলে চকু খারাপ অইয়া যাইবো।
এসব কথায় বাদলার মন ভরল না। ভাবল চশমাটা বুজি তাকে লাগাতে দিবে না বলে এসব বলছেন। প্রথমে মুখটা একটু কালো করল সে, তারপর অনুনয়ের ভঙ্গি করল। না বুজি, চকু আমার খারাপ অইবো না। একবার লাগাইয়াঐ লগে লগে খুইল্লা হালামু। এত তাড়াতাড়ি চক্কু নষ্ট অইবো কেমতে? আপনে ইট্টু দেন।
বাদলার অনুনয়ের ভঙ্গিটা মায়াবী। দেখে মনটা নরম হল দেলোয়ারার। তবু নরম ভাব তিনি দেখালেন না। রাগী ভাব বজায় রেখে বললেন, তুই বহুত ঘেংটি পারইন্যা পোলা। যা আলমারি থিকা আয়নাডা লইয়ায়।
বাদলা অবাক হল। এত রাইত্রে আয়নাডা কী করবেন আপনে?
আমি কিছু করুম না। করবি তুই। চশমা লাগাইয়া আয়নার মিহি না চাইলে বুজবি কেমতে কেমুন দেহা যাইতাছে তরে!
একথা শুনে আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেল বাদলা। লাফ দিয়ে পালঙ্ক থেকে নামল। আলমারি খুলে দেলোয়ারার ব্যবহারের হাতআয়নাটা নিয়ে এল।
দেলোয়ারা চোখ থেকে চশমা খুললেন। হাসিহাসি মুখে আঁচলে কাঁচ মুছে বাদলার দিকে তাকালেন। এই ছেমড়া, মোক উডা। চা আমার মিহি।
বাদলা মুখ তুলে তাকাল। দুই হাতে নিজের চশমা বাদলার চোখে পরিয়ে দিলেন। দেলোয়ারা। লগে লগে এতদিনকার চেনা চেহারা অচেনা হয়ে গেল বাদলার। বয়স বহুগুণ বেড়ে গেল ওইটুকু ছেলের। যদিও চশমা ছাড়া চোখে প্রায় কিছুই দেখতে পান না দেলোয়ারা, তবু অপলক চোখে হাসিহাসি মুখ করে বাদলার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
বাদলার কচি মুখ তখন গভীর আনন্দে ফেটে পড়ছে। চশমার ভিতর তার চোখ দেখাচ্ছে অলৌকিক চোখের মতো। হি হি করে হাসছে সে। হাসতে হাসতেই দেলোয়ারার হাতআয়না মুখের সামনে তুলে ধরল, নিজের চশমা পরা চেহারা দেখতে চাইল। প্রথমে ভেবেছিল পালঙ্কের ওপর যেখানে ছিল তার আদর্শলিপি ঠিক সেই জায়গায় আয়না রেখে মুখ নিচু করে তাকাবে আয়নার দিকে। ওই করতে গেলে চশমা খুলে পড়বে চোখ থেকে। এমনিতেই ঢলঢল করছে জিনিসটা। মাথা উঁচু করে কানের সঙ্গে আটকে রাখতে হচ্ছে। যদি কোনওরকমে চোখ থেকে একবার পড়ে যায়, চশমার ক্ষতি হোক বা না হোক দেলোয়ারা সাবধান হয়ে যাবেন, জান দিয়ে ফেললেও দ্বিতীয়বার আর চশমা পরতে দেবেন না বাদলাকে। এই ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে বাদলা হাতআয়না তুলে ধরল তার চোখের সামনে। আয়নার ভিতর তাকিয়ে দেখতে পেল তার এতদিনকার চেনা মুখটা আর তার নিজের নাই, অন্যের হয়ে গেছে। এই মুখ বাদলা চেনে না, তার দশ বছরের জীবনে এরকম মুখ সে। আর কারও দেখেনি।
কিন্তু মুখে বাদলার হি হি করা হাসিটা আছেই।
বারান্দার চৌকি থেকে ছেলের এই হাসি শুনতে পেল রাবি। মতলেব আজ কামলা দিতে গিয়েছিল কুমারভোগের পিয়ার খাঁ-র বাড়িতে। বাড়ির পুবের ভিটির চৌচালা ঘরের একদিককার টিনের বেড়ার দুইখানা টিন জং ধরে একেবারেই খয়ে গেছে। আঙুল দিয়ে। খোঁচা দিলে কাগজের মতো ফুটা হয়ে যায়, সেই ফুটার মুখ দুইআঙুলে চেপে ধরে আস্তে করে টানলেই কাগজের মতোই প্যার পার করে ছিঁড়ে যাবে টিন। তার ওপর ঠিক ওদিককারই একটা খামে লেগেছে উইপোকা। খামটাও বদলাতে হবে। সীতারামপুরের নন্দ মিস্ত্রিকে নেওয়া হয়েছে কাজে। তার সঙ্গে ধরাধরির জন্য একজন কামলা লাগে। দেশগ্রামে কামলা আজকাল পাওয়াই যায় না। সবাই লেগে গেছে সড়কের কাজে, আলী আমজাদের মাটিয়াল হয়েছে। মতলেবের শরীরস্বাস্থ্য জুতের না। ভাঙাচোরা শরীর কাকতাড়ুয়ার মতো। হাঁটাচলা মেয়েলি ঢঙের। ভারী কাজ বলতে গেলে করতেই পারে না। দুই-চার গ্রামের গৃহস্থবাড়িতে কামলা মতলেব ঠিকই দেয়, তবে সেসব তেমন কোনও কাজ না। অনেকটা ফুটফরমাস খাটা। এজন্য কামলা হিসাবে কদর মতলেবের একেবারেই নাই। না পারতিকে লোকে তাকে ডাকে, যখন কাউকে না পায় তখন। মতলা আছে ছাই ফেলতে ভাঙা কুলার মতো।
পিয়ার খাঁ-র ছেলেরাও কাউকে না পেয়ে মতলাকে ডেকেছিল। কাজ যা করার নন্দ মিস্ত্রিই করেছে, মতলা শুধু এটা ওটা এগিয়ে দিয়েছে, ওই ফুটফরমাস খাটা আর কী। তাতেই রোজ হচ্ছে সত্তর টাকা। দুপুরবেলা ভরপেট ভাত। সঙ্গে ছিল নলা মাছের তরকারি। এত আরামের কাজ করেও সন্ধ্যাবেলা মতলা বাড়ি ফিরেছে পুঁকতে ধুঁকতে। যেন অতিরিক্ত পরিশ্রমে একেবারেই ভেঙে পড়েছে। হাঁটাচলার শক্তি নাই। বাড়ি ফিরেই বারান্দার চৌকিতে উঠে শুয়ে পড়েছে। রাবির কাজ ছিল আজ খাইগো বাড়ির ওদিককার বেপারি বাড়িতে। ধান বানার কাজ। সারাদিন ধান বেনে আড়াই-তিন সেরের মতো চাল পেয়েছে। দুপুরের ভাতও দেয়নি গিরস্তে। তবু শরীর ঠিক আছে তার। বিকালবেলা আঁচলে চাউল নিয়ে বাড়িতে এসে নিমতলার চুলায় ভাততরকারি বেঁধেছে, ফাঁকে ফাঁকে ছেলে খেয়ে গেছে বুকের দুধ, তবু ক্লান্ত হয়নি রাবি। রান্নাবান্না শেষ করে অবেলায় খেয়ে নিয়েছে অল্প একটু ভাত। এটা আসলে দুপুরের খাওয়া। তারপর সন্ধ্যাবেলা ঘরের কুপিবাতি জ্বেলে, ধূপ ধুমার কাজ সেরে এসে লেগেছে স্বামীর সেবায়। মতলা সটান শুয়ে ঘুমাচ্ছে আর রাবি তার হাত-পা টিপে দিচ্ছে। এই করতে করতে নিজেরও ঝিমুনি এসেছিল, তখন শোনে খাটালের দিকে হি হি করে হাসছে বাদলা।
