দেলোয়ারা বললেন, বই ভোলা রাইককা অন্য প্যাচাইল পাড়ন যায় না।
বাদলা বলল, আমি তো প্যাচাইল পাডুম না। প্যাচাইল পাড়বেন আপনে আর হুনুম আমি।
তাও বই বন্ধ করন লাগে।
করুম?
হ করবি না!
যেন খুবই আনন্দের কাজ করছে এমন ভঙ্গিতে আদর্শলিপি বন্ধ করল বাদলা। হাসিমুখে তাকাল দেলোয়ারার মুখের দিকে। ইবার কন।
দেলোয়ারা বললেন, আমার বাপে আছিল জাহাজের সারেঙ। জাহাজখান আছিল বিটিশ কোম্পানির। জাহাজের নাম বেলফাস্ট। বাবার জাহাজে আমি একবার গেছিলাম। জাহাজ লইয়া বাবায় আইছিল নারাইনগইঞ্জে। বুজি আমি আর মায় গেছিলাম জাহাজ দেকতে। আলী আহম্মদ দাদায় আইয়া আমগো লইয়া গেছিল। গেলাম ইস্টিমারে কইরা। বাইষ্যাকাল। আছিল। বাড়িত থিকা কেরায়নাও কইরা গেলাম দিগলি। দিগলি থিকা উটলাম ইস্টিমারে। বিয়ালে গিয়া নামলাম নারইনগইঞ্জ। নাইম্মা দেহি বাবায় খাড়ই বইছে। লইয়া গেল হের জাহাজে। কী কমু তরে, কী সোন্দর যে জাহাজখান! কেফিন (কেবিন) আছে, ড্যাক (ডেক) আছে, ছাদ আছে।
কেফিন কথাটা শুনে বাদলা খুবই আমোদ পেল। এই ঘরেও তো কেফিন আছে!
হ। ঘরের ছয়আনি জাগা পাডাতন কইরা, ওডনের সিঁড়ি দিয়া এই ঘরে যেমুন কেফিন বানান অইছে ঠিক এমুন কেফিন আছিল ওই জাহাজে। আসলে ঘরখান বাবায় বানাইছিল হের জাহাজের মতন কইরাঐ। দেহচ না এই ঘরের ভিতরে আসলে চাইরখান ঘর। একটা ঘরের ভিতরেঐ টিনের বেড়া দিয়া দিয়া চাইরখান ঘর বানান অইছে। মাঝখানে মাঝখানে আবার দুয়ার। উত্তরমিহি, তরা যেহেনে থাকচ বাবায় ওইডার নাম দিছিল বারিন্দা, আমরা যেহেনে বইয়া রইছি এইডা হইল খাডাল (খাটাল) আর পুবমিহি, যেহেনে বইয়া আমরা ভাত খাই ওইডা হইল খোপ। জাহাজের সারেঙ যেই কেফিনে থাকে, হেই কেফিনে বছরের পর বছর থাকতে থাকতে বাবার অব্বাস অইয়া গেছিল। এরলেইগা এই ঘরেও কেফিন বানাইছে। বাইত্তে আইলে কেফিনে না হুইলে তার ঘুম আইতো না। আসল কথা জাহাজ ছাড়া অন্যকোনও জাগায় হুইলে তার ঘুম আইতো না। এর লেইগা ঘরডারে জাহাজের লাহান কইরা বানাইছিল। এই ঘরে আইয়া হানলে তার মনে অইতো জাহাজেই হানছে। কেফিনে ঘুমাইয়া থাকলে মনে অইতো জাহাজের কেফিনে ঘুমাইয়া রইছে। একদিন হুনলাম মা’রে কইতাছে, এই ঘরে বইয়া থাকলে, হুইয়া থাকলে তার বলে মনে অয় ঘরের নীচে গাঙ্গের পানি। গাঙ্গের পানির ঢেউয়ে জাহাজ যেমুন দোলে বাবায় বলে এই ঘরেও হেই দুলুনি উদিস পায়।
একটু থামলেন দেলোয়ারা। তারপর বললেন, বাবার দেহাদেহি আমার দুই চাচায়ও একপদের ঘর উডাইলো বাইত্তে। তারাও তো জাহাজের সারেঙ কেরানি আছিল, তাগো সবাবও বাবার লাহানঐ। ঘরের তলে গাঙ্গের ঢেউয়ের উদিস না পাইলে ঘুম আহে না। এইবার বুজছচ আমাগো বাড়ির ঘরগুনি জাহাজের লাহান ক্যা?
বাদলা সরল মুখ করে হাসল। হ বুজি, বুজছি।
হাসির ফলে হারিকেনের আলোর একটা রেখা গিয়ে পড়ল বাদলার ডান পাশের গজাতে। পলকের জন্য ভারী সুন্দর দেখাল ছেলেটিকে। কালো মিষ্টি মুখটি যেন আরও মিষ্টি হয়ে গেল। মোটা কাঁচের চশমার ভিতর থেকে দৃশ্যটি দেখে মুগ্ধ হয়ে গেলেন দেলোয়ারা। বাদলার কথা যেন শুনতেই পেলেন না।
বাদলা তখন মনে মনে ভাবছে এবার দ্বিতীয় প্রশ্নটা বুজিকে সে করবে।
দেলোয়ারা বললেন, বই খোল।
বাদলা একটু চমকাল। কী করুম?
বই খোলতে কইছি। গল্পগুজব শেষ। অহন আবার পড়া। তাড়াতাড়ি বই খোল।
শরীর বাইং মাছের (বাইন মাছ) মতো একটা মোচড় দিল বাদলা। মুখের মজাদার ভঙ্গি করে বলল, আইজ আর না পড়লে অয় না বুজি?
ক্যা? অসুবিদা কী তর?
পড়তে ভাল্লাগতেছে না।
রোজঐত্তো ভাল্লাগে না। না ভাল্লাগলে লেকাপড়া অইবো না। তর পিছে বেগার খাইট্টা আমার লাব কী?
বাদলা আবার মিষ্টি করে হাসল। না বুজি, লেকাপড়া আমার অইবো। আপনে দেইনে কাইল থিকা কেমুন পড়াডা আমি পড়ি। হাজ থিকা রাইত দোফর তরি পড়ুম।
এবার দেলোয়ারাও হাসলেন। আমি তর লেইগা অতরাইত তরি বইয়া থাকুম না। আমি রাইত জাগতে পারি না। আমার ঘুম আহে।
আপনের জাগনের কাম নাই।
তয় তরে পড়াইবো কে?
আপনে আমারে পড়া দেহাই দিয়া ঘুমাইয়া যাইবেন। আমি একলা একলা পড়ুম।
আইচ্ছা, দেহুমনে কেমুন পড়া তুই পড়চ।
বাদলা কথা বলল না। রহস্য করে হাসল।
দেলোয়ারা বললেন, অহন মতলবখান কী? কী করতে চাচ?
আর একখান কথা জিগামু।
জিগা।
চোক্কে চশমা দিলে আপনের চেহারা থাকে একরকম আর চশমা না দিলে থাকে আরেক রকম। আপনের চেহারাডা এমুন ক্যা?
দেলোয়ারা হাসলেন। ইস তুই যে কী বানকাউর অইছচ! কেমুন কেমুন কথা যে জিগাচ! এই ছেমড়া, এই যে তুই অহন শাটপেন ফিন্দা আমার সামনে বইয়া রইছচ, তরে যেমুন দেহা যাইতাছে, শাটপেন যদি ফিন্দা তুই না থাকতি, তুই যুদি থাকতি লেংটা তাইলে কি তরে এমুন দেহা যাইতো না কি অন্যরকম দেহা যাইতো?
অন্যরকম দেহা যাইতো। লেংটা মানুষ আর শাটপেন ফিন্দা মানুষ এক অইলোনি?
আমার চশমাড়াও এমুন। চশমা অইলো চোক্কের শাটপেন। দিলে একরকম না দিলে আরেকরকম।
শুনে মজা পেল বাদলা। হি হি করে একটু হাসল। তারপর বহুদিনকার খায়েশের কথাটা সাহস করে বলে ফেলল। ও বুজি, আপনের চশমাড়া আমারে ইট্ট দিবেন।
দেলোয়ারা অবাক হলেন। ক্যা? চশমা দিয়া তুই কী করবি?
আমি ইট্টু চোক্কে লাগাইয়া দেকতাম আমারে কেমুন দেহা যায়। আর চশমার আয়নার ভিতরে থিকা ঘরদুয়ার মানুষজন কেমুন দেহা যায়।
