যে পালঙ্কে বসে আছেন দেলোয়ারা সেই পালঙ্কটি এইরকম।
শুধু পালঙ্ক কেন, ঘরের সব আসবাবই এইরকম। সেইসব মহান কাঠমিস্ত্রিদের জাদুকরি হাতের মায়া আর যত্নে গড়া।
পালঙ্কের ওপাশে উত্তরের বেড়ার সঙ্গে মাঝারি সাইজের একটা আলমারি। মাথার দিকে পায়ের দিকে পালঙ্কের মতোই কারুকাজ। পাল্লা সাদামাটা কিন্তু হ্যাঁন্ডেলের কাছে গোল ভারী ধরনের নীল-সাদার মিশেল দেওয়া শিশুদের মুঠার মাপের একখানা পাথর বসানো। অন্ধকারেও জুলজুল করে পাথর। এই পাথরটাই আসলে হ্যাঁন্ডেল। ধরে আলতো করে টানলেই নরম ভঙ্গিতে খুলে যায় পাল্লা। পাল্লার গায়ে ওই পাথরটাই একমাত্র শিল্পকর্ম। সাদামাটা পাল্লার সৌন্দর্য হাজারগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। আচমকা পাল্লার দিকে তাকালে পাথরটাই চোখে পড়ে আগে।
কাঠের আলমারির লাগোয়া পশ্চিমে নিচু ধরনের ছোট্ট একখানা চৌকি। জলচৌকি না, তারচেয়ে একটু বড়। একই রঙের, একই কাঠের। পায়া চারটা কারুকার্যময়। এই চৌকির ওপর, এককোণে রাখা কুপিবাতি রাখার কাঠের গাছ। গাছার ওপর জ্বলছে ঝকঝকে পিতলের কুপি। গাছার চেহারা দেখে বোঝা যায় এইটুকু সামান্য আসবাবও একই যত্নে তৈরি করা হয়েছে। ছোট দীনহীন বলে অবহেলার চিহ্ন নাই।
চৌকির তলায় এখন মাটির ধুপতি রাখা। সন্ধ্যাবেলা ধূপ দেওয়া হয়েছে ঘরে। ধূপের ধুমায় (ধোঁয়ায়) শীতকালের মশাগুলো দিশাহারা হয়ে ঘর ছাড়ে আর বন্ধ ঘরের আনাচে কানাচে লুকিয়ে থাকা ভ্যাপসা গন্ধ দূর হয়।
আজও হয়েছে।
এখনও ধূপের ধুমা পুরাপুরি মিলিয়ে যায়নি। ব্যস্ত কৃষকের টানে টানে কার মাথায় বসা কলকি থেকে যেমন করে ওঠে তামাকের ধুমা ঠিক তেমন একটা ধুমার রেখা উঠছে ধুপতি থেকে। সঙ্গে আছে ধূপের পবিত্র গন্ধ। ঘরের বাতাস সেই গন্ধে বিভোর হয়ে আছে।
পালঙ্কের মাথার দিকে ঢেলান দিয়ে বসে আছেন দেলোয়ারা। পায়ের কাছে জ্বলছে ঝকঝকে কাঁচের বায়েজিদ হারিকেন। হারিকেনের ওপাশে আসনপিড়ি করে বসে আছে বাদলা। তার সামনে খোলা সীতানাথ বসাক প্রণীত আদর্শলিপি। কয়েকদিন ধরে সন্ধেবেলা বাদলাকে পড়তে বসাচ্ছেন দেলোয়ারা। বাদলার বাপ মতলেবকে দিয়ে কাজির পাগলা বাজার থেকে আদর্শলিপি কিনে আনিয়েছেন। কাজির পাগলা বাজারের সঙ্গে আছে বিরাট হাইস্কুল, কাজির পাগলা এ টি ইন্সটিটিউশন। ছাত্রছাত্রীদের সুবিধার জন্য সেই বাজারে বইখাতার দোকান হয়েছে বিস্তর।
কিন্তু পড়ায় তেমন মনোযোগ বাদলার নেই। অ আ-টাই শেষ করতে পারছে না দশ-বারো দিনে। পড়তে বসে বইয়ের চেয়ে অন্যদিকে মনোযোগ বেশি। আচমকা অদ্ভুত অদ্ভুত প্রশ্ন করে। আজ যেমন করল, বুজি, আপনেগো বাড়ির ঘরগুনি জাহাজের লাহান ক্যা?
বাদলার এই বুজি ডাকটা শুনলে গা জ্বলে দেলোয়ারার। মা-বাপে যাকে বুজি ডাকে ছেলেও তাকে ওই একই ডাক কেমন করে ডাকে!
অন্যদিন হলে এই নিয়ে কথা বলতেন দেলোয়ারা। আজ বললেন না। আজ মনটা বুঝি একটু অন্যরকম হয়ে আছে তাঁর। কদিন আগে ঢাকা থেকে ফিরলেন। মেয়ের শুনে এলেন ডায়াবেটিস ধরা পড়েছে। মাসে মাসে ডায়াবেটিক হাসপাতালে যেতে হচ্ছে। সকাল বিকাল নিয়ম করে হাঁটতে হচ্ছে বাড়ির ছাদে। হাসপাতাল থেকে কোন খাওয়া কতটুকু খেতে হবে তার একটা চার্ট করে দিয়েছে। এই এতটুকু ভাত, এইটুকু সবজি, মাছমাংসের পরিমাণ শিশুরা যতটুকু খেতে পারে তার চেয়েও কম। মিষ্টি জাতীয় খাবার হারাম। আহা, এই খেয়ে মানুষ বাঁচতে পারে! ফেরার পর থেকে যখন তখন মেয়েটার কথা খুব মনে হয়। মনে হলেই মনটা যায় উদাস হয়ে। ঢাকায় গেলেন ছাড়াবাড়িটা এনামুলকে রেজিস্ট্রি করে দেওয়ার জন্য। বোনপো মসজিদ করবে, কত আনন্দের কথা, গিয়ে শুনলেন মেয়ের হয়েছে ডায়াবেটিস। কেমন লাগে! আনন্দ আর বেদনা কেন যে পাশাপাশিই থাকে! কেন যে একসঙ্গেই আসে!
আজ মেয়ের কারণেই মন উদাস দেলোয়ারার। এজন্যই বাদলার কথা গায়ে লাগল না তার। আনমনা গলায় বললেন, পড়তে বইয়া খালি আবল তাবল কথাঐ মনে অয় তর?
বুজির গলা নরম দেখে সাহস বেড়ে গেল বাদলার। কেননা একখানা হাসি হেসে বলল, হ, পড়তে বইলে খালি এহেকটা কথা মনে অয়। বইয়ের মিহি চাইয়া থাকলে মনে অয়।
দেলোয়ারা কথা বললেন না। ভুলে গেলেন খানিক আগেই বাদলাকে তিনি বলেছিলেন, পড়চ না ক্যা?
বাদলা বলল, ও বুজি, কইলেন না?
কাচ মোছা অনেকক্ষণ আগেই শেষ হয়েছে। চশমা এখনও হাতেই ধরা, পরা হয়নি। এবার পরলেন দেলোয়ারা। সঙ্গে সঙ্গে চেহারা অন্যরকম হয়ে গেল তার। কীরকম গম্ভীর, ভারিক্কি ধরনের।
চশমা পরলে যে চেহারা একরকম বুজির, না পরলে আরেক রকম এই ব্যাপারটা অনেকদিন ধরেই খেয়াল করছে বাদলা, কিন্তু এই নিয়ে জিজ্ঞাসা করা হয়নি কিছু। মনে মনে বাদলা এখন ভেবে রাখল বুজি যদি আজ পড়া নিয়ে তেমন কিছু না বলেন তা হলে এই প্রশ্নটাও সে আজ করবে। তারপরও যদি বিরক্ত বুজি না হন তা হলে মনের ভিতর অনেকদিন ধরে জমে থাকা ইচ্ছাটার কথাও সাহস করে বলে ফেলবে। যদি রাজি বুজি কোনওরকমে হয়ে যান তা হলে তো কথাই নাই। খায়েসটা পূরণ হবে। আর যদি না-ও। হন তাতেও ক্ষতি নাই বাদলার। এইসব কথাবার্তা বলতে বলতে রাত হয়ে যাবে। মা এসে ডাকবে ভাত খেতে। ভাত খেতে ডাকা মানে আজ রাতের মতো পড়া শেষ। সেটাও তো একরকমের লাভ বাদলার!
