এই কি তা হলে আসল মায়ের আদর! উপরে উপরে শাসন ধমক, ভিতরে ভিতরে সন্তান ছাড়া কিছু বোঝে না!
হামিদার কথা ভেবে দবির তারপর দিশাহারা হয়ে গেল। মনের ভিতরটা উথালপাথাল করে উঠল তার। আশ্চর্য এক কৃতজ্ঞতায় হামিদার উপর মন ভরে গেল। দুইহাতে হামিদার মাথাটা বুকে জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছা করল দবিরের। জড়িয়ে ধরে বলতে ইচ্ছা করল, আমার মাইয়াডার লেইগা তোমার এমুন টান? এমুন টান তোমার মাইয়াডার লেইগা? আমি। কুনোদিন বুঝতে পারি নাই। এমুন টান মনের মইদ্যে কেমতে হামলাইয়া থুইছো তুমি? মাইয়াডা আইজ এমুন কাম না করলে তো তোমার এই টানডা আমি কুনোদিন বুঝতে পারতাম না। বুজতাম মাইয়াডারে তুমি দুই চোকে দেখতে পারো না। মাইয়াডার লেইগা মায়া মহব্বত খালি আমারঐ।
করা হয় না কিছুই দবিরের। বলা হয় না কিছুই। কান্নায় গলা বুজে আসে তার, চোখ ছলছল করে ওঠে। অন্ধকারে কুয়াশায় মুখোমুখি দাঁড়িয়েও হামিদা তা দেখতে পায় না। সে আছে মেয়ের চিন্তায়।
দবির ধরা গলায় বলল, লও তাইলে যাই।
শুনে ছটফট করে উঠল হামিদা। হ লও।
কোন বাইত্তে যাইবা আগে?
তুমি কও।
কোন কোন বাইত্তে বেশি যায় তোমার মাইয়ায়?
বেশি যায় হালদার বাড়ি। মজনুগগা ঘরে। তারবাদে হাজামবাড়ি যায়, মেন্দাবাড়ি যায়, মিয়াবাড়ি যায়।
মোবাড়ির সব ঘরে নূরজাহান যায় না। যায় খালি দেলরা বুজিগো ঘরে।
হ।
তয় হেই বাইত্তেঐ আগে লও।
ক্যা? আগে তো পড়বো মিয়াবাড়ি আর হাজামবাড়ি।
ছনুবুজিগো বাড়িও পড়বো। তয় এই তিন বাইত্তে নূরজাহান আইজ যায় নাই।
কেমতে বোজলা?
তিনডা বাড়িঐ সড়কের সামনা সামনি।
হেতে কী অইছে?
মাওলানা সাবের বাড়ি থিকাও এই বাড়িডি সামনে। মাওলানা সাবের বাড়ির সামনের কোনও বাইত্তে গিয়া পলাইবো না তোমার মাইয়ায়। তারবাদে হাজামরা অইলো গরিব। হেই বাইত্তে পলানের জাগা নাই। ছনুবুজি মইরা যাওনের পর হেই বাইত্তে নূরজাহান অহন। যায় না। আজিজের বউ বানেছা অরে দেকতে পারে না, ও ও দেকতে পারে না বানেছারে। যাইতে পারে মিয়া বাইত্তে। কুট্টির লগে খাতির আছে। আবার আলফুর কথা চিন্তা কইরা নাও যাইতে পারে।
ক্যা, আলফু কী করছে?
কিছু করে নাই। নূরজাহান চিন্তা করতে পারে ও যে এই বাইত্তে পলাইয়া রইছে আলফু যুদি এই কথা কেঐরে কইয়া দেয়?
তোমার মনে অয় এতকিছু ও চিন্তা করছে।
হ আমার মনে অয়।
ক্যা?
মাইয়া তোমার চালাক আছে। এই দিককার কোনও বাইত্তে গিয়া যুদি ও পলায় তাইলে পলাইছে মোবাইত্তে। দেলরা বুজিগো ঘরে। চিন্তা করছে দেলরা বুজিগো ঘরে থিকা অরে কেঐ ধইরা নিতে পারবো না। মাওলানা সাবে না, আতাহারে না।
ক্যা?
দেলরা বুজির বড়বইন আনোরা (আনোয়ারা) বুজির বড়পোলায় গেরামে মজজিদ করতাছে। মাওলানা সাবরে বানাইবো ইমাম। হের লেইগা দেলরা বুজিগো লগে মাওলানা সাবে অহন চুদুরবুদুর (তালবাহানা, শয়তানি বদমায়েশি) করতে সাহস পাইবো না। দেলরা বুজি যুদি জাগা দেয় নূরজাহানরে তাইলে তার কাছ থিকা নূরজাহানরে কেঐ ধইরা নিতে পারবো না।
শুনে আনন্দে যেন আত্মহারা হয়ে গেল হামিদা। কও কী?
হ।
এইডা বহুত ভাল কথা। লও তাইলে দেলরা বুজিগো বাইত্তেঐ আগে যাই। নূরজাহান। ওই বাইত্তে থাউক না থাউক দেলরা বুজিরে গিয়া কই আমগো মাইয়াডারে আপনে বাঁচান। আপনে মাওলানা সাবরে কন মাইয়াডা না বুইজ্জা আকাম কইরালাইছে, অরে আপনে মাপ কইরা দেন। অর কোনও ক্ষতি আপনে কইরেন না।
হামিদার কথা শুনে দবিরও উৎফুল্ল হল। হ এইডা দামি কথা কইছো। দেলরা বুজি যুদি মাওলানা সাবরে কয় তাইলে তার বাপের সাইদ্দ নাই নূরজাহানরে কিছু কয়।
তয় আর দেরি কইরো না, তাড়াতাড়ি লও।
ততক্ষণে ঘোর অন্ধকার চারদিক। অন্ধকারে কুয়াশায় ঢেকে গেছে মানুষের ঘরবাড়ি, খেতখোলা মাঠপথ। উত্তরে হাওয়ায় শনশন করে গাছের পাতা, শীতে জবুথবু হয়। গ্রামপ্রান্তর। অন্ধকার কুয়াশা তোয়াক্কা করে না দুইজন মানুষ। তীব্র শীত তোয়াক্কা করে না। একজন আরেকজনের হাত ধরে, পায়ের তলার মেঠোপথ ঠাওর করে মেন্দাবাড়ির দিকে হেঁটে যায়।
.
হারিকেনের আলোয় সাদা থান পরা দেলোয়ারাকে অচেনা মানুষ মনে হয়। যেন এ দুনিয়ার কেউ নন তিনি, যেন অন্য কোনও দুনিয়া থেকে হঠাৎ করেই চলে আসছেন মেদিনীমণ্ডল গ্রামের তিন মেন্দাবাড়ির এক বাড়িতে, যে বাড়ির আরেক নাম সারেঙ বাড়ি। তিন ভাইয়ের দুইজন ছিলেন জাহাজের সারেঙ আর একজন কেরানি। যেন কোনও এক দূরগামী জাহাজে। করেই বাপ-চাচারা কেউ অচেনা কোনও দেশ থেকে আজ এই সন্ধ্যায় দেলোয়ারাকে নিয়া আসছেন এই বাড়িতে, এই ঘরে। বহুদূর পথ অতিক্রম করে আসতে হয়েছে বলেই বুঝি চোখের চশমায় তার জমেছে দুনিয়ার সব ধুলা। হারিকেনের ম্লান আলোয় কিছুই বুঝি দেখতে পাচ্ছিলেন না তিনি। এজন্যই বুঝি সাদা থানের খুঁটে এখন চশমার কাঁচ মুচছেন। কাঁচ মুছতে মুছতেই বুঝি তার মনে পড়ল অদূরে বসে থাকা বাদলার কথা। কিন্তু বাদলার দিকে তিনি তাকালেন না। ধীরে শান্ত গলায় বললেন, অ্যাই ছেমড়া, পড়চ না ক্যা?
বড়ঘরের মাঝের কামরায় পুরনা উঁচু পালঙ্ক দক্ষিণ দিককার জানালার সঙ্গে পুবে-পশ্চিমে পাতা। পালঙ্কের পা এবং মাথার দিকে ফুল পাখি লতা পাতার কারুকাজ। বিক্রমপুর অঞ্চলের আগের দিনের হিন্দু কাঠমিস্ত্রিদের স্বভাব ছিল শিল্পীদের মতো। অতিযত্নে, অনেক অনেকদিন সময় নিয়ে বনেদি বাড়ির আসবাবপত্রের কাজ করত তারা। বার্মা মুলুক থেকে আসা মহামূল্যবান সেগুনকাঠের আসবাবপত্রে হাতুড়ি বাটাল চালাত সোনার সূক্ষ্ম কাজে পারদর্শী সোনারুদের ভঙ্গিতে। অতিযত্নে, দরদে মায়ায় কাঠের গায়ে ফুটিয়ে তুলত আশ্চর্য সব শিল্পকর্ম। সবশেষে লাগাত রং। গৃহস্থবাড়ির হিসেবি বউঝিরা কেউ কেউ গাছের তেঁতুল খোসা ছাড়িয়ে দলা দলা করে জমিয়ে রাখে হড়িকুড়ির অন্ধকারে, বছর-দুই বছর রাখার পর যেমন রং হয় সেই তেঁতুলের, আসবাবপত্রে লাগানো রঙের রং ঠিক তেমন। পঞ্চাশ-একশো বছরে চটে না সেই রং, বরং যত দিন যায় রং যেন আরও জেঁকে বসে, রঙের জেল্লা যেন আরও খোলতাই হয়।
