হামিদা বলল, খাড়ঐ রইলা ক্যা? লও।
দবির নির্বিকার গলায় বলল, কই যামু?
মাইয়া বিচড়াইতে।
কই বিচড়ামু?
গেরামে। বেবাক বাইত্তেঐ যামু। যেই বাইত্তে আছে হেই বাইত্তে থনেঐ লইয়ামু।
আর নিজেগো বাড়ি যে খালি পইড়া রইলো?
থাউক।
কও কী তুমি? রাইত অইয়াইলো, বাড়িডা খালি পইড়া থাকবো? ঘরদুয়ার খোলা পইড়া থাকবো?
থাউক, ডর নাই। মুকসেইদ্দা জেলে। মুকসেইদ্দা ছাড়া চোর ধাউর আর কে আছে গেরামে?
গেরাম কি আর গেরাম আছেনি? সড়কের কামে কতপদের মানুষ আইছে গেরামে। এক মুকসেইদ্দা জেলে হাজার মুকসেইদ্দা বাইরে। কোনহান দিয়া কে চুরি করবো কিছু বোজবা না। এক কাম করো, তুমি বাইত্তে যাও আমি যাই নূরজাহানরে বিচড়াইতে।
কথা এমন স্বাভাবিক গলায় বলল দবির, যেন মা-বাবার সঙ্গে রাগ করে কোনও বাড়িতে গিয়ে বসে আছে নূরজাহান, গিয়ে তাকে শুধু নিয়ে এলেই হল। এতবড় একটা কাণ্ড যে নূরজাহান করেছে, মাথার উপর যে তার এতবড় বিপদ তা যেন সে বুঝতেই পারছে না, তা যেন তার মনেই নাই।
হামিদা খুবই অবাক হল। স্বামীর চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, কও কী তুমি?
দবির বলল, ক্যা, খারাপ কী কইলাম?
আমার মাইয়ার এতবড় বিপদ আর তুমি আমারে গিয়া বাড়ি পইর (পাহারা) দিতে কও? কোন হিরা জহরত আছে তোমার বাইত্তে যে চোরে লইয়া যাইবো?
হিরা জহরত না থাউক, টুমটাম তো আছে? পিতলের কলসি বদনা, থাল বাসন।
শুনে তেড়ে উঠল হামিদা। ওই হগল ছাইভস্ম চোরে নিলে নেউকগা। আমার মাইয়ার থিকা ওই হগল বড় অইলোনি?
তাইলে তুমি মাইয়া বিচড়াইতে যাও, আমি গিয়া বাড়ি পইর দেই।
এই রাইত বিরাইতে একলা একলা মাইয়া বিচড়াইতে যামু আমি?
গেলে কী অইবো?
আমি যে মাইয়াছেইলা এইডাও তুমি ভুইলা গেছ?
না ভুলি নাই। ভুলুম ক্যা?
তয়?
তয় তুমি তো অল্প বইষ্যা মাইয়া না। তোমার আবার ডরের কী আছে?
কী আছে হেইডা বোজলে কথাডা তুমি কইতা না। নিজেঐ কইলা গেরাম আর গেরাম নাই। সড়কের কামে কতপদের মানুষ আইছে। এই হগল মানুষরা গেরামের বউঝিগো চিনে না। আন্ধাইরা রাইতে কোনহানদা কারে ধইরা বইবো কে জানে। ধরলে কি আর জুয়ান বুড়ি বুজবো?
অন্য সময় হলে এসব কথা শুনে হামিদার সঙ্গে ঠাট্টা মশকরা করত দবির। এখন সেই মন নাই। দবির গম্ভীর হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
হামিদা বলল, আমার কথা অহন তোমার খারাপ লাগবো। মনে করবা বিপদে পড়ছো দেইক্কা আমি তোমারে খোঁড়া দিতাছি। খোঁড়া না, আসল কথা। আমার মাইয়ার আইজ যেই দশা এই দশার লেইগা তুমি দায়ী। নিজে দায়ী অইয়া মাইয়ারে তুমি নিদানে হালাইবা, নিজেঐ আবার মাইয়ার উপরে রাগ করবা, অহন তুমি হেইডা পারবা না। বাপ অওন বহুত সোজা, মা অওন কঠিন। বাপ অয় মাইনষে এক মিনিটে, মা অয় দশমাস দশদিনে। এক মিনিটে বাপ অয় দেইক্কাঐ পোলাপানের দরদ বাপেরা বোজে না, বোজে মায়। আমার মাইয়ার বিপদ আমি যেমতে বোজতাছি তুমি ওমতে বোজতাছে না। বোজলে বাড়িঘরের চিন্তা তোমার অইতো না।
দবির কোনওরকমে বলল, অর উপরে আমার বহুত রাগ।
আর আমার রাগ তোমার উপরে।
ক্যা?
ওই যে কইলাম মাইয়ার এই দশা তোমার লেইগা। আমার কথা হোনলে এমুন। অইতো না। তুমি মনে করতা আমি খালি মাইয়াডারে শাসন করি। মাইয়ার ভালমন্দ বুঝি, অরে বাইত্তে থিকা বাইর অইতে দিতে চাই না। দুই-একদিন বাইন্দাও থুইছি। ক্যান এমুন করছি আইজ হেইডা তুমি বোজবা। বেডারা তো হারাদিন বাইত্তে বইয়া থাকে না। তারা থাকে খেতখোলায়, আডে বাজারে। পোলাপানরে বেশিক্ষন দেহে না। এর লেইগা আলগা আহ্লাদখান বাপেগো ইট্টু বেশি থাকে। বাইত্তে আইয়াঐ পোলাপান লইয়া আহ্বাদে এক্কেরে গইল্লা যায়। মায় শাসন করলে উলটা তারে বকাবাজি করে। মনে করে পোলাপানের লেইগা ইট্টুও মায়া নাই মা’র। এইডা অইল পুরুষপোলাগো দোষ। মায়। তো হারাদিন বাইত্তে থাকে, চোকের সামনে থাকে পোলাপান, কুঁকড়ার লাহান কাউয়ার হাত থিকা পোলাপানগো বাঁচায় মায়, চিলের হাত থিকা বাঁচায়। সমায় সমায় জিদ কইরা পোলাপানগো আবার ঠোকরও দেয়, খাওন দিতে চায় না। এইডা অইলো শাসন। এই শাসনডা করে দেইক্কাঐ পোলাপানডি ঠিক থাকে। কাউয়া চিল দেকলেঐ মা’র পাকের (পাখনা, ডানা) নীচে আইয়া পলায়। মা’র শাসনডা যদি না থাকতো তাইলে পলাইতো না। যহন তহন কাউয়া চিলে ছোঁ দিয়া লইয়া যাইতো। তোমার মাইয়ার হইছে হেই দশা। আমার পাকের নীচে থাকলে কাউয়া চিলে আইজ ছে দিতে পারতো না অরে। তুমি আহ্লাদ কইরা অরে আমার পাকের নীচ থিকা বাইর কইরা দিছো। তোমার লেইগা আমার মাইয়ারে আইজ কাউয়া চিলে ঠোকরাইবো আর তুমি চাইয়া চাইয়া দেকবা আমি বাইচ্চা থাকতে হেইডা অইবো না। আমার লগে তোমার যাওন লাগবো, মাইয়া বিচড়াইয়া বাইর করন লাগবো। জীবনে কোনওদিন কোনও কিছু লইয়া তোমারে আমি কিছু কই নাই। এতো প্যাচাইল হারা জীবনেও তোমার লগে আমি পাড়ি নাই। আইজ পাড়তাছি। মাইয়ার লেইগা পাড়তাছি। তুমি বাঁইচ্চা থাকতে আমার মাইয়ার যুদি কোনও সব্বনাশ অয় তাইলে তোমার গাছ ঝেরনের ছ্যান দিয়া তোমার কল্লা আমি কাইট্টালামু। এক মিনিটের বাপ অইয়া দশমাস দশদিনের মা’রে তুমি কষ্ট দিবা হেইডা পারবা না। লও আমার লগে।
হামিদার কথা শুনতে শুনতে নিজের অজান্তেই যেন স্তব্ধ হয়ে গেছে দবির। এই কি এতদিনকার চিনা হামিদা! তার স্ত্রী, মেয়ের মা! এতদিন ধরে দেখা এত নরম নিরীহ মানুষটি ভিতরে ভিতরে তা হলে এরকম! মেয়ের জন্য এত টান ভালবাসা তার! এই ব্যাপারটা দবির তো কখনও টের পায়নি! দবির তো কখনও দেখেনি মেয়েকে একটু আদর। করে কথা বলছে হামিদা, একটু আদর করে কিছু খাওয়াচ্ছে। ঘুমিয়ে থাকা মেয়েটির গায়ের কাপড় ঠিক করে দিচ্ছে। শীতে কুঁকড়ে থাকা মেয়েটির গায়ে তুলে দিচ্ছে কাঁথা কাপড়। জীবনভর তো মেয়েকে শুধু শাসন করতেই দেখেছে, ধমকাধমকি করতে দেখেছে। এই অমুক জাগায় গেলি ক্যা? তমুক করলি ক্যা? যখন তখন গুমগুম কিল মারতে দেখেছে মেয়ের পিঠে, চড়চাপড় ঠোকনা মারতে দেখেছে, আদরটা তো দেখেনি!
