শুনে মুখ উজ্জ্বল হয়ে গেল মরনির। সত্যঐ কইছে?
হ।
তয় তো বাঁইচ্চাঐ গেল ছেমড়ি।
না বাঁচে নাই।
ক্যা?
আপনে এত সোজা মানুষ পিসি! মাইনষের সব কথা বিশ্বাস করেন। কইলাম না মাওলানা সাবে জাইত সাপের লাহান। পুলিশ দারগাগো সামনে, গেরামের বেবাক মাইনষের সামনে নিজেরে ভাল দেহানের লেইগা কথাডা হেয় কইছে। আদতে কি হেইডা করববানি? ভিতরে ভিতরে জ্বলতাছে না? নূরজাহানরে হেয় ছাড়বোনি? শোদ কোনও না কোনওভাবে লইবোঐ। হেয় না লইলেও আতাহারে লইবোঐ। কনটেকদার সাবের ঘরে বইয়া কষাইন্না গোস্ত খাইতে খাইতে আইজ হেই হগল প্যাচাইলঐ পাড়বো।
তুই থাকবি না লগে?
হ।
তারপরই নিখিলকে মিনতি করল মরনি। তুই আমার একখান কাম করবি বাজান?
কন।
করবিনি আগে ক।
করুম। আপনে আমার লেইগা করছেন আমি করুম না ক্যা?
আমি তর লেইগা কী করছি?
এই যে কুঁকড়া বেচলেন আমার কাছে। আপনে যুদি না বেচতেন তাইলে আমি একটা ফাঁপরে পড়তাম না? কন কী কাম?
নূরজাহানরে লইয়া কী চিন্তাভাবনা করে আতাহারে তুই জানবি না?
হ জানুম।
যা জানবি আমারেও জানাবি।
কথাটা শুনে থতমত খেয়ে গেল নিখিল। হাঁ করে মরনির মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
মরনি বলল, কী অইলো?
নিখিল স্বাভাবিক হল। কিছু না।
করবি না আমার কামড়া?
ধীর গম্ভীর গলায় নিখিল বলল, করুম। তয় আপনেরে দুই একখান কথা জিগাই?
জিগা।
এই হগল জাইন্না আপনের লাব কী?
কিছু না।
তয় জানবেন ক্যা?
মাইয়াডার লেইগা আমার খুব মায়া লাগে।
মায়া লাগলেই বা এই হগল জাইন্না আপনে কী করবেন? অরে বাঁচাইতে পারবেন?
চেষ্টা কইরা দেহুম। আল্লায় রহম করলে বাঁচবো ছেমড়ি। আল্লায় বাঁচাইলে বাঁচবো। তুই যুদি বেবাক কিছু আমারে জানাচ আমি অরে সাবধান করতে পারুম, দরকার অইলে কোনওহানে নিয়া হামলাইয়া থুইয়ামু। জান দিয়া চেষ্টা করুম ছেমড়ি যাতে বাঁচে। এই বম্বে (বয়সে) অর য্যান কোনও ক্ষতি না অয়।
মরনির কথা শুনে অদ্ভুত চোখ করে খানিক তার দিকে তাকিয়ে রইল নিখিল। তারপর শান্ত গলায় বলল, আপনেরে আমি বেবাক কিছু জানামু পিসি। আপনে চিন্তা কইরেন না। আতাহারগো লগে থাইক্কাও আমি আসলে থাকুম আপনের লগে। আমিও চেষ্টা করুম। নূরজাহানরে বাঁচাইতে।
.
হামিদা ফোঁস ফোঁস করে কাঁদে আর হাঁটে।
তার আগে আগে দ্রুত পা চালিয়ে হাঁটছে দবির। মান্নান মাওলানার বাড়ি থেকে বেরুবার পর থেকেই এভাবে হাঁটছে সে, বাড়ির দিকে যাচ্ছে। মুখটা গম্ভীর। কোনওদিকে তাকাচ্ছে না। সঙ্গে যে হামিদা আছে, সে যে তার সঙ্গে হাঁটার তাল রাখতে পারছে না, ফোঁস ফোঁস করে কাঁদছে, কিছুই যেন টের পাচ্ছে না দবির। বাড়ির কাছাকাছি আসার পর দূরত্বটা হামিদার সঙ্গে যেন একটু বেশি বেড়ে গেল। ব্যাপারটা দবির খেয়াল করল না, করল হামিদা। আঁচলে চোখ মুছতে মুছতে দৌড়ে স্বামীর কাছে এল। পিছন থেকে দবিরের হাত টেনে ধরল। বাইত্তে যাইতাছ ক্যা?
দবির থমকে দাঁড়াল। গম্ভীর মুখে স্ত্রীর দিকে তাকাল। থমথমা গলায় বলল, তয় কই যামু?
মাইয়াডারে বিচড়াইবা না?
না।
এবার দুইহাতে দবিরের হাত ধরল হামিদা। কান্নাকাতর গলায় বলল, এমুন কইরো না। এমুন নিদয় অইয়ো না। আগে মাইয়াডারে বিচড়াইয়া বাইর করো। তারবাদে যত ইচ্ছা মারো কাডো আমি কিছু কমু না। মাইয়াডা কই গেছে গা, কই আছে না জাইন্না বাইত্তে তুমি কেমতে যাইতাছো? কেমতে অহন বাইত্তে গিয়া থাকবা তুমি? কেমতে ভাতপানি খাইবা, কেমতে ঘুমাইবা?
আগের মতোই গম্ভীর গলায় দবির বলল, এই হগল আমি জানি না।
বিকাল শেষ হয়ে আসছে। গ্রামের চকেমাঠে একত্রে নামছে কুয়াশা আর অন্ধকার। যে যার গাছে ফিরছে পাখিরা। উত্তরের হাওয়াটা বইছে। সেই হাওয়া বাঁচিয়ে কুপিবাতি জ্বালছে গিরস্তবাড়ির বউঝিরা। এসময় হাঁড়ি পাতা শেষ করে বাড়ি ফিরে দবির। আজ সে-কাজে যাওয়া হয়নি। পুরনো হাঁড়িতেই রস ঝরবে আজ। দিনে ঝরা রসে আগেই। আধাআধি ভরে থাকবে হাঁড়ি। রাতে ঝরা রসে দুপুর রাতেই কানায় কানায় ভরে উঠবে। তারপর থেকে হাঁড়ি উপচে তলায় পড়বে। দবিরেরও ক্ষতি, গিরস্তেরও ক্ষতি। এমন ক্ষতি গাছিজীবনে কখনও হয়নি দবিরের। এই প্রথম। প্রথম বলেই হয়তো গিরস্তে তেমন কিছু মনে করবে না। তা ছাড়া নূরজাহানের কথাও তো শুনে ফেলেছে সবাই। বুঝবে কেন গাছ ঝুরতে আসতে পারেনি দবির। কেন দিনে ঝরা হাঁড়ির রস নামাতে পারেনি, কেন পারেনি হাঁড়ি বদলাতে।
কিন্তু কাল যখন গাছ ঝুরতে বাড়ি বাড়ি যাবে দবির তখন হবে আরেক ঝামেলা। গিরস্তরা মুখিয়ে থাকবে নূরজাহানের কথা জানবার জন্য। এক প্যাচাল হাজারবার পাড়তে হবে দবিরের। তারপরও কত মানুষের কত কথা! দেশগেরামে এক কথারই হাজার চেহারা। একেকজন একেক রকমভাবে তুলবে কথাটা, একেক রকমভাবে বলবে। তার উপর নূরজাহান হচ্ছে মেয়ে। বদলোকেরা কত কথা বানাবে ওইটুকু মেয়েকে নিয়ে। কত ঠাট্টা মশকরা, কত হাসাহাসি, কত ইতর কথাবার্তা হবে। কোনও না কোনওভাবে সব কথাবার্তাই কানে আসবে দবিরের। এত কথা শুনে কেমন করে গ্রামে থাকবে সে!
সন্ধ্যা হয়ে আসা অন্ধকার আর কুয়াশার দিকে তাকিয়ে এসবই এখন ভাবছিল দবির। হামিদা যে তার হাত ধরে রেখেছে, কাতর অনুনয় করছে মেয়েকে খুঁজতে যাওয়ার, কিছুই খেয়াল করছে না।
