রাইন্ধা দিবো কেডা?
দিদি।
ফুলমতি?
হ।
মরনি একটু থেমে খুবই নরম গলায় বলল, আমি কুঁকড়া বেচুম না বাজান। তুই অন্যমিহি যা।
কথাটা শুনে নিখিল একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তয় আর কী করুম, আতাহাররে গিয়া কই। আতাহারের মনমিজাজ আইজ বহুত খারাপ। কুঁকড়া না পাইলে আরও খারাপ অইবো। রাইত্রে কোন বাইতে গিয়া খোয়াড় সুদ্দা লইয়াইবো কে জানে। চকে আইন্না কুঁকড়াডি বাইর কইরা খোঁয়াড়ডা হালাই থুইয়াইবো।
নিখিলের সঙ্গে কথা বলতে বলতে নূরজাহানকে নিয়ে পাওয়া ভয়টা কেমন যেন কমে আসছিল মরনির। এখন নিখিলের কথার ধরনে বুঝল নূরজাহানকে খুঁজতে তার বাড়িতে আসেনি নিখিল। সত্যি সত্যি মোরগ মুরগির জন্যই এসেছে। নয়তো এতক্ষণ ধরে এই একটা বিষয় নিয়ে কথা বলত না। তবে নিখিলের কথায় অন্য রকমের একটা ভয় মরনির হল। পয়সা দিয়ে কিনতে চাওয়ার পরও, এত করে বলবার পরও মরনি যখন দুইটা মুরগি বেচতে রাজি হয়নি, আতাহারের কথা শোনার পরও রাজি হয়নি, নিখিল গিয়ে নিশ্চয় আতাহারকে এসব বলবে। সব শুনে আতাহার খুব রাগ করবে। কষানো মুরগি খাওয়ার লোভ যখন তার একবার হয়েছে যেমন করে হোক তা সে খাবেই। এই বাড়িতে ড্যাকরা মুরগি আছে নিখিলের কাছ থেকে তা সে শুনবে। শুনে রাতে এসে যদি খোয়াড়টা তুলে নিয়ে যায়, কী করবে মরনি! যদি জানেও আতাহাররা কাজটা করেছে, কার কাছে বিচার দিবে! বিচার দিলেই বা লাভ কী! আতাহারের বিচার করবে কে! বিচার দিতে গেলে উলটো বিপদেও পড়বে মরনি। আতাহার তার শত্রু হয়ে যাবে। সে একা মানুষ বাড়িতে থাকে, রাতদুপুরে এসে আতাহার যদি ঘরে আগুন দেয়! চরের ডাকাতদের ঠিক করে যদি পাঠায় মরনির ঘরে ডাকাতি করতে! মজনু থাকে ঢাকায়। বাড়িতে আসার পর সেই ছেলের যদি ক্ষতি করে! যদি রাস্তাঘাটে ধরে ছুরি মেরে দেয়!
অন্য সব ভয় মন থেকে মুছে ফেলতে পারল মরনি, মজনুকে নিয়ে পাওয়া ভয়টা মুছতে পারল না। বুক কাঁপতে লাগল তার।
তারপর অন্যরকম করে ব্যাপারটা ভাবতে লাগল মরনি। যদি নিখিলের কথায় রাজি হয়ে দুইটা মোরগ মুরগি সে বিক্রি করে তা হলে নগদ সত্তর-আশি টাকা হাতে আসবে। নিখিল গিয়ে যখন আতাহারকে বলবে, কোনও বাড়িতে কুঁকড়া না পাইয়া মরনি পিসির কাছে গেছি। সে তর কথা কুঁকড়া বেচতে রাজি হইল। শুনে আতাহার নিশ্চয় মরনির ওপর খুশি হবে। তার বাড়িতে এসে খোয়াড় তুলে নিয়ে যাওয়ার কথা ভাববেই না। এমনকী নূরজাহানকে খুঁজতেও এই বাড়িতে আসবে না। সব দিকই রক্ষা হয় মরনির।
মরনি বলল, গেছস গা নিরে নিখিলা? বাইরে থেকে সাড়া দিল নিখিল। না পিসি। কই যামু, কী করুম কিছু বোজতাছি না। কুঁকড়া জোগাড় না করতে পারলে আমার উপরেও খুব চেতবে আতাহার। আমরা হিন্দু মানুষ। দেশগেরামে এমতে থাকি ডরে ডরে। তার উপরে যুদি আতাহার থাকে চেইত্তা, কেমুন বিপদ না? ফুলমতি দিদি বাইল্য বিধবা। বয়স তেমুন অয় নাই। আমার থিকা দুই-তিন বছরের মাত্র বড়। অরে লইয়া বাপ মায়ে তো চিন্তায় থাকে, আমিও থাকি। কোনহানদা কী অইয়া যাইবো, কে কইবো?
নিখিলের কথায় আশ্চর্য রকমের এক অসহায়ত্ব টের পেল মরনি। ফুলমতিকেও তার নূরজাহানের মতন মনে হল। মান্নান মাওলানার মুখে থুতু ছিটিয়ে যে বিপদে নূরজাহান আছে, কিছু না করেও যেন সেই একই বিপদে আছে ফুলমতি। একজোড়া কুঁকড়া বিক্রি করলে এই দুইজন মানুষকেও যেন উদ্ধার করতে পারে মরনি।
তবু আগের ভঙ্গিটা বজায় রাখার জন্য মরনি বলল, তুই তো দেহি ভাল এক ফাঁপরে হালাইলি আমারে।
আপনের কীয়ের ফাঁপর? ফাঁপরে পড়ছি আমি। আপনে কুঁকড়া বেচলে বেচবেন না বেচলে না বেচবেন।
হ আসল ফাঁপরডা তরঐ। তাও তুই আমার কাছে যহন আইছস, তর কথা হুইন্না আমিও ইট্ট ফাঁপরে পড়ছি।
ইচ্ছা করলেঐ আপনে আমারে এই ফাঁপর থিকা রেহাই দিতে পারেন।
কী করুম চিন্তা করতাছি।
আর চিন্তা কইরেন না। একশো টেকার একখান লোট দিতাছি। ডেকি দেইক্কা দুইডা কুঁকড়া দেন।
কোন দুইটা কুঁকড়া দেওয়া যায় মনে মনে চিন্তা করে ফেলেছে মরনি। তবে সেই দুইটার দাম সত্তর-আশি টাকার বেশি হবে না। একশো টাকা পেলে লাভটা ভালই হয়।
মরনি বলল, এমুন কইরা কথা কইতাছস, আর না করতে পারছি না। খাড়ো।
কথাগুলি বলেই আগের চিন্তাটা আবার হল মরনির। এসবই নিখিলের চালাকি না তো! সঙ্গে আতাহাররা দাঁড়িয়ে নাই তার সঙ্গে! নূরজাহানকে খুঁজতে আসেনি তো তারা!
কিন্তু এত কথা হয়ে যাওয়ার পর এখন আর দরজা না খুলে উপায় নাই।
মরনি একটা বুদ্ধি বের করল। ঢেউটিনের বেড়ায় নাটবল্টর ফুটা দুই-একটা থাকেই। দরজার দু’পাশের বেড়ায় আছেই। খুঁজে একটা বেরও করল মরনি। সেই ফুটা দিয়ে উঠানের দিকে তাকাল।
না আতাহাররা কেউ নাই। শুধু নিখিল অসহায় ভঙ্গিতে বসে আছে ঘরের সামনের তক্তায়।
খুদের হাঁড়ি থেকে একমুঠ খুদ আঁচলে নিল মরনি। অতি সাবধানে দরজা খুলল। একজন মানুষ কোনওরকমে গলতে পারে শুধু এটুকুই ফাঁক করল। বাইরে বেরিয়েই চটপটে হাতে শিকল তুলে দিল দরজায়। নিখিল এসবের কিছুই খেয়াল করল না।
আড়চোখে নিখিলের দিকে তাকাল মরনি, আঁচল থেকে খুদ তুলে উঠানে ছড়িয়ে দিল। সঙ্গে সঙ্গে বাড়ির উঠান পালানে চরে বেড়ানো মোরগ মুরগি সব ছুটে এল। দিকপাশ
