অন্য সময় হলে একথার জবাব দিত মরনি। বলত, ক্যা, ফুলমতি কয় না?
এখন ওইভাবে কথা বলবার সময় নাই। খুবই সাধারণ গলায় মরনি বলল, নিখিলা নিরে?
বাইরে থেকে সাড়া দিল নিখিল। হ।
বুকটা ধক করে উঠল মরনির। এসময় নিখিল এই বাড়িতে এল কেন! সে আতাহারের দোস্ত। দিনরাত আতাহারের সঙ্গে টো টো করে বেড়ায়। আতাহারকে ছেড়ে মরনির কাছে এল কেন! আতাহারই পাঠায়নি তো নিখিলকে! সারা গ্রাম খুঁজে নূরজাহানকে না পেয়ে আতাহাররা কি এখন একেকজন একেক বাড়িতে খুঁজতে বেরিয়েছে নূরজাহানকে! নিজে এক বাড়িতে গেছে, সুরুজকে আলমকে পাঠিয়েছে এক বাড়িতে, নিখিলকে পাঠিয়েছে এই বাড়িতে! যেখানেই থাকুক, কোথায় আছে নূরজাহান এটা শুধু জানা দরকার। তারপর কীভাবে নূরজাহানকে ধরতে হবে, কোন বাড়ির দরজা ভাঙতে হবে ওইসব তারা পরে দেখবে।
ভয়ে উৎকণ্ঠায় গলা শুকিয়ে গেল মরনির। কোনওরকমে সে বলল, কীর লেইগা?
নিখিল সরল গলায় বলল, কাম আছে।
কী কাম?
আছে। দুয়ার খোলেন, কইতাছি।
বাইরে থিকাই ক।
ক্যা, হুইয়া রইছেননি?
খানিক আগে ইয়াসিন সুরা পড়ছিল যে মানুষটি সে এখন নির্বিকার গলায় মিথ্যা বলল। হ, হুইয়া রইছি।
কষ্ট কইরা ইট্টু ওডেন। লাব অইবো।
কীয়ের লাব?
দুয়ার না খেললে কেমতে কই?
এসব নিখিলের চালাকি না তো! কোনও না কোনও অছিলায় মরনিকে দিয়ে দরজা খোলাচ্ছে সে। দরজা খুলবার পরই চট করে ঘরের ভিতর ঢুকে যাবে। চৌকির কাছে গিয়ে কথা তুলে দেখবে কে শুয়ে আছে।
আবার এমনও হতে পারে নিখিল শুধু একা আসেনি এই বাড়িতে। সঙ্গে আতাহারও আছে। আলম সুরুজও আছে। উঠানে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে তারা। কথা বলাচ্ছে শুধু নিখিলকে দিয়ে। মরনি দরজা খুলবার সঙ্গে সঙ্গে ঢুকে যাবে ঘরে। কাঁথার তলা থেকে বের করে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাবে নূরজাহানকে। মরনির চিৎকার চেঁচামেচি পাত্তা দিবে না।
এই পরিস্থিতিতে কী করবে মরনি? কেমন করে রক্ষা করবে নূরজাহানকে?
মরনি কাতর গলায় বলল, পরে আহিচ বাজান। আমি অহন উটতে পারতাছি না। শইলডা ভাল না।
নিখিল নরম গলায় বলল, হেইডা আমি বোজতাছি। তয় আমিও কোনও পথ না দেইক্কা আইছি। অনেক বাইত্তে বিচড়াইছি। পাই নাই দেইক্কাঐ আপনের কাছে আইছি।
নিখিলের কথা শুনে বুকের ধুকধুকানি আরও বেড়ে গেল মরনির। কোনওরকমে বলল, কী বিচড়াইতাছস?
কুঁকড়া (মোরগ, মুরগি)।
কথাটা যেন বুঝতে পারল না মরনি। বলল, কী?
কুঁকড়া, কুঁকড়া।
কীয়ের কুঁকড়া?
দুগগা কুঁকড়া কিনুম। বেইল নাই তো, অহন বাজারে গেলেও পামু না। যেই যেই বাইত্তে কুঁকড়া বেচে বেবাক বাইত্তেঐ গেছি। কেঐর কাছে নাই।
মরনি খুবই আন্তরিক গলায় বলল, হ্যরইত্তাগো বাইত্তে গেছস?
গেছি। নাই।
বেগির মা’র কাছে?
হ। ইননইত্তার মার কাছেও গেছি। কোনওহানে পাই নাই। শেষমেশ আইছি আপনের কাছে।
আমার কুঁকড়া নাই বাজান।
কন কী? এই যে দিহি উডানে কত কুঁকড়া? মিথ্যাটা ধরা পড়ার ফলে একটু থতমত খেল মরনি। তবে পলকেই তা সামলাল। হ আছে। তয় বেচি না।
না বেইচ্চা এতো কুঁকড়া দিয়া কী করেন?
পাইল্লা পুইল্লা ডাঙ্গর করি। ডাঙ্গর অওনের পর আন্ডা পাড়ে।
আন্ডাও তো আপনে বেচেন না!
না। উমে বহাই। ছাও অয়।
এমতে চললে তো বাড়িঘর কুঁকড়ায় ভইরা যাইবো।
যাউক।
মজনুরে কুঁকড়া জব কইরা খাওয়ান না?
পোলায় চাইলে খাওয়াই।
তয় আরেক পোলায় যে আইজ চাইতাছে অরে খাওয়াইবেন না ক্যা?
কথাটা বুঝতে পারল না মরনি। বলল, কোন পোলায়?
যেই পোলাডা এতক্ষুন ধইরা দুয়ারের সামনে খাড়ইয়া ঘেংটি (অনুনয়, বিনয়) পাড়তাছে। বইনের পোলা আর ভাইয়ের পোলা তো একরকম। বইনের পোলায় কয় মাসি, ভাইয়ের পোলায় কয় পিসি। আমরা হিন্দু অইছি তো কী অইছে, বাবায় তো আপনেরে বইন কয়। আমি তো আপনেরে পিসি কই।
এবার নিখিলকে মৃদু একটা ধমক দিল মরনি। এত প্যাচাইল পারিচ না ছেমড়া, অন্য বাইত্তে যা।
নিখিল একটুও দমল না। বলল, কোন বাইত্তে যামু কইয়া দেন। যাই।
ফকির বাড়ি যা।
গেছি। পাই নাই।
কেরফাইন্নার বাড়ির উলটামিহি, খালের ওইপারে, হযরতগো বাড়ির পশ্চিমের বাইত্তে এক বুড়ি থাকে। ম্যালা কুঁকড়া পালে বুড়ি। হুনছি কুঁকড়া বেইচ্চাঐ খায়।
আর কওন লাগবো না। হেই বাইত্তেও গেছি। ড্যাকরা ড্যাকরি একখানও নাই। তিনডা বুড়া কুঁকড়া আছে। উমে বইছে। উমা কুঁকড়া খাওন যায়নি? গোস্ত অয় ঘোড়ার গোস্তের লাহান।
মরনি কথা বলে না, চুপ করে থাকে।
নিখিল খুবই মায়াবী গলায় ডাকল, পিসি।
ক।
দুগগা কুঁকড়া বেচেন। উপায় না দেইক্কা আপনের কাছে আইছি। জানি কুঁকড়া আপনে বেচেন না। তাও আইছি। বিপাকে পইড়াঐ আইছি।
বাইত্তে মেজবান আইছেনি?
না। দরকার আমগো বাড়ির না।
তয় কোন বাড়ির লেইগা কুঁকড়া বিচড়াইতাছস?
কোনও বাড়ির লেইগা না। আতাহারের লেইগা।
আতাহারের নাম শুনে কেঁপে উঠল মরনি। আড়চোখে একবার চৌকির দিকে তাকাল। কাঁথার তলায় নূরজাহান কুঁকড়েমুকড়ে আছে। নিখিলের গলা শুনে যতটা কুঁকড়ে ছিল আতাহারের নাম শুনে আরও কুঁকড়েছে।
নূরজাহানের কারণেই যেন আতাহারকে নিয়ে কথা বলতে চাইল মরনি। বাড়ির কামে যুদি না লাগে তয় কুঁকড়া দিয়া আতাহার করবো কী?
ওইযে কনটেকদার সাবে আছে, সড়কে মাডি হালাইতাছে, তার ঘরে বইয়া কষাইন্না গোস্ত খাইবো।
