বউয়া বেড়ে রাখার কথা ভুলে গেল মরনি। ক্ষুধার কথা ভুলে গেল। দিশাহারা ভঙ্গিতে গালে কপালে হাত বুলাতে লাগল নূরজাহানের। চাপা উদ্বিগ্ন গলায় ডাকতে লাগল, নুরজাহান ও নূরজাহান। হোন না? ও নূরজাহান!
নূরজাহান নড়ে না, সাড়া দেয় না।
নিজেকে নিজে মরনি বলল, মনে হয় দাঁত লাইগ্গা গেছে।
নূরজাহানের মুখের উপর ঝুঁকে দুইহাতে নূরজাহানের মুখটা ফাঁক করল মরনি। দাঁতে দাঁত লেগে আছে কি না দেখল। দেখে আশ্বস্ত হল। না দাঁত লাগেনি। শুধু বেহুঁশই হয়েছে। হয়তো আচমকা কাঁপিয়ে এসেছে জ্বর। জ্বরের ধাক্কা সামলাতে না পেরে বেহুশ হয়ে গেছে। প্রচণ্ড ভয় পেলে কোনও কোনও মানুষের এমন জ্বর আসে। জ্বরটা বেশি আসে অল্প বয়সি পোলাপানের।
নূরজাহানকে নিয়ে এখন কী করবে মরনি! কেমন করে সামলাবে মেয়েটিকে! কেমন করে তার জ্বর কমাবে, হুশ ফেরাবে! এই অবস্থায় মাথায় পানি ঢালা ছাড়া কোনও উপায় নাই। কিন্তু পানিটা মরনি দিবে কী করে! বালতি ভরা পানি দরকার, বদনা দরকার। সব ব্যবস্থা করে পানি না হয় দিল, ভিতর থেকে দরজাও বন্ধ করে রাখল ঘরের কিন্তু পানি দেওয়ার শব্দটা! বদনার নল দিয়ে বেহুঁশ মেয়েটির মাথায় যখন পানি ঢালতে থাকবে সেই পানি এসে পড়বে বালতির পানিতে, ছরছর একটা শব্দ হবে, সেই শব্দে যে কেউ অবাক হবে। ঘরের ভিতর শব্দ কীসের?
যদিও তেমন কেউ এই বাড়িতে আসে না, বাড়িটা নির্জন পড়ে থাকে। তবু সাবধান থাকতে হবে মরনির। লোকে যদি জেনেই যায় নূরজাহানকে নিজের ঘরে লুকিয়ে রেখেছে। মরনি তা হলে আর লাভ হল কী! সব চেষ্টাই তা হলে বিফলে গেল! এদিকে মাথায় পানি না দিয়েও উপায় নাই। যেরকম জ্বর, মাথায় পানি দিয়ে এই জ্বর না কমালে হুঁশ ফিরবে না নূরজাহানের। জ্বরের চোটে মাথার রগ ছিঁড়ে যাবে। মাথার রগ ছিড়লে নূরজাহানকে আর বাঁচাতে পারবে না কেউ।
যদি বাঁচানোই না গেল তা হলে আর লুকিয়ে রেখে লাভ কী! এক মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচাতে গিয়ে আরেক মৃত্যুর হাতেই যদি সঁপে দেওয়া হয় মেয়েটিকে, তা হলে আর লাভ কী!
তবু সবদিক সামলে নূরজাহানকে বাঁচিয়ে রাখতে চাইল মরনি। বালতি ভরে পানি আনতে পুকুরঘাটে গেল না। ঘরের কোণ থেকে পুরানা বালতিটা নিয়ে, নাড়া দিয়ে তৈরি। বিড়ার ওপর রাখা খাওয়ার পানির ঠিলা থেকে আধা ঠিলা পানি বালতিতে ঢেলে চৌকির কাছে এনে রাখল। নিঃশব্দে দরজা খুলে যতদূর চোখ যায় একবার দেখে চট করে পানি ভরতি বদনাটা ঘরে এনে আবার দরজা লাগিয়ে দিল। তারপর অচেতন নূরজাহানকে হাছড় পাছড় করে টেনে তার মাথাটা চৌকির বাইরের দিকে এনে, মাথার তলায় পানির বালতি রেখে শব্দ যতটা বাঁচিয়ে পারা যায় বাঁচিয়ে বদনার নল দিয়ে পানি ঢালতে লাগল। একহাতে পানি ঢালে আরেক হাতে নূরজাহানের মাথার ঘন চুলে বিলি কেটে পানিটা যেন মাথার তালুতে গিয়ে লাগে সেই ব্যবস্থা করে। চুলের জটে আটকে পানি যদি তালুতে না লাগে তা হলে লাভ কী! তালু ঠান্ডা না হলে জ্বর কমবে না। রগ ছিড়া ঠেকানো যাবে না।
ছরছর শব্দে বদনার পানি নূরজাহানের তালু ভিজিয়ে মাথার তলায় রাখা বালতিতে গিয়ে পড়ে। স্বচ্ছ পানি অস্বচ্ছ হয়। জ্বরের তাপ ধুয়ে দেওয়ার ফলে শীতলতা কমে আসে পানির। তবু সেই পানি আবার বদনা ভরে তোলে মরনি, আবার ঢালে নূরজাহানের মাথায়। পানি ঢালে আর বিড়বিড় করে সুরা ইয়াসিন পড়ে। ইয়া-সীন। ওয়াল কুরআনিল হাকীম। ইন্নাকা লামিনাল মুরসালীন। আ’লা সিরাত্বিম মুসতাক্বীম। তানযীলাল আযীযির রাহীম।
অদূরের মেঝেতে টিনের থালায় পড়ে থাকে বউয়া, বাইরে গম্ভীর হয়ে ওঠে শীতের বিকাল, পেটের ক্ষুধা পেটেই মরে যায়, কোনও কিছুই যেন খেয়াল থাকে না মরনির।
দশ-বারো বদনা পানি মাথায় ঢালার পর হঠাৎ করেই যেন নূরজাহানের চোখের দিকে তাকায় মরনি। তাকিয়ে চমকে ওঠে। কোন ফাঁকে চোখ মেলে তাকিয়েছে নূরজাহান। এমন অসহায় কাতর চোখে তাকিয়ে আছে মরনির মুখের দিকে, একবারও যেন পলক পড়ে না। সেই চোখে।
নূরজাহানের জ্ঞান ফিরেছে দেখে বুকে চেপে থাকা ভয় কেটে গেল মরনির। মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। বদনা বালতির পাশে নামিয়ে রেখে যেন নিজের কাছে নিজে বলছে এমন স্বরে বলল, আল্লায় রহম করছে। উস অইছে।
নূরজাহানের চোখে তবু পলক পড়ে না। আগের মতোই মরনির মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। সেই চোখের দিকে তাকিয়ে গভীর মমতায় বুক ভরে যায় মরনির। নূরজাহানের মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলে, কী গো মা, এমুন কইরা চাইয়া রইছ ক্যা?
নূরজাহান কথা বলবার আগেই দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে কে ডাকল, পিসি ও পিসি।
মরনি নূরজাহান দু’জনেই চমকে উঠল। এতক্ষণের মায়াবী চোখ ভয়ার্ত হয়ে গেল নূরজাহানের। কাঁথার ভিতর থেকে হাত বের করে দুইহাতে মরনির একটা হাত আঁকড়ে ধরল। জ্বরে তখনও পুড়ছে হাত কিন্তু মরনি তা খেয়াল করল না। প্রথমে দিশাহারা হল, তারপর ফিসফিস করে বলল, তুই ডরাইচ না। আমি বুজছি কেডা। কাতা মুড়া দিয়া চুপচাপ পইড়া থাক। আমি দেখতাছি।
নিজেই কাঁথা দিয়ে আগের মতো ঢেকে দিল নূরজাহানকে। গলা চড়িয়ে জিজ্ঞস করল, কেডা রে, আ?
বাইরে থেকে সাড়া এল, আপনে আমারে চিনতাছেন না পিসি? এই গেরামে আমি ছাড়া কেডা আপনেরে পিসি ডাকে?
