দবির বলল, দেহনের কাম নাই। হুজুরে কি মিছা কথা কইবোনি?
হামিদা কিছু একটা বলতে চাইল, চোখ পাকিয়ে দবির তার দিকে তাকাল। আর একটাও কথা না, ল বাইত্তে ল।
হামিদা কাতর গলায় বলল, আমার মাইয়া?
মাইয়া জাহান্নামে।
২.২ শীতের বেলা
শীতের বেলা ফুরাতে সময় লাগে না। দুপুর শেষ হওয়ার আগেই বিকাল হয়ে যায়। আজ যেন আরও তাড়াতাড়ি হল।
রান্না শেষ করে চুলার আগুন নিভিয়ে দিয়েছে মরনি কিন্তু বউয়ার হাঁড়ি নামায়নি। আগুন নিভে যাওয়ার পরও তাপ থেকে যায় চুলায়। সেই তাপে হাঁড়ি রেখে ঘাটপারে গেছে গোসল করতে। ঝপাঝপ কয়েক বদনা পানি ঢেলেছে মাথায়। কাপড় ছায়া বদলে, ব্লাউজ বদলে গামছা ভিজা চুলে জড়িয়ে একহাতে এক বদনা পানি, অন্যহাতে চিপড়ানো কাপড়চোপড় নিয়ে উঠোনে এসেছে। ভিজা কাপড় উঠানের তারে মেলে দিয়ে, পানির বদনা দরজার সামনে রেখে ঘরের তালা খুলেছে তারপর বউয়ার হাঁড়ি নিয়ে ঘরে এসেছে। ভিতর থেকে দরজা বন্ধ করে দুইজন মানুষের জন্য বউয়া বেড়েছে টিনের থালায়।
চৌকির উপর কাঁথা মুড়া দিয়ে একই ভঙ্গিতে শুয়ে আছে নূরজাহান। একটুও শব্দ করছে না। এমনকী তার শ্বাসপ্রশ্বাসের শব্দ পর্যন্ত পাওয়া যায় না।
এমন নিঃসাড়ে কেমন করে ঘুমায় মানুষ!
নাকি ভয়ে আতঙ্কে নড়তে ভুলে গেছে নূরজাহান! শব্দ করা তো দূরের কথা শ্বাসপ্রশ্বাস ফেলতেও ভয় পাচ্ছে!
প্রথমে যে থালায় বউয়া বেড়েছে মরনি থালাটা মজনুর। মজনু ছাড়া আর কাউকে কখনও এই থালায় খেতে দেয়নি সে। আজ ঘোরের মধ্যে আছে বলে কি নূরজাহানের জন্য মজনুর থালায় বউয়া বাড়ল! নাকি মজনুর মতো নূরজাহানের জন্যও আছে তার গভীর মমতা! অপত্যস্নেহ! নাকি সেই যে বোনের মৃত্যুর পর অসহায় শিশু মজনুকে যেমন করে বুকে আশ্রয় দিয়েছিল, বুকের তাপে যেমন করে বাঁচিয়ে রেখেছিল তাকে, আজ বহুকাল পর ঠিক সেই সময়ের মতো আরেকটি সময় এসেছে। মজনুর মতো আরেকটি অসহায় শিশু এসে আশ্রয় নিয়েছে তার বুকে। তাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্যই কি মজনুকে আর নূরজাহানকে নিজের অজান্তেই একাকার করে ফেলেছে মরনি! এজন্যই কি মজনুর থালায় নূরজাহানের জন্য বউয়া বাড়ল!
একবার মজনুর কথা মরনির মনেও হল। সেই যে বাড়ি থেকে গেল ছেলেটি তারপর আর কোনও খোঁজখবর নাই। একটা পত্র তো লেকতে পারে, একটা সমবাত তো দিতে পারে কেঐর কাছে! মা’র মন যে পোলার লেইগা কান্দে পোলায় সেইটা বোঝে না। পোলা কাছে নাই, মা’র যে খাইতে পরতে মন চলে না, সংসার কর্মে উদাসীনতা, বিছানায় শুয়ে ঘনঘন দীর্ঘশ্বাস পড়ে, ঘুম আসে না, ছেলে এসব বোঝে না কেন! বুকের ধন চোখের আড়াল হলে তাকে নিয়ে কত কুডাক ডাকে মায়ের মন! ছেলের কোনও বিপদ আপদ হল কি না, জ্বরজ্বারি অসুখবিসুখ হল কি না, এসব ভেবে গভীর রাতে ঘুম ভেঙে মায়ের যে চোখ ভেসে যায়, ছেলে কেন এসব বোঝে না! কেন পত্র লেখে না মা’কে! কেন কোনও খবর দেয় না!
বউয়া বেড়ে নূরজাহানকে ডাকতে যাওয়ার আগে মনে মনে একবার মজনুকে ডাকে মরনি। বাজান রে, ও বাজান, আমার কথা তর মনে অয় না? আমি তর আপনা মা না দেইখা আমার কথা তুই ভুইলা থাকস? আমি তো তর কথা ভুলি না বাজান। আমি তো হারাদিন হারারাইত খালি তর কথা মনে করি। মনে মনে খালি তর নাম লই। আমি তর আপনা মা না অইতে পারি, তুই আমার আপনা পোলা। তর লাহান আপনা আমার আর কেঐ নাই।
চৌকির সামনে দাঁড়িয়ে মরনি তারপর নূরজাহানকে ডাকে। নূরজাহান, ও নূরজাহান।
দুইবার ডাকার পরই চমকায় সে। হায় হায় এতো জোরে ডাক পাড়ন তো ঠিক অয় নাই! কে কোনহানদা (কোনখান দিয়ে) হুইন্না হালাইবো! তাইলে আর এতকষ্ট করলাম ক্যা? ঘরের ভিতরে কাতাকাপড়ের নীচে হামলাইয়া (সামলিয়ে) থুইলাম, দুয়ারে তালা দিয়া থুইলাম, মাইনষে যুদি হুইন্নাই হালায়, বুইজ্জাই যায় তাইলে আর লাব অইলো কী?
মরনি গলা নামায়, সাবধানি স্বরে ডাকে, নূরজাহান, নূরজাহান। ও নূরজাহান, ওঠ মা। ওঠ। বউয়া রানছি। দুগগা (দুটো) মোকে দে।
নূরজাহান সাড়া দেয় না, নড়ে না।
মরনি আবার ডাকে। নূরজাহান, ও নূরজাহান।
নূরজাহান তবু সাড়া দেয় না।
কাঁথার উপর দিয়ে আস্তে করে নূরজাহানকে ধাক্কা দেয় মরনি। কী রে হোনচ না? কত ঘুমাচ? ও নূরজাহান।
তবু সাড়া নেই নূরজাহানের। তবু সে নড়ে না।
এবার একটু চিন্তিত হল মরনি। কী অইলো? মাইয়াডা লড়েচড়ে না ক্যা? ডরে ভয়ে বেউস অইয়া গেলনি? দাঁত লাইগ্না (দাঁত কপটি) গেলনি?
নূরজাহানের মাথার দিক থেকে কাঁথা সরায় মরনি। মুখটা বের করে নূরজাহানের। চোখ বুজে পড়ে আছে নূরজাহান। মুখ শুকনা, ফ্যাকাশে। ভয়ানক এক ভয় এবং আতঙ্ক ঘুমঘোরেও যেন মুখ ছেড়ে যায়নি নূরজাহানের। বটের ছায়ার মতো ছায়া ফেলে রেখেছে মুখে। এই মুখের দিকে তাকিয়ে বুক তোলপাড় করে উঠল মরনির। মনে মনে নূরজাহানকে সে বলল, ক্যান এমুন কাম করলি তুই! ক্যান নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মারলি! ক্যান এমুন বিপদ ডাইক্কা আনলি! অহন যে ডরে ভয়ে মরতাছস অহন তরে কে বাঁচাইবো!
আবার আল্লাহকে ডাকে মরনি। ইয়া হে আল্লাহ, তোমার রহমতের দুয়ার এই মাইয়াডার লেইগা খুইল্লা দেও। মাইয়াডারে তুমি বাঁচাও।
আল্লাহকে ডাকতে ডাকতে কোন ফাঁকে নূরজাহানের কপালে হাত রেখেছে মরনি। রেখেই চমকে উঠেছে। যেন নিজের অজান্তে চিতইপিঠা ভাজার তপ্ত খোলা ছুঁয়ে দিয়েছে। হায় হায় এমুন গরম ক্যা শইল? এমুন জ্বর আইলো কুনসুম? জ্বরে বেউস হইয়া গেছেনি মাইয়াডা? এর লেইগাই আমার ডাক হোনে নাই! আমি যে ডাক পারতাছি এর লেইগাই উদিস পায় নাই!
