আপনেরা।
কী? কই বাইন্দা থুইছি?
এই বাইত্তেই।
কে কইছে?
পয়লা আমি আন্তাজ করছি। তারবাদে আতাহারে স্বীকার করছে।
হামিদার কথা শুনে আতাহার একেবারে বেকুব হয়ে গেল। কী স্বীকার করছি আমি?
এবার আতাহারকে আর আপনি করে বলল না হামিদা। তুমি করে কঠিন ভঙ্গিতে বলল, ওই যে আমি যহন কইলাম মাইয়াডারে ছাইড়া দেও, তুমি কইলা, না, অর কোনও ছাড়াছাড়ি নাই। কও নাই?
হ কইছি। তয় হেইডা আর এইডা তো এক কথা না। কয় কথা?
দুই কথা।
আমি মনে করছি অর উপরে য্যান শোধ না লই, অরে য্যান মাপ কইরা দেই, ছাইড়া দেই।
না এইডা তুমি কও নাই। কথার তালে আসল কথা কইছো। আমার মাইয়া এই বাইত্তেঐ আছে। কোন ঘরে অরে তোমরা বাইন্দা থুইছো কও। তোমগো মতলব আমি বুঝছি। মাইয়া না লইয়া এই বাইতথন আমি যামু না। দরকার অইলে হারারাইত এই উড়ানে আমি বইয়া থাকুম। দরকার অইলে গেরামের বেবাক মাইনষেরে এই বাইত্তে ডাইক্কা লইয়ামু। কমু মাইয়ায় অন্যাই করছে তার বিচার করেন আপনেরা, কিন্তুক ডাঙ্গর মাইয়া বাইত্তে বাইন্দা থুইবো হেইডা অইব না। যদি আমার মাইয়ার অন্য রকমের কোনও খেতি হয়?
হামিদার কথা শুনে মান্নান মাওলানা এবং আতাহার দুইজনেই বিব্রত হল। দুইজন দুইজনার মুখের দিকে তাকাল। মান্নান মাওলানা কপাট ছেড়ে উঠানে নেমে এলেন। পায়ে খড়ম। খড়মে চটর পটর করে শব্দ হল।
উঠানে নেমে লুঙ্গি একটুখানি তুলে পরলেন তিনি। পেটের কাছে টাইট হয়ে থাকা ফ্লানেলের পাঞ্জাবি তুলে নাভির কাছে গিঁট দিলেন লুঙ্গি। তারপর পাঞ্জাবি ছেড়ে প্রথমে হামিদার দিকে পরে দবিরের দিকে তাকালেন। তর পরিবারের কি মাথা খারাপ অইছে। নিরে দউবরা? আবল তাবল প্যাচাইল পাড়ে। অন্যাই তর মাইয়ায় করছে, বেদম অন্যাই করছে, এই অন্যাইয়ের কোনও মাপ নাই, হের লেইগা তর মাইয়ারে আমি বাইত্তে আইন্না বাইন্দা থুমুনি?
দবির কথা বলবার আগেই, আগের মতো তেজালো গলায় হামিদা বলল, হ থুইছেন।
এবার গলা আর আগের মতো গম্ভীর রইল না মান্নান মাওলানার। চড়ল। হামিদাকে তিনি তুই-তোকারি শুরু করলেন। তুই কইলেঐ অইবোনি?
হামিদাও কম গেল না। হ আমি কইলেঐ অইবো।
না অইবো না।
অইবো।
যদি তর মাইয়া এই বাইত্তে না থাকে তাইলে কী অইবো?
আমার মাইয়া এই বাইত্তেঐ আছে।
আগে ক, যুদি না থাকে তাইলে তুই কী করবি?
তয় আমার মাইয়া গেল কই?
হেইডা জানন আমার কাম না। আমার মোকে ছ্যাপ ছিড়াইয়া দৌড় দিছে। কই গেছে তরা সেন জানচ।
না জানি না। মাইয়া বাইত যায় নাই। হেই টাইমে দৌড় দিছে ঠিক তারবাদে আপনেরা আমার মাইয়ারে ধইরা আনছেন।
কই থিকা?
আমি কেমতে কমু?
এত কিছু কইতে পারতাছস এইডা কইতে পারবি না? কই থিকা ধইরা আনছি ক?
মান্নান মাওলানার এসব কথার ধার দিয়েও গেল না হামিদা। আপন মনে বলল, যহন ছ্যাপ ছিড়াইয়া দৌড় দিছে তহন আপনেরা অরে কিছু কন নাই। দৌড়াইয়া গিয়া ধরেন নাই অরে। মাকুন্দারে পুলিশ দারগায় লইয়া যাওনের পর বিচড়াইয়া বাইর করছেন আমার মাইয়ারে। ধইরা আইন্না এই বাইত্তে বাইন্দা থুইছেন।
হামিদার কথা শুনে বাঘের চোখের মতো ধক ধক করে জ্বলতে লাগল মান্নান মাওলানার চোখ। সেই চোখে পলক না ফেলে খানিক হামিদার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন তিনি। ধীর শান্ত কঠিন গলায় বললেন, তুই কইলাম সীমানা ছাইড়া যাইতাছস! আমার মোকে ছ্যাপ ছিড়াইয়া তর মাইয়ায় যেই অন্যাই করছে তুই করতাছস তার থিকা বড় অন্যাই। যেই কামনা করছি হেই কামের লেইগা দোষারোপ করতাছস। বেবাক মাইনষের সামনে কইছিলাম তর মাইয়া নাদান, অরে আমি মাপ কইরা দিলাম। তর লেইগা মাপটা আমি করুম না। না ধইরা আইন্না যহন বদলাম অইছে তয় তর মাইয়ারে কইলাম ঠিকই আমি ধইরা আনুম। ঠিকঐ বাইন্দা থুমু বাইত্তে।
সঙ্গে সঙ্গে ধাক্কা মেরে হামিদাকে সরিয়ে দিল দবির। নিজে হাতজোড় করে দাঁড়াল মান্নান মাওলানার সামনে। অর কথা আপনে ধইরেন না হুজুর। ডরে ভয়ে অর মাথা খারাপ অইয়া গেছে। কী কইতে কী কইতাছে বোজতে পারতাছে না।
না বেবাক কথা বুইজ্জাঐ কইতাছে। এইডা তগো দুইজনের ষড়যন্ত্র।
কীয়ের ষড়যন্ত্র হুজুর?
মাইয়া তগো বাইত্তেঐ আছে। তারবাদেও তরা আমার কাছে আইয়া উলটা দোষ দিয়া আমারে ফাঁপরে হালানের চেষ্টা করলি। এই হগল কায়দা আমি বুজি। তরা তিনডাঐ বদমাইশ। তর থিকা তর পরিবারে ইট্টু বেশি, তার থিকা বেশি মাইয়াডা। তর পরিবারের কথা হুইন্না আইজ আমি বুঝছি তর মাইয়াডা নষ্ট অইছে এই মাগির লেইগা। মা নষ্ট না অইলে মাইয়া নষ্ট অয় না।
পিতলের বদনা ভরা গরম পানি নিয়ে রহিমা তখন দ্রুত পায়ে উঠান পেরুচ্ছে। বারবাড়ির পশ্চিমকোণে চ্যাপটা পাথরখানার ওপর বদনা রাখবে। সেখানে বসে অজু করবেন মান্নান। মাওলানা। বদনার মুখ দিয়ে নল দিয়ে হু হু করে বেরুচ্ছে সাদা বাষ্প। সেদিকে একবার তাকিয়ে মান্নান মাওলানা বললেন, তয় মনে যহন মাগির অইছে যে অর মাইয়া আমি এই বাইত্তে বাইন্দা থুইছি, বাড়ির বেবাক ঘর আমি খুইল্লা দিতাছি, দেক কোন ঘরে আছে মাইয়া।
ছেলের দিকে তাকালেন তিনি। আতাহার, পুরা বাড়ি অগো দেহা। বেবাক ঘর দেহা। তয় মাইয়া যুদি এই বাইত্তে না পাঁচ তয় তগো কপালে শনি লাগলো। তগো আমি খাইয়ালামু।
মান্নান মাওলানা আর দাঁড়ালেন না। খড়মে চটর পটর শব্দ তুলে বারবাড়ির দিকে চলে গেলেন। দবির-হামিদার দিকে তাকিয়ে আতাহার বলল, আয় আমার লগে। বাড়ির বেবাক ঘর দেক।
