আতাহার খুবই শ্লেষের হাসি হাসল। তর মোক চাইয়া? তর মোক কি চামুরে? মোক তো পেতনির লাহান। এমুন মোকের মিহি আমি চাই না।
আতাহারের কথা শুনে রহিমার পাশে দাঁড়ানো হাসু ফিক করে একটু হাসল। সেই হাসি দেখে ফেলল আতাহার। চোখ পাকিয়ে এমন করে তাকাল হাসুর দিকে, ভয়ে মুখ শুকিয়ে গেল হাসুর। চট করেই উঠানের দিক থেকে চোখ সরাল সে। আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল।
হামিদা এসবের কিছুই খেয়াল করল না। আগের মতোই কাতর গলায় বলল, আপনে আমারে যা করতে কন তাই করুম, আমার মাইয়াডারে ছাইড়া দেন।
আতাহার গম্ভীর গলায় বলল, না, অর কোনও ছাড়াছাড়ি নাই।
কথাটা শুনে চমকে উঠল দবির। চট করে আতাহারের মুখের দিকে তাকাল, হামিদার মুখের দিকে তাকাল। হামিদাও তখন তাকিয়েছে দবিরের মুখের দিকে। চোখে এমন দৃষ্টি তার, যেন নিঃশব্দে বলছে, কী, কইছিলাম না এই বাইত্তে আছে নূরজাহান! এই বাইত্তেঐ মাইনষের চোক্কের আঐলে (আড়ালে) অরে বাইন্দা ধুইছে মাওলানা সাবে! অহন সত্য অইল আমার কথা!
মুখে হামিদা বলল, তুমি এমুন থোম (থম) ধইরা রইছো ক্যা? ও নূরজাহানের বাপ, কও না, আতাহার বাজানরে কও না মাইয়াডারে ছাইড়া দিতে। শাসন যা করনের এই বাইত্তেঐ কইরা যাই মাইয়ারে। হুজুরের পায়ে ধইরা মাপ লওয়াই। আতাহার বাজানের পায়ে ধইরা মাপ লওয়াই। মাইয়ার লগে আমরা দুইজনেও ধরুম নে তাগো পাও। এইডা ছাড়া আর কী করনের আছে আমগো! যুদি আর কিছু করনের থাকে, কইতে কও। তারা যা কইবো তাই করুম। আমার মাইয়াডারে ছাইড়া দেউক।
দবির কথা বলবার আগেই পুবের ঘরের আবজানো দরজা আস্তে করে খুললেন মান্নান মাওলানা। নিঃশব্দে দাঁড়াতে চাইলেন দরজার সামনে কিন্তু ঘন করে আলকাতরা দেওয়া কপাটে করর করে শব্দ হল। সেই শব্দে উঠানের তিনজন মানুষ একসঙ্গে তাকাল পুবের ঘরের দরজার দিকে। ব্যস্ত হাতে মাথায় দেয়া ঘোমটা আবার টানল হামিদা। যেন দেওয়া ঘোমটাই আবার দিতে চাইল মাথায়। দবির কীরকম লজ্জিত হল। একবার মান্নান মাওলানার। মুখের দিকে তাকিয়েই চোখ উঠোনের মাটিতে নামাল সে। আতাহারের রুক্ষমুখ সামান্য কমনীয় হল। উত্তরের ঘরের ওটার সামনে দাঁড়ানো রহিমা আর হাসু ছটফটে ভঙ্গিতে চলে গেল রান্নাঘরের দিকে। পারুল নিঃশব্দে তার ছেলেমেয়েদের সরিয়ে দরজা বন্ধ করল। শুধু ফিরোজারই কোনও ভাবান্তর নেই। সে আগের মতোই ঘরের পেছন দিককার কোণে দাঁড়িয়ে উঁকি মেরে আছে উঠানের দিকে। মান্নান মাওলানাকে সে দেখতে পায়নি। মান্নান মাওলানা যখন গম্ভীর গলায় বললেন, কী অইছে? এত চিল্লাচিল্লি কীয়ের? শোনার সঙ্গে সঙ্গে বিষপিঁপড়ার কামড় খাওয়া মানুষের মতো আঁতকে উঠল ফিরোজা। কোনওদিকে না তাকিয়ে এক দৌড়ে মন্তাজদের বড়ঘরের দিকে চলে গেল।
কিন্তু মান্নান মাওলানার প্রশ্নের উত্তর দবির-হামিদা দিল না। দিল আতাহার। রুক্ষগলা নরম করে বলল, দউবরা আর অর বউ আইছে মাইয়ার লেইগা মাপ চাইতে। আমি অগো লগে কথা কইতাছি।
কথা কওনের কিছু নাই। যাইতে ক গা।
কইছি, যায় না।
ক্যা?
খালি প্যাচাইল পাড়ে।
প্যাচাইল পাইড়া লাব নাই।
আমিও কইছি। হোনে না। দউবরা কথা কয় না, কয় খালি বউডা। ভারী প্যাচাইলা বেডি।
যাইতে ক। আমার নমজের সমায় অইছে। আয়জান দিয়া নমজ পড়ুম অহন।
পিছন ফিরে তাকালেন মান্নান মাওলানা। আতাহারের মা, রহিরে কও আমার অজুর পানি দিতে।
বাইরে থেকে আতাহারের মা তহুরা বেগমকে দেখা যাচ্ছিল না। স্বামীকে কী বললেন তিনি তাও শোনা গেল না। তবে মান্নান মাওলানা তার সঙ্গে আর কথা বললেন না। আতাহারকে বললেন, রহিরে ক অজুর পানি দিতে।
রান্নাঘরের দিকে তাকিয়ে গলা উঁচিয়ে রহিমাকে ডাকল আতাহার, অজুর পানি দিতে বলল। তারপর তাকাল দবিরের দিকে। বাবার কথা তো হুনলিঐ। যা অহন।
দবির কথা বলবার আগেই হামিদা কীরকম আবদারের গলায় বলল, মাইয়া না লইয়া। যামু না।
মান্নান মাওলানার দিকে তাকাল সে। মাথার ঘোমটায় মুখের অনেকখানি ঢেকে বলল, হুজুর, বহুত আশা কইরা আপনের কাছে আইছি আমি। আপনেরে আমার কওনের কিছু নাই। খালি একখান কথা কই, না বুইজ্জা কেঐ কোনও অন্যাই করলে আল্লায়ও তারে মাপ করে। আপনে অইলেন আল্লার খাসবান্দা। আমার নাদান মাইয়াডারে আপনে মাপ কইরা দেন।
হামিদার সবকথা মান্নান মাওলানা বোধহয় শুনলেন না। শুনলেও পাত্তা দিলেন না। পাত্তা দিলেন একটি মাত্র কথা। না বুইজ্জা অন্যাই মাইনি কী?
কথাটার উত্তর দিতে গেল হামিদা তার আগে হাত তুলে তাকে থামালেন মান্নান। মাওলানা। তুমি চুপ কর। বেগানা মাইয়া ছেইলার লগে কথা আমি কই না। গুণা অয়। দউবরা, তুই ক। অন্যাইডা কি তর মাইয়ায় না বুইজ্জা করছে?
দবির মাথা নিচু করে বলল, হ হুজুর।
না। বুইজ্জাই করছে। বড় বানকাউর মাইয়া। আমারে একদিন রাজাকার কইছিলো। হেইডাও বুইজ্জাই কইছিলো। বুইজ্জা যে অন্যাই করে তারে কইলাম আল্লায় মাপ করে না। এইডা তর বউরে ক।
কওন লাগবো না। হেয় হোনছে।
তয় আর খাড়ঐ রইলি ক্যা? যা গা।
হামিদা হঠাৎ কীরকম ফুঁসে উঠল। মান্নান মাওলানার মুখের দিকে তাকিয়ে দৃঢ় গলায় বলল, মাইয়া না লইয়া যামু না।
হামিদার ভঙ্গি দেখে মান্নান মাওলানা একটু থতমত খেলেন। না লইয়া যাইবা না মাইনি? কে বাইন্দা থুইছে তোমার মাইয়ারে?
