দবির কিছুই বুঝতে পারে না। তার মন মাথা ফাঁকা হয়ে যায়।
কিন্তু হামিদার কথা শুনে তখন আরও রেগেছে আতাহার। তিন শরিকের পুরা বাড়ি কাঁপিয়ে চিৎকার করে উঠেছে। তর শাসনের খেতাপুড়ি আমি। তর মাইরের খেতাপুড়ি। তর মাইয়ারে তুই বাইত থন বাইর অইতে দিবি কি দিবি না তাতে আমার ধন (পুরুষাঙ্গ অর্থে) অইব। মেদিনমণ্ডলের মাইনষে তর মাইয়ার মোক না দেখলে কোন বাল হালানি (যৌনকেশ ফালানো) যাইবো! আমার বাপরে যে চুতমারানির ঝিয়ে অপমান করলো হেইডা কি ফিরত আইবো?
আতাহারের চিৎকার চেঁচামেচিতে মোতাহারের বউ পারুল তাদের ঘরের উঠানের দিককার দরজা খুলে দাঁড়িয়েছে। তার গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে দুইপাশে দুই ছেলেমেয়ে আর দুইপায়ের মাঝ বরাবর ছোটটা। উত্তরের ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে রহিমা আর হাসু। ওটার (ঘরে ওঠার সামান্য উঁচু মাটির বেদি) সামনে গায়ে গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে ফুফু ভাইঝি। মুখে উৎকণ্ঠা, চোখে ভয়ার্ত ভাব। মন্তাজদের বাধা ঝি ফিরোজা ছিল তাদের বড়ঘরে। মন্তাজের অথর্ব মায়ের মাথাটা এই শীতকালেও দুপুরের পর গরম হয়। তালু ফেটে বেরোয় অদ্ভুত উষ্ণতা। মায়ের মাথা ঠান্ডা রাখার জন্য ঢাকা থেকে বোতল বোতল কদুরতেল পাঠায় মন্তাজ। বুড়িকে বিছানায় তুলে দুই-তিনটা বালিশ দুই-তিনদিক দিয়ে ঠেস দিয়ে কোনওরকমে তাকে বসিয়েছে ফিরোজা, বোতল খুলে তেলটা মাত্র দেবে, আর খুলল না। বোতল আর বুড়িকে ফেলে দৌড়ে বেরুল। দেখে বুড়ি প্রথমে হতভম্ব হল তারপর খোঁচা খাওয়া উমা মুরগির মতন কক কক করে উঠল। শুধু ফিরোজাই বোঝে তার ভাষা এমন জড়ানো গলায় বলল, ও ফিরি, কই যাচ? কী হইছে?
ফিরোজা কোনও কথা বলল না। ছুটে এসে মান্নান মাওলানার পুবের ভিটির বড় ঘরখানার পিছন দিককার কোণে দাঁড়াল। এখান থেকে উঠোনে দাঁড়ানো সবাইকে দেখা যাচ্ছিল। ফিরোজা উৎকণ্ঠিত মুখে তাকিয়ে রইল।
মান্নান মাওলানার বাংলাঘর আর উত্তরের ভিটির ঘরখানার মাঝমধ্যিখান দিয়ে বিশকদম আগালে রান্নাঘর। সেই ঘরের পিছনে একখানা আমগাছ। এই আমগাছের আগডালে বসে একটা কাক থেকে থেকে ডাকছিল। আতাহারের চিৎকারে বেশ ভড়কাল সে। ডাক বন্ধ করে, চঞ্চল চোখে উঠানের দিকে তাকাতে লাগল। অবস্থা বেগতিক দেখলে যখন তখন উড়াল দিবে।
কিন্তু এত যে কাণ্ডকারখানা ঘটছে বাড়িতে, উঠানের লাগোয়া পুবের বড়ঘরে আছেন মান্নান মাওলানা তার কানে যেন যাচ্ছেই না কিছু। তিনি যেন কিছু টেরই পাচ্ছেন না। তিনি কি ঘুমিয়ে আছেন? কিন্তু যত গভীর ঘুমেই থাকুক মানুষ, এত কাছে দাঁড়িয়ে এরকম চিৎকার চেঁচামেচি করছে এতবড় ছেলে, এই শব্দে ঘুম না ভাঙে কী করে? এই শব্দ লোকের কানে না যায় কী করে? এত কিছু শোনার পরও লোকে ঘর থেকে না বেরোয় কী করে?
নাকি মাওলানা সাহেব জেগেই আছেন! বিছানায় উঠে বসেছেন কিন্তু ইচ্ছা করেই ঘর থেকে বেরুচ্ছেন না! তিনি হয়তো চাইছেন যত ইচ্ছা গালাগাল দবির দবিরের বউকে করুক আতাহার। গালাগাল শেষ করে, শরীরের ঝাল মিটাবার পর তিনি বেরুবেন। ভাবখানা এমন করবেন যেন এই এতক্ষণের কোনও কিছুই তার কানে যায়নি। এখনই ঘুম ভাঙল তার, ঘুম ভাঙার পরই ছেলের চিল্লাচিল্লি শুনে ঘর থেকে বেরিয়েছেন। ব্যাপার কী, কাকে গালাগাল করছে আতাহার উদ্বিগ্ন মুখে তা দেখত চাইছেন।
আগের মতোই গলার জোর বজায় রেখে আতাহার তখন বলছে, এই অপমানের শোধ কেমতে লইতে অয় আমি জানি। শোধ আমি লমু। এমুন কইরা লমু, লওনের পর উদিস পাবি শোধ কারে কয়।
হামিদা কাতর গলায় বলল, না শোধ আপনে লইয়েন না। রহম করেন, আমার মাইয়াডারে আপনে রহম করেন। আমি আপনের হাতে ধরি, আমি আপনের পায়ে ধরি।
বলেই আতাহারের হাত ধরবার জন্য এগিয়ে গেল হামিদা। আতাহারের হাতের কাছে যাবার আগেই লাফ দিয়ে সরে গেল আতাহার। খবরদার শইল্লে হাত দিবি না। সামনে আবি না আমার। বাইর হ, বাইর হ আমগো বাইতথন। অহন বাইর হবি। এক মিনিট আর খাড়বি না। যা ভাগ।
আতাহারের ভঙ্গিভঙ্গি আর হামিদার অসহায় মুখ দেখে বুক তোলপাড় করতে লাগল দবির গাছির। চোখ ছলছল করে উঠল। অতি দীনদরিদ্র সংসার দবির গাছির। খেয়ে না খেয়ে কত কষ্টে হামিদাকে নিয়ে জীবনের এতটা পথ পেরিয়ে এসেছে। জীবনে কত দুঃখ কষ্টের সময় গেছে, অসহায় নিরুপায় সময় গেছে, স্বামী স্ত্রীর কত মান অভিমান ঝগড়াঝাটি, ছোটখাটো কত অশান্তি, তারপরও একটি মাত্র মেয়েকে মাঝখানে রেখে দুইজন মানুষের মধ্যে আছে গভীর টান। সেই টানেই মান্নান মাওলানা যেদিন অপমান করেছিল দবিরকে, দবিরের মাথা দুইহাতে বুকে জড়িয়ে তাকে সান্ত্বনা দিয়েছিল হামিদা। স্বামীর বেদনা নিজেও ভাগ করে নিয়েছিল। আজ এই মুহূর্তে হামিদার অসহায় মুখ দেখে দবিরের ইচ্ছা করে এগিয়ে গিয়ে হামিদার হাতটা সে ধরে, হামিদাকে টেনে নেয় বুকে। দুইহাতে তার মাথায় পিঠে হাত বুলিয়ে বলে, তুমি এমুন ভাইঙ্গা পইড়ো না। আমি তো আছি। তোমার মাইয়ারে আমি রক্ষা করুম। কেঐ কিছু করতে পারবো না।
করা হয় না কিছুই। বুকের আবেগ বুকে রেখে, চোখের পানি সামলে আগের মতোই মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে দবির। আর হামিদা তার মতো করে অনুনয় করে যায় আতাহারকে। আপনে আমার বাপ হন। আমার আপনা বাপ। খালি হাতে না, আমি আপনের পায়েও ধরতাছি। একবার না শতবার ধরতাছি। আমার মোক চাইয়া আমার মাইয়াডারে আপনে মাপ কইরা দেন।
