হোক। দিদি আমি কমু না। হিন্দু কথা আমি কই না।
তাইলে ফুলমতিও কইচ না। ফুলমতি তো হিন্দু নাম।
নিখিলাও তো হিন্দু নাম।
নিখিলা না, নিখিল।
অইছে। অতো প্যাচাইল পারি না। যা। মন মিজাজ খারাপ আছে।
নিখিল আর কথা বলল না। মন খারাপ করে বারবাড়ির দিকে পা বাড়াল।
আতাহার তাকে ডাকল। হুইন্না যা নিখিলা।
নিখিল ফিরে এল। কী?
মন খারাপ করছছ নি?
না।
করিচ না। আমার মন মিজাজ ভাল না।
একটু থেমে বলল, আরেকখান কথা কই তরে? ফুলমতি তর বড় অইলেও অরে মনে হয় তর ছোড। সব সময় সাদা কাপড় ফিন্দা থাকে। বাইল্য বিধবা। তারবাদেও চেহারাখান কী সোন্দর! গন্ধরাজ ফুলের লাহান। এর লেইগাঐ অরে আমার দিদি কইতে মন চায় না। মনে অয় ও তর ছোড বইন, আমারও ছোড বইন। এর লেইগাঐ নাম ধইরা কই। আর কিছু না।
নিখিল কথা বলল না। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বারবাড়ির দিকে চলে গেল।
তারপর আতাহার এসে দাঁড়াল দবির গাছি আর হামিদার সামনে।
দুইজন মানুষের সামনে আতাহার দাঁড়াল ঠিকই কিন্তু হামিদার দিকে সে তাকাল না, তাকাল দবির গাছির দিকে। চোখ পাকিয়ে, নাক ফুলিয়ে, ঝাঁঝালো গলায় বলল, কীর লেইগা আইছস এই বাইত্তে? কী চাই?
দবিরকে তুমি করে বলে আতাহার। আজ বলল তুই করে। এই অবস্থায়ও আতাহারের তুই বলাটা কানে লাগল দবিরের। এই অবস্থায়ও মনটা খারাপ হল। আতাহার সামনে এসে দাঁড়াবার পর তোয়াজের ভঙ্গিতে মুখটা হাসিহাসি করেছিল। সেই মুখ রোদে পোড়া পাতার মতো ম্লান হল। মুখ নিচু করে কোনওরকমে বলল, মাইয়াডা এতবড় একখান অন্যাই করছে…।
দবিরের কথা শেষ হবার আগেই তেড়ে ওঠা মর্দা কুত্তার মতন খাউ খাউ করে উঠল আতাহার। অন্যাই? এইডারে তুই অন্যাই কইতাছছ? আরে এইডা তো অন্যাইয়ের বাপ। মোকে পিছা (ঝাড়ু) মারন আর ছ্যাপ ছিডান এক কথা। তাও শয়ে শয়ে মাইনষের সামনে। পুলিশ দারগার সামনে। আর এমুন একজন মাইনষের মোকে যে অইলো আল্লার এক্কেরে খাসবান্দা। মাওলানা। যার মোকের এহেকখান দাড়িতে সইত্তর কইরা ফিরিসতা বইয়া থাকে। ছ্যাপ তো হেই ফিরিসতাগো মোকেও লাগলো।
দবির কথা বলল না, মুখ নিচু করে রাখল।
আতাহার বলল, এত সাহস তর মাইয়ার অইল কেমতে? কই পাইলো এত সাহস?
দবির তবু কথা বলল না, কথা বলল হামিদা। পোলাপান মানুষ, বোজতে পারে নাই।
এবার আগের চেয়েও জোরে চেঁচাল আতাহার। হামিদার মুখের দিকে তাকিয়ে পারলে যেন তার গলা টিপে ধরে এমন ভঙ্গিতে দাঁত মুখ খিঁচিয়ে বলল, কী কইলি? পোলাপান মানুষ? তর মাইয়ায় পোলাপান মানুষ? বিয়া দিয়া দেখ পোলাপান না কী? একমাসও লাগবো না প্যাট বাজাইতে।
নূরজাহানকে নিয়ে অশ্লীল কথাগুলি তো কানে লাগলই দবিরের, কানমুখ ঝ ঝ করতে লাগল, এমনকী হামিদাকে তুইতুকারি করাটাও কানে লাগল। তাকে করছে করুক, হামিদাকে কেন তুইতুকারি করছে আতাহার? কিন্তু এসব নিয়ে কথা বলার মুখ নাই দবিরের। নূরজাহান তাকে বোবা করে দিয়েছে।
এতক্ষণের উৎকণ্ঠা তারপর যেন কেটে গেল দবিরের। নূরজাহানকে নিয়ে পাওয়া ভয়টা যেন কমে গেল। কিন্তু ভিতরে ভিতরে মেয়ের ওপর প্রচণ্ড রাগ হল তার। মান্নান মাওলানাকে রাজাকার বলে দবিরকে একবার বেদম অপমান করিয়েছে সে। গালাগাল খাইয়েছে, ঘাড় ধাক্কা খাইয়েছে। সেই অপমান সইতে না পেরে বাড়ি ফিরে কেঁদেছিল দবির। কিন্তু সেদিনের অপমানটা ছিল তার একার, আজ অপমান হচ্ছে স্বামী-স্ত্রী দুইজনে মিলে। সেদিনকার ছেলে আতাহার তাদেরকে তুই-তুকারি করছে। মা-বাবার সামনে মেয়েকে নিয়ে অশ্লীল কথা বলছে। এসবের জন্য অন্য কেউ দায়ী না, দায়ী তাদের মেয়েটা। নূরজাহান। এরকম মেয়ের ওপর রাগ না হবে কোন বাপের?
দবিরের মনে হল এ বাড়ির যে ঘরে আছে নূরজাহান সেই ঘর থেকে টেনে হিঁচড়ে নূরজাহানকে সে বের করে আনে। এনে চড়চাপড় কিল ঘুসি আর লাথি মারতে মারতে ফেলে দেয় উঠানের মাটিতে। মারের চোটে দুই-একটা দাঁত খসে পড়ুক নূরজাহানের, ঠোঁট কেটে যাক, জিভ কেটে যাক। মুখ থেকে থুতুর সঙ্গে বেরোক তাজা রক্ত, নাক দিয়ে গলগল করে পড়ুক জবাই করা মুরগির গলা থেকে পড়ার মতো রক্ত। মান্নান মাওলানার সাদা উঠান লাল হোক। তারপরও উঠানে পড়া মেয়ের গলা পাড়া দিয়ে ধরবে দবির। দম একেবারেই রুদ্ধ করবে মেয়ের। জোর করে কেউ না ফিরালে মেয়েকে যেন সে মেরেই ফেলবে।
কিন্তু দবিরের ক্রোধের কণামাত্রও যেন জাগল না হামিদার গায়ে। আতাহার তাকে তুই তুকারি করছে তা যেন সে শুনতেই পেল না। মেয়ে নিয়ে অশ্লীল কথা বলছে তা যেন সে। বুঝতেই পারল না। অতি নরম, অতি বিনয়ের গলায় বলল, অরে আমি শাসন করুম। এই অন্যাইয়ের লেইগা অরে আমি বহুত মারুম। অরে আমি বাইতথন বাইর অইতে দিমু না। অর মোক আপনেরা আর দেখবেন না। এই মেদিনমণ্ডল গেরামের কেঐ দেখবো না।
আতাহারকে কি আপনি করে বলে হামিদা! কোনওদিন শোনেনি দবির। বলবার কথা না। আজ বলছে কেন? ভয়ে নাকি মেয়েকে বাঁচাবার জন্য, মেয়েকে উদ্ধারের জন্য! নরম হয়ে আতাহারের মতো হাঁটুর বয়সি ছেলেকে আপনি আপনি করে, তোয়াজ অনুনয় করেও কি নূরজাহানকে বাঁচাতে পারবে হামিদা! এই বাড়িতে যদি সত্যি নূরজাহানকে বেঁধে রাখেন মান্নান মাওলানা, এসব করে কি তাকে ছাড়িয়ে নিতে পারবে।
