কিন্তু এই ঘরে নূরজাহান নাই!
ফিরে এসে উদ্বিগ্ন গলায় দবিরকে কথাটা বলল হামিদা। শুনে চোখমুখ যেন আরও ফ্যাকাশে হয়ে গেল দবিরের। তয় তুমি যে কইলা!
এবার আগের মতন রেগে উঠল না হামিদা। কইছি আন্তাজে। ঘরে নূরজাহান নাই। রহিমা আর একটা ছেমড়ি।
আমার মনে অয় আন্তাজ তোমার ঠিক না। এই বাইত্তে নূরজাহান নাই।
থাকতেও পারে। ঘর তো বাইত্তে একখান না।
যেই কয়খান ঘর তার দুইখান তো দেখলামঐ।
দুইখান কো? দেখলাম তো একখান।
বাংলাঘরডা দেখতাছো না?
হামিদা বিহ্বল চোখে দরজা খোলা বাংলাঘরটার দিকে তাকাল। বিকাল হয়ে আসা। শীতের নির্জনতা ছাড়া ঘরে কেউ নাই, কিছু নাই।
তারপর পুবের ঘরটার দিকে তাকাল হামিদা। এই ঘরটা বাড়ির বড়ঘর। চৌচালা। চারদিকে ঢেউটিনের বেড়া। কাঠের কারুকাজ করা দরজা জানালার কপাটে ঘন কালো আলকাতরা দেওয়া।
এই ঘরের দিকে হামিদাকে তাকাতে দেখে দবির বলল, এই ঘরে হুজুরে থাকে।
হামিদা বলল, জানি। তুমি মনে করছো এই বাইত্তে আমি কোনওদিন আহি নাই!
তারপর একটু থেমে বলল, হুজুর অহন কো?
আমি কেমতে কমু? মনে অয় বাইত্তেঐ আছে।
এই ঘরে আমার মাইয়ারে আটকাইয়া থোয় নাই তো?
আরে না। দেহো না দুয়ার খোলা।
খোলা কো? আউবজাইন্না (ভিড়িয়ে রাখা)।
দুয়ার আউবজাইন্না ঘরে মানুষ মানুষরে আটকাইয়া থোয় কেমতে?
থুইতে পারে। যাতে দুয়ার দেইক্কা মাইনষে কিছু সন্দ না করে।
তয় যাও, এই ঘরেও উঁকি দেও। ঘরে কইলাম হুজুরে আছে, আতাহারের মায় আছে। মাইয়া বিচড়াইতে আইয়া হুজুরের ঘরে উঁকি দিছো এইডা লইয়া কইলাম আরেক ভেজাল লাগবো।
কীয়ের ভেজাল?
দবির একটু রাগল। তুমি বোজো না কীয়ের ভেজাল? বেবাক কথা তোমারে বুজাইয়া কওন লাগবো? দুইফর বেলা হুজুরে তার বউয়ের লগে হুইয়া রইছে না কী করতাছে ঘরে উক্কি দিয়া তুমি হেইডা দেখলা। হুজুরে এইডা জানলে ভেজাল লাগবো না?
হামিদা বিব্রত হল। হ হ বুজছি। তয় আমার মাইয়া?
দবির কথা বলবার আগেই সড়ক থেকে হনহন করে হেঁটে বাড়িতে এসে ঢুকল আতাহার আর নিখিল। উঠানে এসে দাঁড়াল। দুইজনের হাতেই সিগ্রেট জ্বলছে। নিখিলের সিগ্রেট ধরে রাখার ভঙ্গিটা নমনীয়। যে-কোনও সময় ময়মুরুব্বির সামনে পড়লে সিগ্রেট যেন সে লুকাতে পারে এমন ভাবে সিগ্রেট ধরে রেখেছ। আতাহারের সিগ্রেট ধরার ভঙ্গি বেপরোয়া ধরনের। যেন ময়মুরুব্বি কাউকেই তোয়াক্কা করে না সে। যে ইচ্ছা দেখুক আতাহারের সিগ্রেট খাওয়া, আতাহারের যেন কিছুই যায় আসে না। আতাহারের সব কিছুতেই অবশ্য বেপরোয়া ভঙ্গি। পরনের লুঙ্গিটাও বাঁহাতে এমন করে খানিকটা তুলে ধরে রেখেছে, এই ভঙ্গিতেও তার উদ্ধতভাবটা ধরা পড়ে। ওদিকে তার দোস্ত নিখিল নরম সরম, বিনয়ী ভদ্র। চোখে সারাক্ষণই এক তোয়াজের ভাব তার।
বাড়িতে ঢুকেই দবির আর হামিদাকে দেখতে পাবে আতাহার নিখিল কেউ তা ভাবেনি। দুইজনেই চমকাল। নিখিল ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল তাদের দিকে, হাতের সিগ্রেট ঠোঁটে তুলে টান দিতে ভুলে গেল। কিন্তু আতাহারের হল উলটা। মাথায় রক্ত লাফিয়ে উঠল, চোখ কোটর থেকে ঠেলে বেরুতে চাইল ক্রোধে, মুখের ভিতর দাঁতে দাঁত চাপার ফলে কড়মড় করে শব্দ হল। হঠাৎ করেই যেন এমন হল আতাহারের। তবে ভাবটা সামাল দিতে চাইল সে। সামাল দেবার জন্যই যেন পর পর দুইবার ফুক ফুক করে বেশ দীর্ঘ টান। দিল সিগ্রেটে। দবির হামিদার দিকে সাপের চোখে তাকিয়ে শীতল কুদ্ধ গলায় বলল, কী চাই?
দবির হামিদা কথা বলতে পারল না। ভয়ার্ত ভঙ্গিতে একটা টোক গিলল দবির আর হামিদা কাঁপা হাতে মাথায় ঘোমটা দিল।
এই অবস্থা থেকে তাদেরকে বাঁচিয়ে দিল নিখিল। আস্তে করে সিগ্রেটে টান দিয়ে বলল, এগ লগে পরে কথা ক আতাহার। আগে আমারে বিদায় কর।
দবির হামিদার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিখিলের দিকে তাকাল আতাহার। চিন্তিত গলায় বলল, বিদায় করুম মাইনি? তরে জানি কির লেইগা আনলাম?
নিখিল হাসল। ভুইলা গেলিনি?
হ। এই দুইডারে দেইক্কা বেবাক ভুইলা গেছি। মাথা খারাপ অইয়া গেছে আমার।
হেইডা খারাপ অওনের কথাঐ। তয় তুই আমারে কীর লেইগা আনছছ হোন। তর লগে টেকা আছিলো না দেইক্কা…।
নিখিলের কথা শেষ হওয়ার আগেই আতাহার বলল, আর কওন লাগবো না। মনে অইছে। তুই ইট্টু খাড়ো (দাঁড়া)।
দবির হামিদার দিকে তাকাল আতাহার। তোমরাও খাড়োও। আইতাছি।
সিগ্রেট টানতে টানতে আতাহার গিয়ে বাংলাঘরে ঢুকল। বিছানার তলায়, কেউ কল্পনাও করবে না এমন জায়গা থেকে একশো টাকার একটা নোট হাতে নিয়ে ফিরে এল। নোটটা নিখিলের হাতে দিয়ে বলল, যা। এই টেকায় যেহেন থিকা পারচ ডেকরা দুইডা মোরগ কিনবি। ফুলমতিরে কবি বেশি কইরা তেল মেশলা দিয়া, ঝাল ঝাল কইরা কষাইতে। ওই টাইমে ঝাল গোস্ত ছাড়া আরাম লাগে না।
টাকাটা হাতে নিয়ে মুখ কালো করল নিখিল। সিগ্রেটে শেষটান দিয়ে ছুঁড়ে ফেলল।
নিখিলের কালোমুখ খেয়াল করে আতাহার বলল, কী অইলো?
নিখিল স্নান গলায় বলল, কিছু না।
তয় যে মোক কালা করলি?
তর কথায়।
কী কইছি আমি?
দিদিরে ফুলমতি কইলি।
তর দিদির নাম ফুলমতি না?
হ। তয় হেয় আমার বড়।
বড় অইছে কী অইছে?
হেরে তুই নাম ধইরা কইলি?
আতাহার একটু রাগল। তয় কি চ্যাট (লিঙ্গ) ধইরা কমুনি?
নিখিল গম্ভীর হল। মোক খারাপ করি না। আমার দিদিরে তরও দিদি কওন উচিত। হেয় তরও বড়।
