হ। ঠিক কথা কইছো।
পা টিপে টিপে উত্তরের ভিটির দিকে এগিয়ে গেল হামিদা। কিন্তু কয়েক পা গিয়েই ফিরে এল। চিন্তিত গলায় বলল, নূরজাহানরে যুদি এই ঘরে দেহি তাইলে কী করুম?
এই ভাবনাটা দবিরের মাথায় আসেনি। সেও চিন্তিত হলো। কী করবা?
তুমি কও।
আমিও তো জানি না।
কয়েক মুহূর্ত থেমে থাকল হামিদা। তারপর বলল, মাইয়া যুদি এই ঘরে দেহি তাইলে কইলাম দিকপাশ চামু না আমি। ঘরে হাইন্দা যামু। মাইয়ার হাত পায়ের বান খুইলা, মোকের বান খুইলা মাইয়া লইয়া দৌড় দিমু। তারবাদে যা অওনের অইবো।
দবির কোনও কথা বলল না। চিন্তিত চোখে হামিদার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
হামিদা আর কোনওদিকে তাকাল না। পা টিপে টিপে উত্তরের ঘরের আবজানো দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। দাঁড়িয়ে দরজার ফাঁক দিয়ে ভিতরে তাকাল।
ঘরের একপাশে বিশাল চৌকি আরেক পাশে মাঝারি মাপের ডোল (ধানের গোলা)। চৌকিতে হোগলা পাতা। মাথার কাছে তেল চিটচিটা দুইটা বালিশ, সবুজ রঙের ছোঁড়াখোঁড়া একখানা কথা ভাজ করে রাখা। আর কিছু নাই।
ডোলের পাশে দুইখানা আগোল (ধামা) আর একখানা বড় কুলা পড়ে আছে। একপাশে বেড়ার সঙ্গে থাক থাক করে ফেলা তিনখানা ভরা বস্তা। বস্তাগুলি ধানের। এই বস্তার গায়ে ঢেলান (হেলান) দিয়ে বসে আছে বাড়ির পুরানা ঝি রহিমা। তার কোলের কাছে বসে আছে বড়ভাইয়ের মেয়ে হাসু। পিছন থেকে ভাঙা কালো রঙের কাকুই দিয়ে অতিযত্নে ভাইঝির মাথা আঁচড়ে দিচ্ছে রহিমা। মাথা আঁচড়ানোর আরামে চোখ বুজে আছে হাসু কিন্তু ফুফু যে কথা বলছে ফিসফিস করে সেসব কথার জবাব দিয়ে যাচ্ছে। চোখ বন্ধ রেখে নিজেও বলছে কোনও কোনও কথা। তখন ভাইঝির কথার জবাব দিচ্ছে রহিমা। ভাইঝির কথার পিঠে কথা বলছে।
বাইশ-তেইশ বছর বয়স হবে হাসুর। আট বছর বয়সে মা মারা গেল। বউ মরতে না মরতেই বাপ কানা দলিল আবার বিয়া করে ফেলল। আগের ঘরে বাচ্চাকাচ্চা বলতে এই এক মেয়ে, হাসু। কিন্তু পরের ঘরে তিন-চার বছরের মাথায় তিনটা হৃষ্টপুষ্ট বাচ্চাকাচ্চা পয়দা করে ফেলল কানা দলিল। সংসারে বেশি বাচ্চাকাচ্চা থাকলে কোনওটার দিকেই তেমন নজর থাকে না। তার ওপর হাসু হচ্ছে মা-মরা মেয়ে। কথায় আছে মা মরলে বাপ হয় তালুই। কানা দলিলও আর হাসুর বাপ রইল না, তালুই হয়ে গেল। হাসুর দিকে ফিরেও তাকায় না। দ্বিতীয় পক্ষের বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে ব্যস্ত থাকে। আর স্বামীর এই ভাব দেখে বউটাও যায় লাই পেয়ে। সজ্ঞায়ের আসল রূপ ধরতে সময় লাগে না তার। ফলে কানা দলিলের সংসারে টিকে থাকা আর সম্ভব হচ্ছিল না হাসুর। একওক্ত ভাত খায়। তো আরেক ওক্ত গঞ্জনা, মারধর। এই অবস্থায় রহিমা তাকে নিয়ে এল নিজের কাছে। কিন্তু মান্নান মাওলানার বাড়িতে তাকে রাখল না। কাজে লাগিয়ে দিল মৌছামান্দ্রার এক বাড়িতে। কিন্তু কিছুদিন ধরে সেই বাড়িতে টিকতে পারছে না হাসু। মাস দুইমাস পর পরই ফুফুর কাছে চলে আসছে। কারণ জিজ্ঞাসা করলে একটা কথাই বলে, বাড়ির বেডারা আমারে বহুত জ্বালায়।
কী ধরনের জ্বালানো হাজার বার জিজ্ঞাসা করলেও সেই কথা বলে না। বেশি জোরাজোরি করলে শুধু কাঁদে আর বলে, ফুফু, আমারে তুমি তোমার কাছে লইয়াহো। আমি এই বাইত্তে থাকুম, তোমার কাছে থাকুম। দরকার অইলে একওক্ত খামু, দরকার অইলে না খাইয়া থাকুম, তাও তুমি আমারে তোমার কাছে থাকতে দেও। আর নাইলে আমার বাপরে খবর। দেও। যেমতে পার আমার বিয়া দিয়া দেও। এই জীবন আমার আর ভাল্লাগে না।
হাসুর বিয়ার চেষ্টা যে দুই-চার বার না হয়েছে তা নাই। ষোলো-সতেরো বছর বয়স থেকেই চেষ্টা রহিমা করছিল। দুই-চারবার কানা দলিলের সঙ্গেও কথা বলেছে। সে তেমন আগ্রহ দেখায়নি। হাসু নামে তার নিজের ঔরসের যে একটি মেয়ে আছে, দূর গ্রামে ঝিয়ের। কাজ করে যে মেয়ে, দুই-চার বছরে একবার বাপের সংসারে এলে যে মেয়ের দিকে ফিরেও তাকায় না দলিল সে কি আর মেয়ের বিয়ের কথা ভাববে? ফলে একার চেষ্টায় রহিমা বেশিদূর আগাতে পারেনি। দিনের মতো দিন কেটে যাচ্ছে। হাসুর কোনও গতি হচ্ছে না। দিনে দিনে চেহারা ভাঙতে শুরু করছে তার।
দেখতে একসময় মন্দ ছিল না হাসু। মাঝারি ধরনের গড়ন। মুখোন চলনসই ধাচের, গায়ের রং মাজা মাজা। সব মিলে খারাপ লাগত না দেখতে। কিন্তু এখন আর সেই অবস্থা নাই। যৌবন আসতে না আসতেই যেন তাতে ভাটা পড়ে গেছে। চোখের কোলে কাজলের মতো কালি, মুখ প্রচণ্ড খরায় গিরস্তবাড়ির খড়ের চালায় শুকিয়ে যাওয়া চালকুমড়ার মতন, শরীরে নদীতীরের ভাঙন।
মাথার চুল একসময় ঘনই ছিল হাসুর। পিঠ ছাপানো ছিল। আজ আর সেই চুল নাই। নাড়া সাফ করা ধানি জমির মতন চোয়া হয়ে গেছে। ঘাড়ের তলায় পড়ে থাকা হাসুর চুল এখন বাচ্চা ঘোড়ার লেজের মতন। ভাল করে তেলপানি দিলেও চুলের দশা ফিরে না।
বুক হাসুর এখন আর মেয়েমানুষের বুক না। যৌবনবতী মেয়েমানুষের বুক তো নাই। কী যেন কী কারণে হাসুর বুক এখন জোয়ানমর্দ পুরুষমানুষের বুকের মতন। পেটের তুলনায় সামান্য উঁচু। হাসু যে মেয়েমানুষ, শাড়ি না পরলে তা মনেই হবে না। এমনকী গলার স্বরও আগের তুলনায় বদলে গেছে। মেয়েমানুষের স্বর নাই। আড়াল থেকে শুনলে মনে হবে পুরুষমানুষ কথা বলছে। যদিও এখন সে কথা বলছে ফিসফিস করে, ফলে গলার আসল স্বর একেবারেই বোঝা যাচ্ছে না।
