আজ এই সময় আতাহারের বাংলাঘর তাদের গোয়ালঘরের মতোই নিস্তব্ধ। আতাহার বাড়ি নাই।
ভিতর বাড়িতেও কারও ছায়া চোখে পড়ে না। এইঘর ওইঘর করে না বাড়ির বউঝিরা কেউ। বড়ঘর থেকে রান্নাঘরে যায় না, রান্নাঘর থেকে ফিরে আসে না বড়ঘরে।
বাড়ির লোক সব গেল কোথায়?
অনেকক্ষণ ধরে হামিদা কোনও কথা বলছে না দেখে তার দিকে মুখ তুলে তাকাল দবির। তাকিয়ে চমকে উঠল। অপলক চোখে তার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে হামিদা, চোখের দৃষ্টি একেবারেই অচেনা। হামিদার এরকম দৃষ্টি আগে কখনও দেখেনি দবির। আর চোখের রং কেমন ঘোলাটে। পেকে সাদা হয়ে যাওয়া জামরুলের মতো।
এমন চোখ হয়েছে কেন হামিদার! মেয়ের বিপদের কথা ভেবে অন্যরকমের কোনও ক্ষতি হয়ে যায়নি তো তার! সত্যি সত্যি গন্ডগোল হয়ে যায়নি তো মাথায়! মাথার গন্ডগোলে চোখের দৃষ্টি নাকি বদলে যায় মানুষের!
মেয়ের কথা ভুলে মেয়ের মা’কে নিয়ে চিন্তিত হল দবির। কাতর ভঙ্গিতে আর্তনাদ করে উঠল। কী অইছে তোমার? এমুন কইরা চাইয়া রইছো ক্যা?
হামিদা কথা বলল না। চোখে পলক পড়ল না তার।
এবার দুইহাতে হামিদার দুইকাঁধ খামছে ধরল দবির। বেশ জোরে ঝাঁকুনি দিল। কথা কও না ক্যা? এক বিপদের মইধ্যে আরেক বিপদ বাজাইলা নি?
এবার এমন করে নড়ে উঠল হামিদা যেন পানির তলায় অনেকক্ষণ কেউ তাকে চুব দিয়ে রেখেছিল। দম মাত্র ফুরিয়েছে এমন সময় ছেড়ে দিয়েছে, লগে লগে পানির তলা। থেকে মাথা তুলেছে, বুক ভরে শ্বাস নিচ্ছে। অবিকল এই ভঙ্গিতেই দম নিল হামিদা। পানি থেকে ডুব দিয়ে ওঠা মানুষের মতো চোখ করে স্বামীর দিকে তাকাল। সঙ্গে সঙ্গে যেন নূরজাহানের কথাও মনে পড়ল তার। দিশাহারা গলায় হামিদা বলল, আমার মাইয়া কো?
হামিদাকে স্বাভাবিক হতে দেখে বুকে বল পেল দবির। তবু অস্থিরতা কমল না তার। বলল, আমি কেমতে কমু? মাইয়া বিচড়াইতে বাইরইয়া এহেনে আইলা তুমি। আমার লগে কাইজ্জা লাগাইয়া দিলা। লও মাইয়া বিচড়াই।
হামিদা শীতল গলায় বলল, অন্যহানে বিচড়াইয়া লাভ নাই। মনে লয় এই বাইত্তেই আছে মাইয়া।
পায়ে যেন ঘচ করে খেজুরকাঁটা বিঁধল দবির গাছির। কোনওরকমে বলল, কও কী? কেমতে বোজলা?
দেহ না বাড়িটা কেমুন নিটাল অইয়া রইছে?
তাতে কী অইছে?
মাইয়া এই বাইত্তে আছে দেইক্কাঐ বাড়িডা এমুন নিটাল। মাওলানা সাবরে ছ্যাপ ছিডাইয়া যেই মিহিঐ দৌড় দেউক নূরজাহান, আতাহাররা অরে ঠিক বিচড়াইয়া বাইর করছে, ঠিকঐ ধইরা লইয়াইছে এই বাইত্তে। তারবাদে মোকে গামছা বাইন্দা কোনও ঘরে তালা দিয়া রাখছে।
অমুন হইলে আতাহাররা বাইত্তে নাই ক্যা?
বাইত্তে থাকলে মাইনষে বুইজ্জা যাইবো দেইক্কা বাড়িত থন গেছে গা।
কথাগুলি এমন স্বাভাবিকভাবে বলছিল হামিদা যেন সত্যি সত্যি এমন হয়েছে। যেন। হামিদা সব জানে।
হামিদা যত স্বাভাবিকভাবে কথা বলছিল ততই অস্বাভাবিক হয়ে উঠছিল দবির। গলা চড়ে যাচ্ছিল তার। এমুন অইলে মাইয়া আমরা ছাড়ামু কেমতে?
আশ্চর্য রকম দৃঢ় গলায় হামিদা বলল, আমার মাইয়ারে কেঐ আটকাইয়া রাখতে পারবো না। তুমি আহো আমার লগে।
হামিদা তারপর কোনওদিকে না তাকিয়ে দৌড়ে উঠে যায় মান্নান মাওলানার বাড়িতে। তার পিছু পিছু ওঠে দবির।
কিন্তু এই নিঝুম হয়ে থাকা বাড়ির কোন ঘরে বন্দি হয়ে আছে নূরজাহান! মুখে গামছা গুঁজে, দুইহাত পিঠমোড়া করে বেঁধে কোন ঘরে নূরজাহানকে ফেলে রেখেছেন মান্নান। মাওলানা! বাইরে থেকে শিকল তোলা কিংবা তালামারা কোন ঘরের দরজা!
মান্নান মাওলানার উঠানে দাঁড়িয়ে এসব ভাবতে লাগল হামিদা। দিশাহারা চঞ্চল চোখে প্রতিটি ঘরের দরজার দিকে তাকাতে লাগল। তার দেখাদেখি দবিরও তাকাচ্ছিল।
বাড়ির কোনও ঘরেরই দরজায় শিকল তোলা নাই, তালা মারা নাই। পশ্চিম ভিটির বাংলাঘরের দরজা হাট করে খোলা, ভিতরে কেউ নাই। পুব আর উত্তরের ভিটির ঘরের দরজা আবজানো (ভিড়ানো)। পুবের ঘরটা নিঝুম। পুব-উত্তর কোণের মোতাহারের ঘরেরও একই অবস্থা। শুধু উত্তরের ঘরে নিচুগলায়, ফিসফিস করে কথা বলছে দুইজন মেয়েমানুষ। চারদিক নিঝুম হয়ে আছে বলেই যেন ওই ফিসফিসানি কানে এল হামিদার। সঙ্গে সঙ্গে কীরকম নড়েচড়ে উঠল সে। দবিরের মুখের দিকে তাকাল। উত্তরের ঘরের মানুষ দুইটার মতো ফিসফিসা গলায় বলল, হুনছো?
দবিরও স্ত্রীর মতোই ফিসফিস করল। হ।
কারা কথা কয়?
কেমতে কমু!
এই ঘরেঐ নাই তো নূরজাহান?
মনে অয় না।
ক্যা?
তুমি যে কইলা…
দবির কথা শেষ হওয়ার আগেই হামিদা বলল, আমি যেমুন কইছি হেমুন নাও অইতে পারে। অন্যরকমও অইতে পারে।
কেমুন?
খোলা ঘরেঐ নূরজাহানরে হালায় থুইছে মাওলানা সাবে। বাড়ির কামের বেডিগো বহাইয়া রাখছে অর সামনে। বেডিরা অরে পাহারা দিতাছে আর নিজেরা হাকিহুকি (ফিসফাস) করতাছে।
আমার মনে অয় না।
আমার অয়।
তোমার মনে অইলে তুমি গিয়া ঘরডা দেহে।
কেমতে দেহুম?
আমি এহেনে খাড়াইয়া চাইরমিহি চকু রাখি, তুমি গিয়া দুয়ারের ফাঁক দিয়া ভিতরে চাও (তাকাও)। টিনের বেড়ায় বিন (ছিদ্র। ফুটো) আছে। বিন দিয়া চাইলেও ঘরের ভিতরের বেবাক কিছু দেখতে পারবা।
কেঐ যুদি আমারে দেইক্কালায়?
দেখলে মিছাকথা কইবা।
কী কমু?
কইবা আতাহারের মারে বিচড়াইতাছো। তার কাছে তোমার কাম আছে।
