হামিদাকে তার দিকে তাকাতে দেখে ভাঙাচোরা গলায় দবির বলল, এহেনে আইলা ক্যা?
হাঁ করে শ্বাস টানছে বলে গলা শুকিয়ে চৈত্রদিনের মাঠের মতন হয়ে গেছে হামিদার। স্বামীর কথা শুনে সেঁক গিলল সে। তারপর কোনওরকমে বলল, তয় কই যামু?
নূরজাহানরে বিচড়াইতে যাইবা না?
বিচড়াইতেঐত্তো আইছি।
দবির বুঝল তারচেয়ে অনেক বেশি দিশাহারা হয়েছে হামিদা। মাথার ঠিক নাই। এজন্য এলোমেলো কথা বলছে। পলকের জন্য নূরজাহানের কথা ভুলে গেল সে। হামিদার জন্য আশ্চর্য এক মমতায় বুক ভরে গেল। মেয়ের ভয়াবহ বিপদে মেয়ের মায়ের জন্য এরকম মমতা দবিরের কোত্থেকে এল! কেন এল! চোখ বা কেন ছলছল করে উঠল তার!
হাত বাড়িয়ে হামিদার একটা হাত ধরল দবির। চোখের পানি সামলাবার জন্য অন্যদিকে তাকিয়ে বলল, এহেনে বিচড়াইয়া লাভ নাই। এহেনে ও আহে নাই। গাওয়ালে কইলো…
দবিরের কথা শেষ হওয়ার আগেই ঝটকা মেরে তার হাত ছাড়িয়ে দিল হামিদা। মাজায় বাড়ি খাওয়া জাতসাপের মতন তেড়ে উঠল। তোমার লেইগাই এমুন অইছে। লাই দিতে দিতে মাইয়াডারে তুমি মাথায় উঠাইলাইছো। আমার কথা তুমি হোন নাই। আমি তোমারে কত কইছি এই মাইয়ার লেইগা কপালে অলক্কি (অলক্ষ্মী, বিপদ অর্থে) আছে। আইজ হেই অলক্কিতে ধরছে। আমি অহন মাওলানা সাবরে গিয়া কমু আমার মাইয়ার কোনও দোষ নাই, দোষ এই বেডার। এই বেডায় নষ্ট করছে মাইয়াডারে। এই বেডারে আপনে। পিডান। পিডাইয়া সোজা করেন।
প্রথমে চাপা গলায় শুরু করেছিল হামিদা, কথা বলতে বলতে কখন যে গলা খুলে গেছে তার, টের পায়নি। শেষদিকে মনে হচ্ছিল হামিদা যেন চিৎকার করছে। মান্নান মাওলানার বাড়ি থেকে তো বটেই, তার বাড়ির পিছন দিককার শরিকরা, তারও পিছন দিককার মুকসেইদ্দা চোরার (মুকসেদ চোর) বাড়ি থেকে, দক্ষিণ দিককার ওহাবদের বাড়ি থেকে, দক্ষিণ-পশ্চিম কোণের হুমাদের বাড়ি থেকেও লোকে হামিদার গলা শুনছে।
এই গলা শুনে ব্যতিব্যস্ত হল দবির গাছি। কান্না কাতর অসহায় গলায় বলল, কও কী তুমি? আ, কও কী?
আগের মতনই রূঢ় গলায় হামিদা বলল, ঠিকঐ কই। একদোম ঠিক কথা কই। তোমার লেইগাই আমার মাইয়ার আইজ এই দশা। আমার মাইয়ারে এমুন বানকাউর (বাঁদর অর্থে) বানাইছো তুমি। তুমি অরে আমার হাতে ছাইড়া দেও নাই। আমার লাহান কইরা আমি অরে ডাঙ্গর করতে পারি নাই। আমি অরে শাসন করতে চাইছি, পাড়া বেড়াইতে দিতে চাই নাই, রান্নঘরের খুডির লগে বাইন্দা থুইছি, তুমি আইয়া আহ্লাদ কইরা হেই মাইয়ারে ছাইড়া দিছো। আমার কথা তুমি হোন নাই। আইজ মাইয়ায় যা করছে হেই দোষ আমার মাইয়ার না, দোষ তোমার। তোমার দোষের শাস্তি যুদি আমার মাইয়ায় পায়, যুদি আমার মাইয়ার কোনও ক্ষতি অয়, মাওলানা সাবে আর তার পোলায় যুদি আমার মাইয়ার কোনও ক্ষতি করে, তয় কেঐরে কিছু কমু না আমি। আমি ধরুম তোমারে। যেই ছ্যান দিয়া তুমি খাজুরগাছ ঝোরো, হেই ছ্যান দিয়া তোমার কল্লা আমি কাড়ম। তোমার রক্ত আমি রসের লাহান বাইর করুম।
হামিদার কথা শুনতে শুনতে আবার নূরজাহানের কথা ভুলে গেল দবির। হামিদার চেহারা দেখতে দেখতে চোখ থেকে তার মুছে গেল চারপাশের অন্যসব দৃশ্য। এ কী চেহারা হয়েছে হামিদার! এতকালের পুরানা নিরীহ মানুষটার এরকম চেহারা তো কোনওদিন দেখেনি দবির! এমন গলাও শোনেনি কখনও। কিছুক্ষণ আগেও যে মানুষটা বাড়ির উঠানে স্বামীর পাশে বসে মেয়ের জন্য অপেক্ষা করছিল সে আর এ কি একই মানুষ! সামান্য সময়ের ব্যবধানে এমন করে বদলে যেতে পারে মানুষ! এমন ভয়ংকর রূপ ধরতে পারে! মেয়ের কথা ভেবে কি বদ্ধ পাগল হয়ে গেল হামিদা! স্বামীর গলা কেটে ফেলতে চাইছে মেয়ের জন্য!
হতভম্ব হয়ে হামিদার মুখের দিকে খানিক তাকিয়ে রইল দবির তারপর দুইহাতে হামিদার একটা হাত ধরতে চাইল। খাজুরের শুকনা পাতা খসে পড়ার মতন অসহায় ভঙ্গিতে বলল, এমুন বিপদের সমায় তুমি আমার লগে কাইজ্জা করতাছো? মাইয়াডা কই গেছে গা হেইডা তুমি চিন্তা করতাছো না? মাওলানা সাবের বাড়ির সামনে আইয়া এমুন করতাছো? কাইজ্জা করতে অয় আমার লগে তুমি পরে করো। অহন লও মাইয়াডারে বিচড়াই, মাওলানা সাবের গিয়া হাতে পায়ে ধরি। আগে মাইয়াডারে বাঁচাই, তারবাদে যত ইচ্ছা কাইজ্জা তুমি আমার লগে কইরো। ফুলই থিকা ছ্যান আমি নিজের হাতে তোমারে বাইর কইরা দিমু। আমার কল্লা তুমি কাইট্টালাইয়ো।
শেষ কথাটা বলতে বলতে গলা একেবারেই ভেঙে গেল দবির গাছির। কেঁদে ফেলল সে।
স্বামীর অসহায়ত্ব দেখেই কি না, না কি তার কথা শুনে, হামিদা যেন নিজের মধ্যে ফিরে এল। ফ্যালফ্যাল করে স্বামীর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
মান্নান মাওলানার বাড়িটি তখন বারবাড়ির সামনের নাড়ার পালার মতন স্তব্ধ হয়ে আছে।
বাড়ির কোথাও কোনও শব্দ ছিল না। আথালের গাই গোরুগুলি ভোরবেলাই চরতে গেছে। বিলে। মাকুন্দা কাশেমের জায়গায় নতুন গোমস্তা রাখা হয়েছে হাফিজদ্দিকে। গোরু নিয়ে সকালবেলাই বেরিয়ে গেছে সে। পশ্চিমের ভিটির ঘরটি বাংলাঘর। ঘরটা আতাহারের। ইয়ার দোস্তদের নিয়ে দিনরাত এই ঘরে আড্ডা দেয় সে। হাসি মশকরা করে। আতাহার বাড়িতে থাকলে সড়ক দিয়ে চলাচল করা পথিকরা বুঝতে পেরে যায় মাওলানা সাহেবের ছেলে বাড়িতেই আছে।
