তারপরই ভাত তরকারি রান্নার ইচ্ছাটা বাদ দিয়েছে মরনি। তারচেয়ে খিচুড়ি আর নয়তো বউয়া রানলে কেমুন অয়! ঘরে ঢেঁকিছাটা আলাচাউল (আতপ চাল) আছে। জামির চাল। একটু লালচে ধরনের। খিচুড়ি বউয়া যাই রান্না হোক, খেতে খুব স্বাদ হবে। কিন্তু খিচুড়ি রাঁধতে গেলে সময় একটু বেশি লাগবে। জামিরের আলাচাউল তাড়াতাড়িই ফুটে যাবে, ডাল ফুটতে দেরি করবে। বহুদিন ধরে শিকায় তোলা পটে পড়ে আছে। পুরানা মুশারি ডাল ফুটতে সময় লাগে। তারচেয়ে বউয়া রাধা ভাল। সময় লাগবে না। চাউলটা ধুয়ে কয়েক ফোঁটা তেল, কয়েক চাকলা পিয়াজ আর দুই-তিনটা শুকনা মরিচ দিয়ে একবারে চুলায় তুলে দিলেই হল। পানির পরিমাণটা কাঁটায় কাঁটায় দিতে পারলে, সরার ঢাকনার তলায় অতি স্বাদের বউয়া হয়ে যাবে। চুলা থেকে নামাবার আগে কিছু সময় সরার ঢাকনা তুলে রাখলে পানিটা টানবে তাড়াতাড়ি।
এসব ভেবে টিনের জের (বড় পট) থেকে আধসের খানেক আলাচাউল বের করল মরনি। আঁচলে সেই চাউল নিয়ে, তেলের ছোট্ট শিশি আর দুই-তিনখান পিঁয়াজ, দুই তিনখান শুকনা মরিচ নিয়ে ঘর থেকে বেরুল। বেরিয়ে তালা লাগিয়ে দিল দরজায়। এখন বাইরে থেকে দেখে কারও বোঝার উপায় নাই ঘরে কোনও মানুষ আছে। ঘরে মানুষ রেখে বাইরে থেকে কেউ তালা দেয় না।
কিন্তু তালা দেওয়ার কথাটা মরনির মনে হয়েছে কেন!
দ্রুত হাতে চুলায় বউয়া বসাবার পর এই কথাটা মরনির মনে হয়েছে। চাবিটা আছে। আঁচলে বাঁধা। একহাতে চাবিটা একবার ছুঁয়ে দেখল সে। সারাগ্রাম তন্নতন্ন করে খুঁজে নূরজাহানকে যখন কোথাও পাবে না আতাহাররা তখন হয়তো হালদার বাড়িতেও আসবে। অন্য শরিকদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করে হয়তো এই সীমানায় আসবে। মরনিকে জিজ্ঞাসা করবে নূরজাহানের কথা। এই বাড়িতে যখন তখন আসে নূরজাহান একথা গ্রামের অনেকেই জানে। আতাহাররাও নিশ্চয় জানে। যদি এসে তারা পড়েই ভাবখানা মরনি। এমন করবে যেন বহুদিন এই বাড়িতে আসে না নূরজাহান, যেন বহুদিন নূরজাহানকে মরনি দেখেনি। যেন মান্নান মাওলানার সঙ্গে কী করেছে নূরজাহান তাও সে শোনেনি, জানে না। তারপরও আতাহারদের বিশ্বাস অর্জনের জন্য তালাবদ্ধ ঘরটা না হয় দেখিয়ে দিবে।
কিন্তু মরনির কথা যদি আতাহাররা বিশ্বাস না করে! যদি তালা খুলতে বলে মরনিকে! যদি তার সামনে থেকে ধরে নিয়ে যায় নূরজাহানকে তা হলে নূরজাহানকে সে কেমন করে রক্ষা করবে!
এসব ভেবে বুক হিম হয়ে এল মরনির। চুলার হাঁড়িতে তখন টগবগ টগবগ করে ফুটছে বউয়া। উতরে উঠে সরার ঢাকনা ঠেলছে। শোঁ শোঁ শোঁ শোঁ করে শব্দ হচ্ছে। এই শব্দ কানে যায় না মরনির। একহাতে আঁচলে বাঁধা চাবিটা মুঠা করে ধরে মনে মনে আল্লাহকে ডাকে সে। ইয়া হে আল্লাহ, তোমার রহমতের দরজা নূরজাহানের লেইগা খুইল্লা দেও। অরে তুমি বালা মসিবত থিকা রক্ষা করো। অরে তুমি জালিমের হাত থিকা রক্ষা করো।
.
চারদিক থেকে মার খাওয়া নিরীহ কুত্তা বিলাইয়ের মতন দিশাহারা ভঙ্গিতে ছুটতে ছুটতে নিজের অজান্তেই যেন মান্নান মাওলানার বাড়ির সামনে চলে এল হামিদা। তার পিছু পিছু ছুটছিল দবির, সেও এল। বাড়ির সামনে এসে আচমকাই থমকে দাঁড়াল দুইজন। উত্তরের হাওয়ার বেগে ছুটে আসার ফলে বুকের ভিতর দুইজনেরই জমেছিল অপরিসীম ক্লান্তি। থমকে দাঁড়াবার পরও যেন সেই ক্লান্তি টের পেল না তারা। তবে হাঁ করে শ্বাস টানতে লাগল। কামারবাড়ির হাপরের মতন ওঠানামা করতে লাগল বুক। শরীর ফেটে বেরুতে লাগল চইত বইশাখের খরতাপ। দুইজন মানুষ একসঙ্গে তাকাল মাওলানা সাহেবের বারবাড়ির সামনে নিথর হয়ে থাকা নাড়ার পালার দিকে। কিন্তু নাড়ার পালাটা যেন তারা দেখতে পেল না, তাদের চোখে পড়ল পালা ফুটা করে আকাশের দিকে উঠে যাওয়া বাঁশের মাথায় ঘোর কালো বর্ণের যে হাঁড়ি বসানো সেই হাঁড়ির দিকে। এই হাঁড়ি হাঁড়ি না, কাকতাড়ুয়া। খড়িমাটি দিয়ে বিশাল দুইখানা চোখ আঁকা হয়েছে হাঁড়ির পেট বরাবর। সেই চোখ এখন যেন একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে হামিদা আর দবির গাছির দিকে। যেন মান্নান মাওলানার হয়ে নূরজাহানের অন্যায়ের জন্য বকাবাজি করছে তার মা-বাবাকে।
কাকতাড়ুয়ার চোখের দিকে তাকিয়ে বুকের কাঁপন আরও বাড়ল হামিদার। ক্লান্তি ভয় মিলেমিশে বুকের ভেতর ডুগডুগ, ডুগডুগ শব্দ হতে লাগল। যেন পহেলা বৈশাখে কালীরখিলের গলুইয়া (মেলা) থেকে ডুগডুগি কিনেছে দুরন্ত নূরজাহান। হামিদার বুকের কাছে দাঁড়িয়ে অক্লান্ত হাতে বাজাচ্ছে। মেয়ের হাতে বাজানো ডুগডুগির শব্দ হাড় পাজরা ভেঙে বুকের ভিতর ঢুকে আঁট করে যেন বসেছে হামিদার। এখন শুধুই বাজছে, বাজছে।
নিজের বুকের ভিতরকার শব্দে আচ্ছন্ন হয়ে গেল হামিদা। ধুলায় লুটাচ্ছিল শাড়ির আঁচল, ভয়ার্ত ভঙ্গিতে আঁচল বুকে তুলল সে। মাথায় ঘোমটা দিল, তারপর স্বামীর দিকে তাকাল।
শীতের হাত থেকে বাঁচবার আশায় ছেঁড়াফাড়া মোটা গেঞ্জিখান পরেছিল দবির। উঠানের রোদে জবুথুবু হয়ে বসেছিল, তবু যেন উষ্ণ হচ্ছিল না শরীর, তবু যেন ছেড়ে যাচ্ছিল না শীত। আর এখন দবিরের দুইপাশের কান ছোঁয়া তেলতেলে জুলপির ফাঁক দিয়ে নেমেছে ঘামস্রোত, নাকের তলায় আর ঘাড়ে গলায় বিজবিজা ঘাম। বুকের কাছে, পিঠের কাছে ভিজে উঠেছে মোটা গেঞ্জি। এ কি হাওয়ার বেগে ছুটে আসার ফল, নাকি মেয়ের অপরাধের কথা ভেবে, ভয়ংকর পরিণতির কথা ভেবে নাড়ার আগুনের চেয়েও ভয়াবহ কোনও তাপ উত্তাপ শরীর ভেঙে বেরুচ্ছে তার!
