বাইরের গড়িয়ে যাওয়া দুপুরের নির্জনতায় তখন ঝিমধরা ভাব। গয়াগাছের ওদিক থেকে ভেসে আসছিল ক্লান্ত এক কাকের ডাক। থেকে থেকে ডাকছিল কাকটা। সেই ডাকের মাঝখানেই যেন নিজের মধ্যে ফিরে এল মরনি। কাঁথার তলায় লুকিয়ে থাকা নূরজাহান তখন কেমন স্থির হয়েছে। শরীরের কাপনটা নাই। ভয়ে আতঙ্কে ফেলা শ্বাস প্রশ্বাসের শব্দ বদলে গেছে। এখন শব্দটা কেমন ধীর, গম্ভীর। গভীর ঘুমে ডুবে যাওয়া মানুষের শ্বাসপ্রশ্বাসের শব্দের মতন।
কাঁথার আড়ালে লুকিয়ে থাকা নূরজাহানের শরীর থেকে আলগা হল মরনি। দুহহাতে জড়িয়ে রাখা নূরজাহানকে ছেড়ে দিল। কিন্তু নূরজাহানের কোনও সাড়া নাই। একেবারেই নিথর হয়ে আছে, নিঃসাড় হয়ে আছে।
হঠাৎ এমন বদলে গেল কী করে নূরজাহান! কেমন করে সামলাল নিজেকে! এরকম কাজ করার পর এইটুকু মেয়ে কী করে এত সহজে পারল নিজেকে সামলাতে! নাকি মরনির কারণে হল এমন! ঘরের অন্ধকারে লুকিয়ে, কাঁথার তলায় লুকিয়ে, বুকের ওমে আশ্রয় দিয়ে মরনি কি বাঁচিয়ে তুলতে পারল মেয়েটিকে!
চট করে একবার মুরগির ছাওটার কথা মনে পড়ল মরনির। বুকের ক্ষতে হলুদ বাটা আর চুন মিশিয়ে, পলোর ঘেরে আটকে কিছুক্ষণ পর পর যেমন করে দেখছিল ছাওটাকে, কতটুকু সেরে উঠল ছাওটা বোঝার চেষ্টা করছিল, নূরজাহানের ব্যাপারটাও তেমন করে বুঝতে চাইল সে। নূরজাহানের শরীর থেকে আলগা হয়ে আস্তে করে তার মুখ থেকে কাঁথাটা সরাল মরনি। সরিয়ে অবাক হল। কখন, কোন ফাঁকে যেন ঘুমে একেবারে তলিয়ে গেছে নূরজাহান। চোখ মুখ দুশ্চিন্তাহীন। যেন মায়ের বুকে পরম নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে অবোলা শিশু।
নূরজাহানের এই মুখ দেখে বুক তোলপাড় করে উঠল মরনির। নূরজাহানের মুখে সব শোনার পর যা হয়নি এখন তাই হল। চোখ পানিতে ভরে এল। মরনির শুধু মনে হল বাড়ির আঙিনা থেকে, মায়ের বুক থেকে মুরগির ছাওটাকে যেমন থাবা মেরে নিয়ে গিয়েছিল। দাঁড়কাক তেমন করে যদি মান্নান মাওলানা কিংবা আতাহার থাবা মেরে নেয় নূরজাহানকে, তাদের মুখ থেকে নূরজাহানকে কোনও না কোনওভাবে যদি ফিরিয়ে আনা যায়, তারপরও নূরজাহানের এই নির্মল মুখ আর নির্মল থাকবে না। এই নির্মল শরীর আর নির্মল থাকবে না। মানুষের সঙ্গে দাঁড়কাক আর মুরগির অনেক ব্যবধান। যে ধরে সে যদি পুরুষ হয়, যাকে ধরে সে যদি হয় নারী তা হলে নারীর যে ক্ষতিটা হয়, যে ক্ষত হয় তার শরীরে, দুনিয়ার কোনও অষুদে সেই ক্ষত সারানো যায় না। সেই ক্ষতের চিহ্ন জীবনভর ফুটে থাকে চেহারায়। হাজার চিকিৎসায়ও তা সারে না। এইটুকু মেয়ের ওপর আল্লাহতালায় কেন চাপিয়ে দিলেন এরকম এক আতঙ্কের বোঝা! কেন তাকে দিয়ে করালেন এমন এক কাজ! আল্লাহর ইশারা ছাড়া কি মানুষ কিছু করে!
তারপর আল্লাহর কথা ভেবেই যেন উঠে দাঁড়াল মরনি। নূরজাহানকে দিয়ে ওই কাজ করিয়ে মরনির কাছে আল্লাহই নিশ্চয় পাঠিয়েছেন নূরজাহানকে। মানুষের বিপদে মানুষ কতটা তার পাশে দাঁড়ায় সাত আসমানের উপর বসে এরকম পরীক্ষায় মাঝে মাঝে মানুষকে ফেলেন আল্লাহতালায়। নূরজাহানকে দিয়ে মরনিকেও হয়তো সেরকম এক পরীক্ষায়ই। ফেলেছেন। নয়তো গ্রামে এত মানুষজন থাকতে, এত বাড়িঘর থাকতে নূরজাহান কেন হালদার বাড়িতেই এল! নরু হালদারের অংশে, মরনির কাছেই সে এল কেন! আল্লাহ। নিশ্চয় দেখতে চাইছেন নূরজাহানের বিপদে কেমন করে তার পাশে দাঁড়ায় মরনি, কেমন করে রক্ষা করতে চায় নূরজাহানকে।
চৌকি থেকে নেমে পাটাতনের ওপর খানিক স্থির হয়ে দাঁড়াল মরনি। কাঁথার তলায় ঘুমিয়ে থাকা নূরজাহানের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল, তুই ঘুমা মা, তুই নিশ্চিন্তে ঘুমা। আমি আছি তর লেইগা। আল্লায় তরে বাঁচাইবো।
ঘরের কোণে রাখা কাঠের পুরানা সিন্দুকের ওপর থেকে লোহার ভারী তালাটা নিয়েছে। মরনি, তালার পেটে গেঁথে রাখা চাবিটা নিয়েছে। নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়েছে। দরজার বাইরে যে শিকল আছে সেটা আছে দরজার নীচের দিকে। শিকল লাগাবার যে আংটা সেটা আছে চৌকাঠের সঙ্গে। তালাটা সেখানে লাগাতে যাবে মরনি, সংসারের কথা মনে পড়ল। কিছুই করা হয়নি আজ। অথচ সকালবেলাই দুপুরের রান্নার ভাবনাটা ভেবে রেখেছিল মরনি। সেচিশাক আর টাকিমাছ। সেইমতো কি এখন আর কাজ করা যাবে!
দুপুর হেলে গেছে। এখন কোন ফাঁকে সেচিশাক তুলতে যাবে মরনি, কোন ফাঁকে ঘরের ভিতরকার ঘোপা থেকে টাকিমাছ তুলে নিবে! কোন ফাঁকে মাছ কুটবে, কোন ফাঁকে ধোয়া পালা শেষ করে তরকারি রাধবে! চুলা তো একখানা। ভাতটাই বা রাঁধবে কখন! আর গোসল!
চিন্তাভাবনায় প্যাঁচ লেগে গেল মরনির।
কিন্তু রান্না তো কিছু করতেই হবে! পেট তো কোনও কথা শুনবে না। ক্ষুধা লাগবেই। তা ছাড়া নূরজাহানের ঘুমও তো একসময় ভাঙবে। ক্ষুধা তারও লাগবে। মরনির আশ্রয়ে যখন আছে, মরনি নিজে খেলে নূরজাহানকেও খাওয়াতে হবে। অবশ্য একজন আর দুইজন মানুষের রান্নার মধ্যে তেমন ব্যবধান কিছু নাই। নিজের ভাত তরকারির পরিমাণ সামান্য বাড়ালে নূরজাহানের খাবারটাও হয়ে যাবে। একই পরিশ্রমে দুইজনের খাবার।
কিন্তু খেতে কি নূরজাহান চাইবে?
না চাইলেও খাওয়াতে হবে। জোর করে হলেও খাওয়াতে হবে। স্বাভাবিক করে তুলতে হবে মেয়েটিকে। পরে দেখা যাবে কী হয়।
