দবির বলল, না।
মামানি আম্মা, আপনেও বোজেন নাই?
হামিদা সরল গলায় বলল, না।
কন কী?
দবির বলল, তর লগে আমরা মিছা কথা কমুনি?
মিছা কথা না কইলেন, ফাইজলামি তো করতে পারেন!
তর লগে আমার ফাইজলামি চলে না। কোনওদিন করিও নাই। তর লগে আমার ফাইজলামির সমন্দ না। তর মা’রে আমি বুজি কইতাম। আপনা না অইলেও, রক্তের সমন্দ
অইলেও তুই আমার ভাইগ্না। ভাইগ্নার লগে ফাইজলামি করার লাহান মানুষ আমি না।
হ, আমিও তো আপনেরে অমুনঐ মনে করি। তয় এইডা তো আবার বিশ্বাসও অইতাছে না।
কোনডা?
নূরজাহানের কামড়া।
এবার উতলা হল হামিদা। নূরজাহানের কোন কামডা? কী করছে নূরজাহান?
আপনেরা জানেন না?
দবির হামিদা দুইজন একসঙ্গে বলল, না।
কন কী?
দবির বলল, হ। কী করছে নূরজাহান?
এবার ধপ করে মাটিতে বসে পড়ল আজিজ। হায় হায় করে উঠল। আমিও তো হেইডাঐ কই! এতবড় একখান কাম যেই বাড়ির অতড় (এতটুকু) মাইয়ায় করছে হেই বাড়ির মাইনষে, মাইয়ার মা-বাপে কেমতে এমুন চুপচাপ থাকে? অহন সেন্না বোজলাম ঘটনাড়া মা-বাপে জানে না।
আজিজ বসে পড়েছে আর কোন ফাঁকে যেন উঠে দাঁড়িয়েছে দবির হামিদা। গভীর দুশ্চিন্তা আর উত্তেজনায় যেন ভিতরে ভিতরে ফেটে পড়ছে দুইজনে। দুপুর ফুরিয়ে গেছে। খানিক পরই ঠুলইয়ে ছ্যান কাটাইল নিয়ে, কোমরে কাছি প্যাচিয়ে, ভারের দুইদিকে ছোট ছোট মাটির হাঁড়ি নিয়ে গাছ ঝুড়তে বেরুবে দবির। বেজায় খিদে পেয়েছে। দুপুরে ভাত খাওয়ার সময় পেরিয়ে গেছে অনেকক্ষণ আগে। মেয়ের জন্য অপেক্ষা করে করে খাওয়া হয়নি। এখন খেলে জিরাবার আর সময় পাওয়া যাবে না। ভারী পেট নিয়ে বেরুতে হবে কাজে। ফলে কাজ হবে ধীর, চলন হবে ধীর।
রসের দিনে এমন কখনও হয় না দবির গাছির। সকাল সকাল রসের কারবার সেরে বাজারহাটে যায় সে। বাড়ির নামায় ছোট্ট দুইখানা কোলা আছে। কলুই সরিষা, তিল কাউন আর আউশ ধানটা হয়। হাতে সময় থাকলে কোলা দুইটোর তদারকও করে কোনও কোনওদিন। তারপর দুপুরের মুখে মুখে নেয়ে ধুয়ে ভাতটা খায়। খাওয়াদাওয়ার পর খানিক তামাক টানে। চৌকিতে চিত হয়ে শুয়ে আধঘণ্টা একঘণ্টার ঘুম দেয় কখনও, কখনও বা বসেই কাটায় সময়। দুপুর ফুরিয়ে এলে যখন বাড়ি থেকে বেরোয় তখন আর কোনও ক্লান্তি নাই। যেন আজই প্রথম গাছ ঝুড়তে বেরুচ্ছে এমন আমোদ ফুর্তি ঘোরাঘুরি করে শরীরে। আজিজের কথা শুনে আজ সেইসব অনুভূতি কোথায় উধাও হয়েছে দবির গাছির। ক্ষুধা বলতে কিছুই যেন এখন আর নাই। বুকের ভিতর লুকিয়ে থাকা আত্মা যেন জায়গা ছেড়ে ঠেলে উঠেছে গলার কাছে। ফলে আত্মার শূন্যস্থানে একসঙ্গে বাজছে হাজারটা ঢাকের বাদ্য।
হামিদার অবস্থাও একই রকম। মুহূর্তে চোখের পলকে যেন মরে গেছে ক্ষুধা। চোখের পলকেই যেন ম্লান হয়েছে বাড়ির ঘর আঙিনা, গাছপালা। মাথার উপরকার আকাশ যেন অসময়ে নামাতে শুরু করেছে কুয়াশা। কুয়াশায় যেন আচ্ছন্ন হয়েছে উঠানে বসে থাকা আজিজ গাওয়ালের মুখ। মুখ যেন অস্পষ্ট তার, দেখা যায় না।
কী করেছে নূরজাহান? কোন সর্বনাশ ঘটিয়েছে? কেন এমন হায় হায় করছে আজিজ গাওয়াল?
তা হলে কি হামিদার কথাই ঠিক হল? এই যে আজই খানিক আগে মেয়ে নিয়ে দবিরকে বলেছিল, এই মাইয়া লইয়া কপালে শনি আছে তোমার। অহন শাসন না করলে একদিন হায় হায় কইরা কূল পাইবা না, কাইন্দা কূল পাইবা না। কপালে শনি কি তা হলে আজই ঘনিয়েছে তাদের। আজ কি সেই হায় হায় করার দিন! কেঁদে কূল না পাওয়ার দিন!
হামিদা কোনওরকমে আবার বলল, কী করছে নূরজাহান?
আজিজ বলল, মাওলানা সাবের মোকে ছ্যাপ ছিড়াইয়া দিছে।
চিৎকার করে উঠতে গিয়ে গলা চাপাল দবির। কচ কী?
হ। সড়কে। গেরামের বেবাক মাইনষের সামনে, দারগা পুলিশের সামনে।
হামিদা ছটফটা গলায় বলল, তারবাদে?
তারবাদে খেতের উপরে দিয়া দৌড় দিছে।
দৌড় দিয়া কই গেছে?
হেইডা কইতে পারি না। আমি তো মনে করছি বাইত্তে আইয়া পড়ছে। আপনেরা বেবাকতে জাইন্না গেছেন। জাইন্না গেরামের ময়মুরব্বি ধইরা, মাওলানা সাবের হাতে পায়ে ধইরা মাইয়ারে বাঁচাইছেন।
এবার গলা আর চাপিয়ে রাখতে পারল না দবির। চিৎকার করে বলল, না না।
ভয়ে উত্তেজনায় গলা ভেঙে গেল তার।
স্বামীর দিকে তাকিয়ে দিশেহারা গলায় হামিদা বলল, হায় হায় সব্বনাশ অইছে। মাইয়া তো বাইত্তে আহে নাই। মাইয়ারে তো মনে হয় আতাহাররা ধইরা লইয়া গেছে। এইডা কী অইল, হায় হায় এইডা কী অইল?
আর কোনওদিকে তাকাল না হামিদা। পাগলের মতন বাড়ির নামার দিকে দৌড় দিল। শাড়ির আঁচল চকের মাটিতে লুটাতে লাগল, খেয়াল করল না। যেন এখনই ছুটে গিয়ে মেয়ের সামনে না দাঁড়াতে পারলে নয়মাস দশদিন গর্ভের অন্ধকারে লুকিয়ে রাখা মেয়েটিকে সে রক্ষা করতে পারবে না। যেন তার ওইটুকু মেয়েকে ছিঁড়েখুঁড়ে খাবে আকাশ থেকে নেমে আসা শকুনের দল। যেন বহুকাল অনাহারে ছিল তারা, যেন বহুকাল পর খাদ্যের সন্ধান। পেয়েছে।
হামিদার ছুটে যাওয়া দেখল দবির তারপর নিজেও ছুটল তার পিছু পিছু।
দবিরের উঠানে আজিজ গাওয়াল তখন মাটির মতন নিথর হয়ে আছে।
.
কাঁথার উপর দিয়ে কতক্ষণ নূরজাহানকে বুকে জড়িয়ে রেখেছিল মরনি কে জানে। কোন তাড়নায় কাজটা সে করেছিল কে জানে। বাইরে কতটা গড়িয়ে যাচ্ছিল দুপুর মরনি টের পায়নি। তার শুধু মনে ছিল ভয়ে আতঙ্কে মরোমরো মেয়েটিকে বাঁচাতে হবে। ঘরের অন্ধকারে, কাঁথার তলায় লুকিয়ে বুকের তাপে বাঁচিয়ে তুলতে হবে। তারপর দেখা যাবে কোথায় কী ঘটে। সময় কিছুটা কেটে গেলে রাগক্রোধ কমে আসবে মাওলানা সাহেবের। গ্রামের দুই-চারজন ময়মুরব্বি নিয়ে মাওলানা সাহেবের বাড়ি গিয়ে তার পা জড়িয়ে ধরলেই হবে। পায়ের উপর কেঁদে পড়লে মানুষ মানুষকে মাফ না করে পারে না। দরকার হলে মরনিও যাবে মান্নান মাওলানার বাড়িতে। নূরজাহানের হয়ে, নূরজাহানের মা-বাবার হয়ে। সেও না হয় মাফ চাইবে মাওলানা সাহেবের কাছে। নিজের অপরাধী সন্তানের জন্য যেমন করে অনুনয় করবে নূরজাহানের মা-বাবা, মরনিও নাহয় তেমন করেই করবে। মান্নান। মাওলানার হাতে পায়ে ধরে সেও না হয় বলবে, পোলাপান মানুষ, কিছু না বুইজ্জা কামড়া কইরালাইছে। অরে আপনে মাপ কইরা দেন। অর কোনও ক্ষতি আপনে কইরেন না। আপনের পোলা আতাহাররে কইয়া দেন হেয়ও য্যান অরে মাপ কইরা দেয়, হেয়ও য্যান অর কোনও ক্ষতি না করে। যতদিন বাইচ্চা থাকবো এমুন কাম নূরজাহান আর কুনোদিন। করবো না।
