যাদের আছে তারা কেউ সেভাবে গ্রামে থাকেন না। খানবাড়ির লোকজন। তারা কেউ মান্নান মাওলানা কিংবা গ্রামের লোকজনের কথা সেভাবে ভাবেন না। ভাবেন গ্রামে যারা যেভাবে আছে থাকুক। আমাদের কী! আমরা আমাদের মতো আছি, গ্রামের লোকজন তাদের মতো থাকুক।
এই অবস্থায় তা হলে কারা আছে দবির নূরজাহানের সঙ্গে, কোন শক্তিবলে এমন নির্বিকার হয়ে আছে নূরজাহানের মা-বাবা! নূরজাহানই বা কোথায়!
দুপুর ফুরিয়ে আসা রোদে তখন শিমুলের ঝরে যাওয়া ফুলের রং ধরেছে। শীতের হাওয়ায় খুব ভিতর থেকে লেগেছে তীব্র এক টান। মাটি গাছপালা আর মানুষের শরীরে জমে থাকা খেজুর রসের মতো রস গাছির ওপর ক্ষুণ্ণ হয়ে থাকা গাছ যেভাবে ভিতর দিকে শুষে নেয় ঠিক সেইভাবে শুষে নিচ্ছে চিরকালীন প্রকৃতি। এই টানে এখনই বুঝি ফেটে চৌচির হবে অনাদিকালের মাটি, ইরল চিরল দাগে জর্জরিত হবে গাছের বাকল আর পাতারা। মানুষের চামড়া হবে আরজিনার (গিরিগিটি) চামড়ার মতন। পিপাসায় কাতর হবে মানুষ। পানির অভাবে ছাতি ফাটবে।
আজিজ গাওয়ালেরও কি ছাতি ফাটার উপক্রম! গলা বুক শুকিয়ে আসছে কেন!
আজিজ সেঁক গিলল। তারপর রান্নাচালার দিকে তাকাল। দুইটা শালিক এখনও চরছে ওদিকপানে। হাওয়ার টানে ঘাড়ের রোয়া একদিকে ঝুঁকে আছে একটি পাখির। অন্যটা আছে হাওয়ার দিকে মুখ করে। ফলে ঘাড়ের রোয়া পিঠের উপর ঝুঁকেছে।
রান্নাচালার পিছন দিককার বাঁশবন আকুলি বিকুলি করছে উত্তরের হাওয়ায়। শনশন শব্দে মুখর হয়েছে বাঁশবন। বাঁশবনের মাথায় একটুখানি ঝুঁকে আছে নীলসাদা আকাশ। ঘুমাতে যাওয়ার আগে যেমন ফ্যাকাশে হয় কোনও কোনও মানুষের মুখ, আকাশ এখন তেমন। খানিক পরই যেন ঘুমিয়ে পড়বে আকাশ, ফুরিয়ে যাবে দিনের আলো। কুয়াশার জালে বন্দি হবে মানুষের দুনিয়া।
আজিজ গাওয়াল একবার আকাশের দিকে তাকাল। পলকের জন্যে তার মনে হল সাত আশমানের উপর বসে থাকা মহান আল্লাহপাকের কথা। কী ক্ষমতাবান তিনি। একই সঙ্গে দেখতে পান দুনিয়ার প্রতিটি মানুষ, মানুষের মনের ভিতর লুকিয়ে থাকা রহস্যময়তা তাঁর কাছে পানির মতন পরিষ্কার। একই সঙ্গে তিনি দেখতে পান মানুষের জন্ম এবং মৃত্যুকে, মানুষের অতীত বর্তমান এবং ভবিষ্যৎকে। মানুষের জীবন, জীবিকা, নিয়তি সব তাঁর আঙুলের ডগায়। অদৃশ্য এক সুতায় দুনিয়ার প্রতিটি মানুষকে বেঁধে রেখেছেন তিনি। যেমন ইচ্ছা তেমন করে খেলাচ্ছেন মানুষকে। হয়তো দবির গাছি আর তার বউকেও খেলাচ্ছেন। আর তাদের খেলার দর্শক করে দিয়েছেন আজিজ গাওয়ালকে। এই যে এতবড় একটা ঘটনা ঘটে গেছে গ্রামে, ঘটনা ঘটিয়েছে যে মেয়ে তার মা-বাবা এমন নির্বিকার হতে পারে। কেবল আল্লার ইশারায়ই।
আজিজ গাওয়াল চুপচাপ হয়ে আছে দেখে তার দিকে তাকাল দবির। হাসিমুখে বলল, কী অইলো গাওয়াল? কথা কও না ক্যা?
আকাশের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে দবিরের দিকে তাকাল আজিজ। কী কমু?
একখান কথা জিগাইলাম তার দিহি জব দিলা না? অনেকক্ষুন অইয়া গেল!
হামিদা বলল, হ। কথার জব না দিয়া আশমানের মিহি চাইয়া রইলেন। আশমানের মিহি চাইয়া কী জানি চিন্তা করছিলেন।
আজিজ হাসল। আপনে বোজলেন কেমতে?
আমি আপনেরে খ্যাল করছি। আপনে চাইয়া আছিলেন আশমানের মিহি আর আমি চাইয়া আছিলাম আপনের মিহি।
আজিজ আবার হাসল। তারপরই মুখটা ব্যাজার করল। আইজ আপনে আমার লগে এমুন পর পর ব্যাভার করতাছেন ক্যা মামানি আম্মা?
হামিদা একটু থতমত খেল। কীয়ের পর পর ব্যাভার?
এই যে আপনে আপনে করতাছেন আমারে?
দবির বলল, হ আমিও খ্যাল করলাম। আজিজরে তুমি আপনে আপনে করতাছো ক্যা? ছনুবুজির পোলা। ও তো আমার ম্যালা ছোড।
হামিদা বলল, ছোড বড়র কথা না। কথাডা অন্য। আজিজ মামারে আমি সব সময় আপনে কইরাঐ কই।
কও কী? আমি তো কোনওদিন হুনি নাই।
হোনছ। খ্যাল করো নাই।
আজিজ বলল, আমিও খ্যাল করি নাই। আমার য্যান মনে অয় আপনে আমারে সব সমায়ই তুমি কইরা কন। আর গাছি মামায় কয় তুই কইরা।
না, আপনে কইরা কই। আপনের লগে দেখাসাক্ষাৎ কম অয় তো, এর লেইগা মনে নাই আপনের।
দবির বলল, তয় আমি যে তুই কইরা কইতাম এইডা আমার মনে আছে।
আজিজ বলল, তয় আইজ তুমি কইরা কইতাছেন ক্যা?
কী জানি!
একটু থেমে, একটু ভেবে দবির বলল, আইজ তোমারে দেইখা কেমুন জানি অন্যরকম লাগতাছে গাওয়াল। মনে অইতাছে তুমি ছনুবুজির পোলা আজিজ না। তুমি য্যান অন্য মানুষ। ভিনগাওয়ের গাওয়াল। আমগো গেরামে আইছ গাওয়াল করতে।
আজিজ বলল, আপনেগ দুইজনেরও আমার জানি কেমুন অন্যরকম লাগতাছে আইজ। মনে অইতাছে আপনেরা আপনেরা না, আপনেরা য্যান অন্যমানুষ। নাইলে এইরকম একখান ঘটনা ঘইটা যাওনের পর কেমতে বাড়ির উডানে বইয়া রইছেন আপনেরা? কেমতে রইদ পোয়ান, কেমতে মাইনষের লগে কথা কন? কে আছে আপনেগো পিছে? কার সাহসে এতো সাহস আপনেগো?
আজিজের কথার আগামাথা কিছুই বুঝতে পারল না দবির, কিছুই বুঝতে পারল না। হামিদা। দু’জনেই অবাক হয়ে তাকাল আজিজের মুখের দিকে।
দবির বলল, কী কচ তুই? কিছু তো বোজতাছি না।
হামিদা বলল, হ। কী ঘটনা ঘইট্টা গেছে? কীয়ের সাহস আমগো? কী কন আপনে?
একবার হামিদার মুখের দিকে আর একবার দবিরের মুখের দিকে তাকাল আজিজ। পট পট করে চোখে কয়েকটা পলক ফেলল। আমার কথা আপনেরা বোজেন নাই?
