আর একখানা সুবিধা হল তামা পিতলের জিনিস ক্ষয় হয়ে গেলেও, ভেঙেচুরে লন্ডভন্ড হয়ে গেলেও কদরটা তার থেকেই যায়। ভাঙারিরা সের দরে কিনে নেয়। এমনকী ভাঙারি আর গাওয়ালরা পুরনো, ক্ষয় হয়ে যাওয়া কিংবা, ভাঙাচোরা জিনিসের বিনিময়ে নতুন জিনিসও দেয়। তিন-চারখানা ভাঙা জিনিসের বিনিময়ে হয়তো বা নতুন, ভাল একখানা জিনিস পাওয়া গেল।
কায়দাটা একেবারে সোনা রুপার মতন।
কোনও কোনও বোকা গিরস্ত এসব বুঝতে চায় না। তারা মনে করে তামা পিতল হচ্ছে আদ্যিকালের বস্তু। এই বস্তুর কদর আজকাল নাই। আজকাল হচ্ছে কাঁচের যুগ, কাঁচের জিনিসের কদর আর কদর চিনামাটির। থালা বাসন গেলাস বাটি জগ সবই কাঁচের, সবই চিনামাটির। কিন্তু বস্তুগুলো যে মানুষের সম্পর্কের মতন, প্রেম পিরিতির মতন যখন তখন ভাঙে সেদিকে কারও নজর থাকে না।
এসব ভেবে আজিজ গাওয়াল ভিতরে ভিতরে বেশ উত্তেজিত হল। গিরস্ত লোকের বাড়ি গিয়ে আজ থেকে যদি এই ধরনের কথা আজিজ বুঝিয়ে বলতে পারে তা হলে তামা পিতলের কদরটা আবার আদ্যিকালের মতন বাড়বে। কাঁচ মাটি ফেলে লোকে নিশ্চয় তামা পিতলের দিকে ঝুঁকবে। মানুষ হচ্ছে লোভী জীব। যেদিকে লাভ সেদিকেই ঝুঁকবে। কথা হল কোনখানে লাভ সেটা তাদের বুঝিয়ে দিতে হবে, চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে হবে।
তারপর আরেকটা বিষয় আবিষ্কার করল আজিজ গাওয়াল। লোকে যে বলে আল্লাহ যা। করেন মানুষের মঙ্গলের জন্যে করেন, কথাটা ঠিক। এই যে জীবনের একটি দিন মাটি হয়ে যাওয়ার পরও তামা পিতল আর কাঁচ মাটির প্রভেদের যে জটটা আজ অন্যরকমভাবে খুলল আজিজ, এ তো আল্লার ইশারাতেই হল। এই জট খোলার ব্যাপারটা যখন গিরস্তলোককে বুঝিয়ে বলতে পারবে আজিজ তখন তার মালসামানের বিক্রি বেড়ে যাবে। হাতে টাকা আসবে দেদারসে। আজিজ আর আজিজ থাকবে না।
দবির গাছির বাড়ি থেকেই কি এই কাজটা আজ শুরু করবে আজিজ গাওয়াল!
রান্নাচালার সামনে চরে বেড়ানো তিনটা শালিকের একটা আনমনা ভঙ্গিতে উঠানের মাঝামাঝি চলে এসেছিল। দবির গাছি এবং হামিদা চুপচাপ বসে আছে দেখে, নড়াচড়া করছে না দেখে ভয়টা সে পায়নি। উড়াল দেওয়ারও দরকার হয়নি। কিন্তু তামা পিতলের ভার কাঁধে চকের দিক থেকে আজিজকে এই উঠানে উঠে আসতে দেখে পাখিটা তার স্বভাব মতো চঞ্চল হল। দবির হামিদার মাঝখান দিয়ে বড়ঘরের চালার দিকে উড়াল। দিল। শালিক পাখির উড়ে যাওয়ার কারণেই যেন আজিজকে দেখতে পেল দবির গাছি, হামিদা। আর দবির হামিদার মুখ দেখে খানিক আগের ভাবনাটায় তালগোল পাকিয়ে গেল আজিজ গাওয়ালের। যে বাড়ির ওইটুকু মেয়ে আজ সকালেই এমন একটা কাজ করেছে সেই বাড়ির মানুষের, মেয়ের মা-বাবার মন মেজাজ আজ কেমন হতে পারে তা অনুমান করা হদ্দবোকার পক্ষেও সম্ভব। সেই বাড়িতে আর যাই হোক গাওয়াল করা সম্ভব না, সেই বাড়িতে আর যাই হোক তামা পিতলের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্যাচাল পাড়া সম্ভব না। পাড়তে গেলে গিরস্তলোক বিরক্ত হবে। কাজ না হয়ে অকাজ হবে। শুরুর দিনেই মার খেয়ে যাবে আজিজ, বিমুখ হয়ে যাবে।
তা হওয়া ঠিক হবে না। যে-কোনও ভাল কাজের শুরুও ভাল হওয়া উচিত।
তা হলে আজিজ এখন কী করবে? দবির গাছির বাড়িতে যখন এসেই পড়েছে কিছু একটা তাকে করতেই হবে। দুই-একটা ভালমন্দ কথা অন্তত বলতে হবে। গৃহস্থের খোঁজখবরটা নিতে হবে। তা ছাড়া যে বাড়ির মেয়ে আজ এমন একখানা কাজ করেছে সেই মেয়ের মা-বাবার সঙ্গে কত রকমের কথাই তো বলা যায়! কত রকম ভাবেই তো সান্ত্বনা দেওয়া যায় তাদের আর সেটাই তো মানুষের ধর্ম। যদিও আজিজ কারও সাতেপাঁচে থাকে না, থাকে শুধু নিজেকে নিয়ে, ছেলেমেয়ে এবং ছেলেমেয়ের মা’কে নিয়ে। কিন্তু কোনও কোনও সময় অন্যকে নিয়েও তো থাকতে হয়। আজকের দিনটা যখন মাটি হয়েই গেছে, সকালটা যখন মান্নান মাওলানার সঙ্গে থেকেছে, এখন না হয় দবির গাছির সঙ্গে থাকল। একটা দিন না হয় এইসব কাজেই গেল। আল্লাহ হয়তো এরকমই ইশারা করছেন। আর একফাঁকে মনের ভিতর গাওয়ালটা অন্যভাবে করার একখানা মন্ত্র ঢুকিয়ে দিয়েছেন। ওই মন্ত্রের বলে মাটি হয়ে যাওয়া দিন সোনা হয়ে ফিরে আসবে আজিজের।
আজিজ গাওয়াল কাঁধের ভার নামাল।
ততক্ষণে দবির হামিদা দুইজনেই তাকে দেখতে পেয়েছে। দুইজনেই হাসিমুখে তাকিয়েছে তার দিকে।
দবির বলল, সঘাত কী গাওয়াল? আইজ দিহি নিজ গেরামে?
দবিরের গলার স্বর, কথা বলার ধরন আর মনের ভিতরকার আমুদে ভাব দেখে বেশ বড় রকমের একখানা ধাক্কা খেল আজিজ। এ কী করে সম্ভব! যার মেয়ে গ্রামের সবচাইতে ক্ষমতাবান মানুষের মুখে থুতু ছিটিয়ে দিয়েছে সে এমন আমুদে ভঙ্গিতে কথা বলে কী করে! এমন নির্বিকার ভঙ্গিতে বউর সঙ্গে নিজের উঠানে বসে থাকে কী করে! বসার ভঙ্গিতে মনে হচ্ছে আয়েশ করে রোদ পোহাচ্ছে। এমন হয় নাকি! এমন হয়!
হামিদার মুখও তো নির্বিকার। মুখ দেখে মনেই হচ্ছে না তার পেটের মেয়ে এমন কাজ করেছে। একমাত্র মেয়ের অন্যায় অপরাধের কথা জেনে কোন মা-বাবা পারে এমন নিশ্চিন্তে থাকতে! শক্তিটা কোথায় তাদের! কারা আছে দবিরের মতন মানুষের পাশে দাঁড়াবার! আর মান্নান মাওলানার বিরুদ্ধে দাঁড়াবার শক্তিই বা এই গ্রামে কাদের আছে!
