নাকি এর পিছনে আছে মানুষের তৈরি সমাজব্যবস্থার অতি সাধারণ কোনও ভয়ভীতি! নূরজাহানের প্রতিবাদী আচরণে, মান্নান মাওলানার মুখে থুতু ছিটিয়ে দেওয়া দেখে পার্থিব ভয়ে কি মানুষের মতন প্রকৃতিও স্তব্ধ হয়েছে!
আজিজ কিছু বুঝতে পারে না। মনের ভিতর, মাথার ভিতর নিরন্তর কাজ করতে থাকা সূক্ষাতিসূক্ষ্ম সুতা প্যাঁচ লেগে যায়। খানিক চেষ্টা করে প্যাঁচটা ছুটাতে চায় সে। পারে না। তখন হতাশ হয়ে এসব চিন্তা বাদ দেয়। মনের ভিতর জাগিয়ে তুলতে চায় নিজের একটি দিন মাটি হয়ে যাওয়ার বেদনা। জীবনের অদৃশ্য খেরোখাতার একটি পাতায় হিসাবের যোগ বিয়োগ গুণ ভাগ করে চলে।
হিসেব মিলে না আজিজের। গ্রাম পাথালে তামা পিতল অ্যালুমিনিয়ামের ভার কাঁধে হাঁটতে হাঁটতে সেই অদৃশ্য খেরোখাতায় জীবন হিসাবের আশ্চর্য একটা জট সে একসময় খুলে যেতে দেখে। জীবন থেকে যে সময় হারিয়ে যায় সেই সময়ের কাজটুকু, সেই সময়ের লাভ লোকসান এক জীবনে আর কখনও পূরণ হয় না। পেরিয়ে যাওয়া সময়ের পর যে সময় আসে বোকা মানুষ সেই সময়কে আগের সময়ের সঙ্গে মিলিয়ে সুদে আসলে পেরিয়ে যাওয়া সময়ের লোকসানটা পুষিয়ে নিতে চায়। তাতে লাভের জায়গায় জীবনশক্তির ক্ষয়কর্মে যে লোকসানটা হয় সেই লোকসান যে এক জীবনে আর লাভের মুখ দেখে না, সময়ের আসল মারপ্যাঁচটা যে এখানেই, আজ দুপুরের আগে আজিজ যেন তা টেরই পায়নি। তবে টের পেয়ে মনটা কীরকম ভার হয়ে গেল তার। একটা দিনের বেশ কিছুটা সময় মাটি করে দেওয়ার জন্য মোতালেবের ওপর খুব রাগ হল। মনে মনে খুব গালাগাল করতে ইচ্ছে করল তাকে। কিন্তু গালাগালটা আজিজ করল না। একসময় নিজের ভিতর জেগে উঠতে দেখল আশ্চর্য এক অভিমান। মোতালেবের কথায় সে ভুলেছিল কেন! চতুররা তো কত কথাই বলে! চতুরদের কথায় ভাল মানুষরা ভুলবে কেন!
আজিজ কেন ভুলেছিল!
এই অভিমানে কাঁধ থেকে আজিজের ছুঁড়ে ফেলতে ইচ্ছা করল তামা পিতলের ভার। মুহূর্তের জন্য যেদিকে দুইচোখ যায় চলে যেতে ইচ্ছা করল।
তারপরই মনে হল, এ বোধহয় মহান আল্লাহপাকেরই ইচ্ছা। তার ইচ্ছা ছাড়া গাছের পাতাও নড়ে না। মোতালেবের কারণে আজিজের একটা দিন যে মাটি হবে এটা আল্লাহপাকের ইশারাতেই হয়েছে। তিনি যা করেন মানুষের মঙ্গলের জন্যই করেন। এই মাটি হওয়া দিনের ভিতরই হয়তো মঙ্গলের কোনও ইঙ্গিত আজিজের জন্য রেখে দিয়েছেন তিনি। ভবিষ্যতে তার ফল পাবে আজিজ।
এসব ভেবে ভার হওয়া মন হালকা হয়ে গেল আজিজের। কোঁচড় থেকে বিড়ি বের করে ধরাল সে। ততক্ষণে আজিজ এক্কেবারে দবির গাছির বাড়ির কাছে।
উঠানের রোদে তখনও গা ছেড়ে বসে আছে দবির গাছি, তার মুখোমুখি পিঁড়িতে বসে আছে হামিদা। রান্নাচালার সামনে নিঃশব্দে খাবার খুঁজে ফিরছে তিনটা ভাতশালিক। রসের হড়িকুড়ি, ভার পড়ে আছে মানুষ আর পাখিদের আশপাশে।
এই বাড়ির কাছাকাছি এসে যেন হঠাৎ করেই বাড়িটা দেখতে পেল আজিজ গাওয়াল, মানুষ আর শালিক পাখি দেখতে পেল। রসের হাঁড়ি ভার দেখতে পেল। যেন বা এতক্ষণ সে ছিল ঘুমে। ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে হেঁটেছে এতটা পথ। ফলে কিছুই যেন দেখতে পায়নি, কিছুই যেন চোখে পড়েনি। অথবা দিনদুপুরেই তাকে যেন ধরেছিল রাতদুপুরের কানাওলা। আপন গ্রামেই যেন পথ হারিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছে সে। পথ চিনতে পারেনি। কার কোন বাড়ি, চিনতে পারেনি। এইমাত্র যেন কানাওলা ছেড়ে গেছে তাকে, এইমাত্র যেন সব চিনতে পারছে। তারপরই সেই অদৃশ্য খেরোখাতার একটি পৃষ্ঠা আবার খুলে গেছে আজিজ গাওয়ালের চোখে। একটি দিনের হিসাব গরমিল হয়ে গেছে। যদি হিসাবটা খানিক মিলানো যায়, লোকসানের জায়গায় যদি এসে দাঁড়ায় দুই-চার টাকার লাভ তা হলে কিছুটা অন্তত পোষায়! এই ভেবে দবির গাছির উঠানে এসে উঠল আজিজ।
রসের দিনে টাকাপয়সার আকাল নাই দবির গাছির। কোঁচড়ে টাকাপয়সা থাকলে এইসব টুকটাক জিনিস গিরস্তে বেশ কিনে। ঠিকঠাক মতো বুঝতে পারলে দবিরও কিনবে। তামা পিতলের জিনিস তো তার দরকারই। মেয়ে বড় হয়েছে। মেয়ের বিয়েতে পিতলের জগ কলসি, পানদান চিলমচি, তামার থালা গ্লাস এসব না লেগে পারে না। যদিও লোকে আজকাল কাঁচের জিনিসপত্র কিনে, চিনামাটির জিনিসপত্র কিনে, মেলামাইন বলে একটা জিনিস বেরিয়েছে তাও কিনে, তবু তামা পিতলের জিনিসের কদর কমেনি। যারা কেনার তারা এখনও এসব জিনিসই কিনে। তা ছাড়া গ্রাম গেরস্তে তামা পিতলের জিনিসপত্র কেনে অন্য একটা কারণেও। এক দুই জনমে তামা পিতলের জিনিসের কোনও ক্ষতি হয় না। ফেলিয়ে ছড়িয়ে রাখলেও নষ্ট হয় না। সবচেয়ে বড়কথা হল জিনিসগুলি সোনা রুপার মতন। আকালের দিনে গিরস্তকে বাঁচিয়ে রাখে। ঘরে চাল না থাকলে এক-দুইখানা তামা পিতলের জিনিস বাজারে নিয়ে গেলেই হয়। নগদ দামে কিনে নিবে ভাঙারিরা। এ জন্যে বছরের যে সময়টায় টাকাপয়সা হাতে থাকে গিরস্তের সেই সময় অনেকেই এইসব জিনিস কিনে রাখে। টাকাপয়সা না জমিয়ে এইসব জিনিস জমায়।
টাকা হচ্ছে গাছের শুকনা পাতার মতো। যখন তখন ফরফর করে উড়ে যায়। এজন্য টাকা না জমিয়ে তামা পিতল জমানো ভাল। খুব বেশি ঠেকায় না পড়লে, অভাবের ঝড় কালবৈশাখীর মতন প্রবল না হলে ঘর থেকে তামা পিতল কখনও উড়ে যায় না। ঘরের জিনিস ঘরেই থাকে।
