তারপরই ব্যাপারটা বুঝল বানেছা। পেটের ভিতর আছে যেজন সেজন বেশ বড় হয়ে উঠেছে। দুই-দশদিনের মধ্যেই নাজেল হবে। বানেছার ক্ষুধার সঙ্গে তার ক্ষুধাটাও যে যোগ হয়েছে! এক বানেছা এখন আসলে দুইজন। একের ক্ষুধা এখন আসলে দুইজনের।
মনে মনে পেটের অন্ধকারে লুকিয়ে থাকা সন্তানটির উদ্দেশে বানেছা বলল, কী রে, এতো খিদা লাগে ক্যা তর? বোজছ না, তর খিদা লাগলে আমারও খিদা লাগে! জাইন্না হুইন্না আমারে তুই জ্বালাছ ক্যা? ঠিক আছে জ্বালা! আর কয়দিন জ্বালাবি! পেট থিকা বাইর হওনের পর তো আর এই জ্বালানডা জ্বালাইতে পারবি না!
বিড়ি টানতে টানতে উদাস চোখে বানেছার দিকে তাকিয়েছে আজিজ। তাকিয়ে দেখে বানেছা নিঃশব্দে কথা বলছে কিন্তু ঠোঁট মৃদু মৃদু নড়ছে তার। মুখখানা হাসিহাসি। নিজের দিনটা মাটি হয়ে যাওয়ার কথা ভুলে বানেছাকে সে জিজ্ঞেস করল, কী কও?
বানেছা চমকাল। কো কী কই?
মনে মনে?
বানেছা হাসল। মনে মনে কওয়া কথা অন্যে হোনেনি?
না হোনে না। তয় তোমার ঠোঁড লড়তাছিল।
বানেছা আবার হাসল। আসলে কিছু কই না। ঠোঁড এমতেই লড়তাছিল।
ব্যস্ত হাতে পাঁচখানা থালায় ভাত বাড়তে লাগল বানেছা।
তখনই যেন হঠাৎ মনে পড়েছে এমন ভঙ্গিতে আজিজ বলল, হায় হায় তোমারে তো একখান কথা কওয়া অয় নাই।
চোখ তুলে স্বামীর দিকে তাকাল বানেছা। কী কথা?
আইজ একখান কাম অইছে।
হেইডা তো জানি। মাকুন্দার কথা কইতাছো না?
আরে না। নূরজাহান একখান কাম করছে। হুজুরের মোকে ছ্যাপ ছিড়াইয়া দিছে।
কথাটা যেন বুঝতে পারল না বানেছা। ভুরু কুঁচকে বলল, কী?
হ। কেমতে?
ঘটনা খুলে বলল আজিজ। শুনে পোলাপানের জন্য ভাত বাড়তে ভুলে গেল বানেছা। হতবাক হয়ে আজিজের মুখের দিকে তাকিয়ে কোনওরকমে বলল, কও কী?
হ।
এতবড় সাহস অর অইলো কেমতে?
হেইডাঐত্তো কেঐ বোজতে পারে নাই।
কামডা ও করলো ক্যা?
কে কইবো?
খানিক চুপ করে থেকে বানেছা বলল, মরণে টানছে অরে। নিজের মরণ ও নিজে ডাইক্কা আনলো। মাথায় মনে অয় শয়তানে আছড় করছে। এর লেইগা মাথা বিগড়াইয়া গেছিলো। নাইলে এমুন কাম করে মাইনষে?
মাকুন্দার দশা দেইক্কা মনে অয় মাথা ঠিক রাখতে পারে নাই?
ক্যা, মাকুন্দা অর ভাতার অয়নি?
কে জানে?
এই ছেমড়ির কপালে যে অনেক বিপদ আছে অরে দেইক্কাঐ আমি হেইডা বোজতাছিলাম। অর চালচলন ভাল না। বেড়াগো লাহান। যা মনে লয় করে, যেহেনে মনে লয় যায়গা। এইবার বোজবো। হুজুরের মোকে ছ্যাপ ছিড়াইয়া দেয় ওইড় ছেমড়ি, হুজুরে অরে কিছু কইলেও, হুজুরে অরে ছাইড়া দিলেও হুজুরের পোলা আতাহারে অরে ছাড়বো না। আতাহারে অরে ঠিকঐ দেইক্কা লইবো। রাইত দোফরে বাইত থিকা ধইরা আইন্না দোস্তগো লইয়া আকাম কুকাম করবো। তারবাদে ল্যাংটাচোংটা কইরা ধানখেতে হালাইয়া রাখবো। গেরামের বেবাক মাইনষে অরে দেকবো।
আজিজ কথা বলল না। বিড়ি অনেক আগেই শেষ হয়ে গিয়েছিল, কখন ফেলে দিয়েছে মনে নাই। এখন আবার একটা বিড়ি ধরাতে ইচ্ছে করল তার।
তখনই বানেছা বলল, নূরজাহান অহন কো?
হেইডা কইতে পারি না। দৌড় দিয়া কোনমিহি গেল কে জানে?
মনে অয় বাইত্তেঐ গেছে। আর কই যাইবো!
হ।
উঠে দাঁড়াল আজিজ। যাই, বাইতথন বাইর অই। খোঁজখবর লইয়া দেহি কারবার কী অইলো।
বানেছা বলল, বাইর যহন অইতাছো ভারখান লইয়াঐ বাইর অও।
আজিজ অবাক হল। ক্যা?
গাওয়ালডাও করলা।
কই গাওয়াল করুম? দুফইরা ভাত খাইয়া কোলাপাড়া মিহি যাওন যাইবো? আইজ মনে করছিলাম উত্তরমিহি যামু। উত্তর মেদিনমণ্ডল, সীতারামপুর, দোকাছি, কোলাপাড়া অইয়া বাইত আমু।
হেইডা যহন হইলো না নিজের গেরামেঐ গাওয়াল করো। নূরজাহানের সম্বাতও লইলা, গাওয়ালও করলা।
হ বুদ্দিডা খারাপ না। তয় কারবার অইবো বইলা মনে অয় না। তবু তুমি যহন কইছো, যাই।
তারপর ভার কাঁধে বাড়ি থেকে বেরিয়েছে আজিজ। সে যখন বাড়ির নামায় বানেছা তখন চিৎকার করে পোলাপানদের ডাকছে। খাইতে আয় তরা। ভাত বাড়ছি।
.
বাড়ি থেকে বেরিয়ে আজিজের মনে হল গ্রামখানি কীরকম যেন স্তব্ধ হয়ে আছে। কোথাও যেন কোনও শব্দ নাই, প্রাণের সাড়া নাই। গাছপালায় নাই হাওয়ার চলাচল, পাখির ডাক। মানুষের ঘরবাড়ি সব রাতদুপুরের মতো নির্জন হয়ে আছে। যেন কেউ কোথাও জাগনা (জেগে) নাই, যেন সবাই ডুবে আছে গভীর ঘুমে।
এমন হয়েছে কেন?
দুপুরের পর এমনিতেই নির্জন হয় গ্রাম। গৃহস্থলোক খেতখোলার কাজ সেরে, হাটবাজার সেরে বাড়ি ফিরে। তারপর নাওয়াখাওয়া সেরে ঘণ্টাখানেক জিরায়। তখন চারদিকে প্রাণের সাড়া কম থাকে। এখন যদিও সেই সময়, কিন্তু এমন নির্জন হয়েছে যেন হাওয়াও বইছে না। হাওয়ার হয়েছে কী! হাওয়া কেন বইছে না!
পাখিদের হয়েছে কী! কেন ডাকাডাকি করছে না তারা!
তবে একটা শব্দ সব সময়ই জেগে থাকে গ্রামদেশে, নির্জনতার শব্দ, স্তব্ধতার শব্দ। গাছের পাতায়, ঘাসের বনে, শস্যের চকেমাঠে গভীর নির্জনতায়ও জেগে থাকে এক ধরনের ঝিমমারা শব্দ। সূক্ষ্মভাবে খেয়াল না করলে সেই শব্দকে শব্দ মনে হয় না।
আজ সেই স্তব্ধতার শব্দও শুনতে পেল আজিজ।
এমন হয়েছে কেন আজ! মানুষের পাপে কি লজ্জায় মুখ লুকিয়েছে প্রকৃতি! বইতে ভুলে গেছে হাওয়া! গাইতে ভুলে গেছে পাখিরা! উড়তে ভুলে গেছে!
নাকি সাত আসমানের উপর বসে তার তৈরি দুনিয়ার দিকে, মানুষের দুনিয়ার দিকে সারাক্ষণ চোখ মেলে তাকিয়ে থাকা মহান আল্লাহপাকের ইচ্ছায় আজ এমন হয়েছে। কাল রাত থেকেই আল্লাহ যখন দেখেছেন দুনিয়ার এককোণে, বাংলাদেশের একখানি গ্রামে তার তৈরি এক নিরীহ অবোলা বান্দার ওপর ভয়াবহ অত্যাচার করছে শক্তিমান আরেক বান্দা, জীবন ছারখার করছে সেই মানুষের, আর মিথ্যার আশ্রয়ে মহান করে তুলছে নিজেকে, সেই মানুষের পাপে দুনিয়াকে তিনি স্তব্ধ হতে বলেছেন। এ জন্যই কি এমন হয়েছে আজ!
