আজিজ অবাক হয়ে বলেছে, কই যামু তোমার লগে?
মাওলানা সাবের বাইত্তে।
ক্যা?
এমুন বিপদের দিনে তার পাশে গিয়া খাড়ইলে হেয় খুশি অইবো।
মোতালেবের কথায় সরল সোজা আজিজ পর্যন্ত বুঝতে পারল না মান্নান মাওলানার বিপদটা কী? বিপদ তো মাকুন্দা কাশেমের!
কথাটা সে বলেও ফেলল।
শুনে মোতালেব বলল, ঠিক কইছো। আসল বিপদ মাকুন্দার। মাইর তো খাইছে, অহন জেলেও যাইবো। তয় মাওলানা সাবের বিপদও কম না। থানায় দোড়াদোড়ি, পুলিশ দারগাগো চা পানি খাওয়ানো, হাতের কাছে মানুষজন থাকলে বলভরসা পায়। তোমারে দেখলেও বল পাইবো। তুমি তার চোক্কের সামনে থাইক্কো, পরে একদিন মাওলানা সাবরে আমি বুঝাইয়া কমুনে যে আইজ্জারে আপনে মাপ কইরা দেন। লও। গাওয়ালে একদিন না গেলে কিছু অইবো না, মাওলানা সাবের পাশে গিয়া না খাড়ইলে ক্ষতি অইবো।
সবশুনে মনের ভিতর একটা প্যাঁচঘোচ লেগে গিয়েছিল আজিজের। খানিক দোনোমোনো করে তামা পিতলের ভার ঘরে রেখে মোতালেবের সঙ্গে হাঁটা দিয়েছিল।
ফিরে আসার পর থেকে মনটা কামড়াচ্ছে। সত্তর-আশি টাকার শোকে গলা দিয়ে ভাত নামছিল না। পোলাপানগুলি শীতের উঠানে হইচই করছিল। মেজোছেলেটা বাড়ির নামার দিককার বউন্নাগাছে বসে গলা ছেড়ে গান গাইছিল,
দুয়ারে আইসাছে পালকি
নাইওরি মাও তোলো রে, তোলো মুখে
আল্লাহ রসুল সবে বলো।
বানেছা বসেছিল আজিজের সামনে। আট-সাড়ে আট মাসের পেটখানা তার যতটা না বড় বসার ভঙ্গিতে আরও বড় দেখাচ্ছিল। ওই তো আরেকজন এই সংসারে আসার ফিকির করছে। একটা মুখ বাড়ল। খাদ্যে ভাগ বসাবার মুখ।
এই অনাগত মুখের কথা ভেবে শোকটা যেন আরও উথলে উঠল আজিজের। একেক লোকমা ভাতের সঙ্গে একেক ঢোক পানি খেতে লাগল সে। দেখে বানেছা বলল, কী অইছে তোমার? এমুন করতাছো ক্যা?
পানির গেলাস নামিয়ে রেখে আজিজ বলল, মনডা ভাল না।
ক্যা?
গাঁওয়ালে গেলাম না।
গেলা না ক্যা?
মোতালেইব্বার কথায়।
গিয়া কী কাম অইলো?
কী কাম অইবো? ওই যে মোতালেইব্বা যেই হগল কথা কইয়া লইয়া গেল!
কিছু তো বোজলাম না।
বানেছা অবাক হল। ক্যা, বোজো নাই ক্যা?
মাওলানা সাবে তো আমার মিহি চাইলঐ না। হেয় আছিল দারগা পুলিশ লইয়া, মাকুন্দারে লইয়া।
বানেছা খুবই বুঝদারের ভঙ্গিতে বলল, তারবাদেও তো বুজা যায়।
মুখে দেওয়া ভাত গিলে আজিজ বলল, কেমতে?
মোক দেইক্কা। কেঐ যুদি তোমার উপরে চেইত্তা থাকে তয় তার মোক দেইক্কাঐ হেইডা বুজা যায়।
আমি বুজি নাই।
বানেছা একটু রাগল। তুমি তো ভোঁদাই। তুমি বোজবা কেমতে!
বউর মুখে এরকম একটা গাল খেয়েও রাগল না আজিজ। একে মনের ভিতর পিঁপড়ার কামড় তার ওপর এখন যদি বানেছার সঙ্গে লেগে যায় তা হলে অশান্তির আর শেষ থাকবে না।
নিরীহ মুখ করে আজিজ বলল, তয় আমার একখান ভুল অইছে আইজ।
কীয়ের ভুল?
মোতালেইব্বার কথা বিশ্বাস কইরা। ও তো মানুষ ভাল না। মা’র মরণের দিন দেকলা কেমুন পট্টি দিয়া টেকাড়ি আমার খাইলো!
হ। ও একটা পিচাশ। কাফোনের কাপড় থিকাও চুরি করে।
শেষ লোকমা ভাত খেয়ে শেষ টেক পানি খেল আজিজ। তারপর লুঙ্গির খুঁটে মুখ মুছল। আইজও মোতালেইব্বা আমারে এমুন একখান পট্টি দিয়াঐ লইয়া গেছিলো।
কথাটা বুঝতে পারল না বানেছা। বলল, আইজ মোতালেইব্বা তোমারে পট্টি দিবো ক্যা? আইজ তো কেঐ মরে নাই, আইজ তো কাফোনের কাপড় কিনতে যাওন লাগবো না! আইজ তো অর কোনও লাবও নাই!
আছে।
কী লাব?
আমার একটা দিন মাইর দিলো।
তোমার দিন মাইর দিয়া অর লাব কী?
এইডাও অর এক রকমের লাব। অন্যের ক্ষতি কইরা কোনও কোনও মানুষ শান্তি পায়। নিজের নাক কাইট্টা পরের যাত্রাভঙ্গ।
এবার বানেছা আবার রাগল। এইডা যে অহন বোজতাছ, আগে বোজো নাই ক্যা?
ম্লান মুখে হাসল আজিজ। এইডাঐত্তো ভুল।
লুঙ্গির কেঁচড় থেকে তারপর কুম্ভিপাতার বিড়ি বের করে ধরাল আজিজ। যেখানে বসে খাচ্ছিল সেখান থেকে সরে এসে দুয়ারের সামনে বসে উদাস হয়ে বিড়ি টানতে লাগল।
বানেছা তখন স্বামীর জুডা (খাওয়া শেষ করা, ধোয়া হয়নি এমন) থালা গেলাস, তরকারির বাটি এসব গোছগাছ করছে। ভারী শরীরে নড়াচড়া সে কম করে। যেখানে বসে সেখানে এমন আঁট করে বসে যেন সহজে উঠতে না হয়, যেন এক জায়গায় বসেই অনেকক্ষণ ধরে অনেকগুলো কাজ করতে পারে।
এখনকার ভঙ্গিটাও তেমন।
বানেছা পিঁড়িতে বসেছে, বড়ঘরের দক্ষিণ দিককার বেড়া ঘেঁষে। এদিকটায় খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা। রান্নাচালা থেকে রান্না সেরে, ভাতের ফ্যান গেলে হাঁড়িখানা লুচনি (গরম হাঁড়ি ধরার ন্যাকড়া) দিয়ে ধরে এই ঘরে নিয়ে আসে সে। তরকারির কড়াই, ডাল দুধের হাঁড়িও একই কায়দায় আনে। বড়ঘরের দক্ষিণ দিককার বেড়া ঘেষে কয়েকখানা মাটির জলকান্ধা (যার ওপর ভাত তরকারির হাঁড়ি কড়াই রাখা হয়। পাতা আছে। হাঁড়ি কড়াই সেই সব জলকান্ধায় বসিয়ে পিড়ি আর নয়তো হোগলা পেতে পোলাপান আর পোলাপানের বাপকে ভাত বেড়ে দেয় সে। অনেক সময় সবার সঙ্গে বসে নিজেও খায়।
আজও তেমনভাবে গুছিয়েই বসেছে। এখন এখান থেকে অনেকক্ষণ না নড়লেও হবে। স্বামীর খাওয়া শেষ হয়েছে। এখন পোলাপানে খাবে। তারপর খাবে বানেছা। অনেকটা সময় পার হয়ে যাবে।
কিন্তু বানেছার এত ক্ষুধা লাগছে কেন আজ? এখনও তো ভাল করে দুপুর হয়নি!
