নূরজাহানের এই অবস্থা দেখে বুকটা উথাল পাথাল করে উঠল মরনির। যেন নূরজাহানের মতো অসহায় এখন সে নিজেও। কী করবে মরনি এখন? নূরজাহানের জন্যে কী করবার। আছে তার?
এদিকে ঘরের বাইরে তরতর করে বাড়ছিল শীতের বেলা। গাঁদাফুলের পাপড়ির মতো রংধরা রোদ গাঢ় থেকে গাঢ়তর হচ্ছিল। উঠানের শীতল মাটি উষ্ণ হচ্ছিল। পেয়ারার ডালে বসে থেকে থেকে শিস দিচ্ছিল এক অচিন পাখি। আর কোথাও কোনও শব্দ ছিল না। সংসারের কাজ সবই পড়ে ছিল মরনির। সেসব কথা এখন তার মনে নাই। এখন তার মন জুড়ে নূরজাহান, এখন তার চোখ জুড়ে নূরজাহান। নূরজাহানকে নিয়ে কী করবে সে এখন?
নূরজাহানের শরীরের কাঁপন কি তখন আরও বেড়েছে? যেন হঠাৎ করেই ব্যাপারটা খেয়াল করল মরনি। সব ভুলে বলল, এমনে কাপতাছস ক্যা?
কান্নার হেঁচকি তুলে নূরজাহান বলল, কইতে পারি না। শীত করতাছে।
কচ কী?
হ।
শীতটা অইতাছে শইল্লের ভিতরে। বাইরে না। হাত পাও বেঁকা অইয়া আইতাছে।
কথা বলার ফাঁকে দাঁতে দাঁত ঠুকে গেল নূরজাহানের। ঠোঁট বাঁকা হয়ে এল।
হায় হায় শীতে মরে যাবে নাকি মেয়েটা!
মরনি পাগলের মতো জড়িয়ে ধরল নূরজাহানকে। শিশুর মতো পাঁজাকোলে করে নূরজাহানকে তুলল চৌকিতে। কোনওরকমে তাকে শুইয়ে দিয়ে মাথার কাছ থেকে হাছড় পাছড় করে টেনে আনল ভাঁজ করে রাখা পুরানা মোটা কাঁথা। কথায় ঢেকে দুইহাতে চেপে ধরল নূরজাহানকে। কাঁপিয়ে জ্বর আসার পর সন্তানকে কাঁথা কাপড়ে ঢেকে যেমন করে জড়িয়ে ধরেন মা, ঝড়বৃষ্টির হাত থেকে অসহায় ছানাকে ডানার আড়ালে লুকিয়ে যেমন করে রক্ষা করে মা পাখি, তেমন করে যেন নূরজাহানকে রক্ষা করতে চাইল মরনি। ভুলে গেল কী করেছে নূরজাহান। কোন অপরাধে অপরাধী সে। কী শাস্তি হবে তার।
কাঁথার তলায়ও নূরজাহান তখন ঠকঠক করে কাঁপছে। কান্নাটা এখন আর নাই। শরীরের ভিতরকার প্রবল কাঁপুনি যেন চোখের পানি শুষে নিয়েছে।
নিজের অজান্তেই নূরজাহানের পাশে শুয়ে পড়ল মরনি। কথার আবরণে ঢাকা নূরজাহানকে একহাতে জড়িয়ে ধরে টেনে আনল বুকের কাছে। কাঁথার উষ্ণতার সঙ্গে নিজের বুকের উষ্ণতা মিলিয়ে আরও উষ্ণ করে তুলতে চাইল নূরজাহানকে। কাঁপুনি বন্ধ করতে চাইল।
কতক্ষণ, এভাবে কতক্ষণ কে জানে!
একসময় কাঁপুনি কমে এল নূরজাহানের। কাঁথার ভিতর থেকে একটা হাত বের করে, অসহায় শিশু যেমন করে আঁকড়ে ধরে মায়ের গলা, তেমন করে মরনির গলা আঁকড়ে ধরল সে। কোত্থেকে আগের সেই কান্নাটা ফিরে এল। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে ভাঙাচোরা গলায় নূরজাহান বলল, আম্মা, আম্মাগো, আপনে আমারে বাঁচান আম্মা, আপনে আমারে বাঁচান। তারা আমারে মাইরা ফালাইবো।
নূরজাহানের কথা শুনে অদ্ভুত এক ঘোরের মধ্যে পড়ে গেল মরনি। তার মনে হল নূরজাহান যেন নূরজাহান না, নূরজাহান যেন তার সেই মুরগি ছানাটি। আততায়ী দাঁড়কাকের মতো মান্নান মাওলানা যেন থাবা দিয়ে ধরেছে তাকে। ঠোকরে ঠোকরে, তীক্ষ্ণ নখের আঁচড়ে আঁচড়ে নূরজাহানকে যেন ফালা ফালা করছে। বুকের কচিমাংস যেন খাবলে খাবলে তুলছে। এই আততায়ীর হাত থেকে কেমন করে নূরজাহানকে বাঁচাবে মরনি! কেমন করে রক্ষা করবে!
কতটা সময় এসব ভাবে মরনি, কে জানে। তারপর নিজের অজান্তেই একসময় আরও গভীর করে বুকে জড়িয়ে ধরে নূরজাহানকে। যেন বহু চেষ্টার পর এইমাত্র দাঁড়কাকের তীক্ষ্ণ ঠোঁট থেকে, পায়ের ধারালো নখের থাবা থেকে ছিনিয়ে নিতে পেরেছে মুরগি ছানাটিকে। এখন বুকের ক্ষতে হলুদ বাটার সঙ্গে চুন মিশিয়ে প্রলেপ দিলেই যেন সেরে উঠবে সে।
.
হামিদা বলল, ভাত বাভুম?
কথাটা যেন কানেই গেল না দবির গাছির। সে বসে আছে ঘরের সামনে, যেখানে শীতদুপুরের রোদ পুরানা কাঁথার ওমের মতো, যেখানকার মাটি খড়নাড়ার আগুনজ্বলা চুলার পারের মতো। বসে থাকলে পৌষ মাঘের বেজায় শীত কিছুতেই কাবু করতে পারে না কাউকে।
শীতের হাত থেকে বাঁচার আশায়ই এখানে বসে আছে দবির। খানিক আগে পুকুরে নেমে চার-পাঁচখানা ডুব দিয়েছে। তাতেই গোসল সারা। উঠে ঠক ঠক করে কাঁপতে কাঁপতে শরীর মাথা মুছেছে। লুঙ্গি বদলে, ভিজা লুঙ্গি চিপড়ে বাড়ির উঠানে মেলে দিয়ে শরীরে আঁট করে সরিষার তেল মেখেছে।
শীতকালে বেজায় খড়ি ওঠে শরীরে। গোসল করে সরিষা তেল মাখলে খড়ি কমে, শরীর গরম হয়।
আজও হয়েছে। তবে সেটা ওই তেল মাখার সময়, হাত পা দাপড়ানোর সময়। তারপরই বাড়ির ঘরদোরের আনাচ কানাচ থেকে, গাছগাছড়া ঝোঁপঝাড়ের ডালপালা থেকে, বাড়ির নামার দিককার চকমাঠ থেকে হাড় কাঁপানো শীত এসে জাপটে ধরেছে। মোটা একখানা গেঞ্জি আছে ঘরে, গেঞ্জিখানা গায়ে দিয়ে গাছি তারপর রোদে এসে বসেছে। ভারী একখানা আরামে সে এখন ডুবে আছে।
এইরকম আরামে কার কথা কার কানে যায়!
দবিরের পায়ের কাছে পড়ে আছে বাঁশের তেল চকচকা ভার, ভারের দড়াদড়ি, রসের কয়েকখানা খালি হাঁড়ি আর গাছ ঝুরার সময়, গাছ থেকে রসভরা হাঁড়ি নামাবার সময় কোমরে বাধার মোটা দড়ি।
শীতকালে দিনেরবেলা এসব জিনিস ঘরে তোলার সময় হয় না। ঘরে তোলা থাকে শুধু ছ্যান কাটাইল আর হাতুড়ি রাখার ঠুলই। দুপুরের পর ফুলই মাজায় বেঁধে, দড়ি এককাঁধে, আরেক কাঁধে ভার, ভারের দুইপাশে রসের খালি ঘড়ি নিয়ে বাড়ি থেকে বেরোয় দবির। খেজুরগাছ আছে যেসব বাড়িতে সেইসব বাড়িতে যায়। ঝুরাগাছে চড়ে, কোমরে দড়ি বেঁধে গাছের গলার কাছে বাঁকা হয়ে দাঁড়ায়। ছ্যান কাটাইলে অতিযত্নে, অতি মায়ায় ঝুরাগাছ নতুন করে পরিপাটি করে, হাঁড়ি পাতে। মনে মনে টুকটাক কথা বলে গাছেদের সঙ্গে। গাছেদের কথাও যেন শোনে।
