এহেনে খাড়ইয়া কইতে পারুম না। ঘরে লন, কইতাছি।
ক্যা, এহেনে খাড়ইয়া কইলে কী অইবো?
তারা মনে অয় আমার পিছে পিছে দোড়াইয়া আইতাছে। এহেনে খাড়ইয়া থাকতে দেখলেঐ ধইরা লইয়া যাইবো।
মরনি তবু নড়ল না। বলল, কারা তর পিছে পিছে দোড়াইয়া আইতাছে? কারা তরে ধইরা লইয়া যাইবো?
এবার শিশুর মতন ঠোঁট ফুলিয়ে কেঁদে ফেলল নূরজাহান। ঘরে লন। বেবাক কথা আপনেরে আমি কইতাছি।
নূরজাহানের কান্না দেখে বুকটা হু হু করে উঠল মরনির। কেমন যেন দিশাহারা হল সে। নূরজাহানের পিঠের কাছটা একহাতে জড়িয়ে গভীর মমতার গলায় বলল, ল।
ঘরে ঢুকে নূরজাহান বলল, দুয়ারডা লাগায় দেন।
মরনি বলল, দুয়ার লাগান লাগব না। তুই ক।
না, আপনে লাগান। নাইলে আমারে বাঁচাইতে পারবেন না। মৃত্যুর কথা শুনলে বুকটা হঠাৎ করেই গ্রাম প্রান্তরের নির্জনে একাকী পড়ে থাকা মাঠের মতো হয়ে যায় মরনির। মজনুর মায়ের কথা মনে পড়ে, নুরু হালদারের কথা মনে পড়ে। কিছুদিন ধরে এই দুইজন মানুষের পাশাপাশি মনে পড়ে আরেকজন মানুষের কথা। ছনুবুড়ি। একমুঠো ভাতের আশায় গ্রামের এইবাড়ি ওইবাড়ি ঘুরে বেড়াত। এর কথা ওকে, ওর কথা তাকে বলে কূটনামি করত ভাতের আশায়। ছোটখাটো চুরিচামারি করত, সেও ওই ভাতের আশায়।
ছনুবুড়ি নাই। মৃত্যু তাকে কোথাকার কোন অচিন জগতে নিয়ে গেছে। সেই জগতে ভাতের আশায় এইবাড়ি ওইবাড়ি ঘুরতে হয় না। এর কথা ওকে, ওর কথা তাকে বলে কূটনামি করে ভাত জোটাতে হয় না। ভাতই যদি না জোটাতে হয় তা হলে আর চুরিচামারি কেন?
ছনুবুড়ি নাই, মরনির মতন মেদিনীমণ্ডলের আরও অনেকেরই কি যখন তখন মনে পড়ে না তার কথা? ছনুবুড়ির কথা ভেবে কি দীর্ঘশ্বাস ফেলে না কেউ? মনে মনে বলে না, আহা রে, বুড়িডা একদিন আছিল, বুড়িডা আইজ নাই।
ছনুবুড়ির মতো নুরজাহানও যদি মরে যায়, নুরজাহানও যদি না বাঁচে তা হলে কি মরনির হঠাৎ হঠাৎ মনে পড়বে না তার কথা? এই যে তার কাছে এসে এমন অনুনয়ের স্বরে বলছে বাঁচা মরার কথা, এমন করে আর কে বলবে!
মরনি আনমনা হয়ে আছে দেখে নূরজাহান কাতর গলায় ডাকল, আম্মা, ও আম্মা।
মরনি যেন নিজের মধ্যে ফিরল। উঁ।
দুয়ারডা লাগান।
এবার আর কথা বাড়াল না মরনি। দরজা লাগাল। ভয়ার্ত ভাব তখনও আছে নূরজাহানের চেহারায়। চোখের ছলছলানো অবস্থাটা নাই। তবে শরীরটা যেন কীরকম কাঁপছে। যেন হু। হু করা উত্তরের হাওয়ায় আকুল হয়ে কাঁপছে গয়া (পেয়ারা পাতা) পাতা।
নিজেকে সামলাবার জন্যে যেন চৌকিতে বসল নূরজাহান।
নূরজাহানের চোখের দিকে তাকিয়ে মরনি বলল, এইবার ক আমারে কী অইছে?
নূরজাহান কোনওরকমে বলল, মাওলানা সাবের মোকে আমি ছ্যাপ ছিড়াইয়া দিছি।
কথাটা যেন বুঝতে পারল না মরনি। বলল, কী করছস?
নূরজাহান আবার বলল।
শুনে মরনি হতভম্ব হয়ে গেল। কোন মাওলানা সাবের মোকে?
মান্নান মাওলানার।
এবার এতটাই দিশাহারা হল মরনি, যেন ভাতের ফ্যান গালতে বসে গরম ফ্যান তার পায়ে পড়েছে। এমন আচমকা পড়েছে, মরনি ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না কী করবে। ফ্যালফ্যাল করে নূরজাহানের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল সে। তারপর ছটফটা ভঙ্গিতে নূরজাহানের একটা হাত থাবা দিয়ে ধরল। হায় হায়, করছস কী তুই? ক্যান করছস, ক্যান করছস এমুন কাম?
মরনির আচরণে ভয়টা যেন আরও বেড়ে গেল নূরজাহানের। শরীরের কাঁপন বেড়ে গেল। চোখ ফেটে জোয়ারের পানির মতো নামল কান্না। থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে, কান্না কাতর জড়ানো গলায়, ভেঙে ভেঙে নূরজাহান বলল, কাশেম কাকার কথা হুইন্না, কাশেম কাকারে দেইক্কা আমার আর কিছু খ্যাল (খেয়াল) আছিল না। আমি য্যান পাগল অইয়া গেছিলাম।
মরনি উতলা গলায় বলল, কোন কাশেমের কথা কচ তুই?
মাকুন্দা কাশেম।
অর আবার কী হইছে?
দুইহাতে চোখ মুছতে মুছতে নূরজাহান বলল, আপনে জানেন না?
না।
কান্নার মাঝখানে বড় করে একটা শ্বাস ফেলল নূরজাহান। আগের মতনই কাঁপছে সে, আগের মতনই কান্নায় জড়িয়ে যাচ্ছে গলা। তবু মাকুন্দা কাশেমের কথা মরনিকে বলল সে। যতটা সম্ভব খুলেই বলল। শুনে মরনি তেমন ভারাক্রান্ত হল না। যদিও খুবই নরম। মনের মানুষ সে, মানুষের জন্যে খুব মায়া তবু যেন মাকুন্দা কাশেমের জন্যে তার তেমন মায়া হল না। বহুদিনের পরিচিত হওয়ার পরও মাকুন্দা কাশেমের মুখটাই যেন তার মনে। পড়ল না। সে উতলা হল নূরজাহানের জন্যে। বোধহয় দূরের মানুষের চেয়ে চোখের। সামনের মানুষের কষ্ট বেদনা মানুষকে বেশি নাড়া দেয়। মাকুন্দা কাশেমের কষ্ট বেদনার চেয়ে নূরজাহানের ভয়টা যেন, কান্নায় ভেঙে পড়াটা যেন বেশি নাড়া দিচ্ছে মরনিকে। নূরজাহানের মতো সেও যেন আচ্ছন্ন হচ্ছে গভীর আতঙ্কে।
সব শুনে মরনি আবার বলল, করছস কী তুই? সব্বনাশ তো কইরা লাইছস (ফেলেছিস)। এতো মাইনষের সামনে, দারগা পুলিশের সামনে মান্নান মাওলানার মোকে দিছস ছ্যাপ ছিডাইয়া! মান্নান মাওলানা তো তরে ছাড়বো না। হ্যায় ছাড়লেও তার পোলা আতাহার তরে ছাড়বো না। তর মা-বাপের ক্ষতি করবো, তর ক্ষতি করবো। কোন ভূত সোয়ার (সওয়ার) অইছিল তর মাথায়? এমুন কাম তুই ক্যান করলি?
নূরজাহানের কাঁপুনি তখন আরও বেড়েছে, কান্না আরও বেড়েছে। কাঁদছে সে পৃথি। বীর সবচেয়ে দুঃখী অসহায় মানুষের মতো। কান্নায় বিকৃত হয়েছে তার শ্যামলবরণ মিষ্টি মুখখানি। গলার স্বর গেছে পিছন থেকে কালজাত সাপে থাবা দিয়ে ধরবার পর অসহায়। ব্যাঙের গলার স্বর যেমন হয় তেমন হয়ে।
