.
নূরজাহানকে ছুটে আসতে দেখে মগ্নতা ভাঙল মরনির। নূরজাহানের মুখের দিকে তাকিয়ে নূরজাহানকে দেখতে পেল না সে। তার মনে পড়ল কতক্ষণ ধরে এইভাবে বসে আছে, বেলা কতটা হল। দুপুর হয়ে আসা রোদ বাড়ির আঙিনায়, ঘরের চালায় এবং গাছগাছড়ার ডালপালায় কী রং মেলে বসেছে, উত্তরে হাওয়া আছে কি নাই, এসব মনে পড়ল মরনির।
এখনই দুপুরের রান্না চড়ানো দরকার। এখন চড়ালেও শেষ হতে হতে মধ্যদুপুর। এমনকী দুপুর গড়িয়েও যেতে পারে। যদিও একজন মানুষের রান্না, কিন্তু রান্না তো! আয়োজন আছে তো! পোয়াখানেক চাউলের ভাত ঠিকই, কিন্তু চাউলটা তো মেপে তুলতে হবে! ভাল করে ধুয়ে হাঁড়িতে পরিমাণ মতো পানি দিয়ে চড়াতে হবে। তারপর আছে তরকারি। তরকারি ছাড়া ভাত লোকে খায় কেমন করে!
যদিও সকালবেলা উঠেই তরকারির ভাবনাটা আজ ভেবে রেখেছিল মরনি। সেচিশাক আর টাকিমাছ। বাড়ির নামার দিকে ছোট্ট একখান কোলা (টুকরো জমি) আছে। কোলার চারপাশে বেশ ঘন হয়ে সেচিশাক জন্মেছে। একমুঠ তুলে আনলেই হবে। তারপর সেই সেচিশাক সিদ্দ করে, কয়েক ফোঁটা সরিষার তেল আর এক-দুইখানা শুকনা মরিচের সঙ্গে কড়াইতে নিয়ে কাঠের হাতায় খানিক থেঁতলে নিলেই শাকটা হয়ে গেল। তারপর থাকে। মাছ। ঘরের কোণে, মুরগির ছা-টা থাকে যেখানে তার পাশে মাটির বড় একখানা ঘোপায় জিয়ানো আছে দুই-তিনটা টাকিমাছ। তার একটা কুটে, খাদায় করে ঘাটপারে ধুতে গিয়ে, ফিরার সময় বাড়ির নামার দিককার ঝকা থেকে কয়েকটা বাত্তি (পরিণত) আবাত্তি (অপরিণত) যাই হোক উসি (শিৗম) ছিঁড়ে এনে সেই উসৃসি দিয়ে চচ্চড়ি, তা হলে মাছও হয়ে গেল। ভাত আর শাক মাছ হলে হয়েই তো গেল রান্না!
রান্না শেষ হলে থাকে গোসল করা, খাওয়া। সেটা আর এমন কী কাজ!
রান্না শেষ করে শাড়ি গামছা একহাতে আরেক হাতে বহুকালের পুরানা, ভারী ধরনের পিতলের বদনা নিয়ে ঘাটপার যাবে মরনি। পাঁচ-সাত বদনা পানি তুলে মাথায় দেবে। শীতকাল বলে, পুকুরের পানি বেজায় ঠান্ডা বলে ওই পাঁচ-সাত বদনায়ই গোসল শেষ। তারপর পরনের শাড়ি বদলে, সেই শাড়ি ধুয়ে চিপড়ে, বাড়ি ফিরে উঠানে টাঙানো তারে মেলে দিবে। ভিজাচুলে জড়ানো থাকবে গা মাথা মোছার পর চিপড়ে নেওয়া গামছা। তারপর ঘরে এসে একা একা ভাত খাবে মরনি। দিনের বেশির ভাগ কাজের এই তো চেহারা।
নূরজাহানের মুখের দিকে তাকিয়ে সংসারকর্মের এই চেহারাটাও যেন দেখতে শুরু করেছিল মরনি। কেন কে জানে!
নূরজাহান তখন এমন ভঙ্গিতে হাঁপাচ্ছে যেন সে কোনও মানুষ না, যেন সে কোনও অবোলা জীব। যেন গৃহস্থের আথাল (গোয়াল) থেকে হঠাৎ করেই ছুটে যাওয়া কোনও দামড়ি (বকনা) বাছুর সে। হঠাৎ মুক্তি পাওয়ার আনন্দে যেন বিভোর ছিল। যখন চারপাশ থেকে জাপটে ধরার জন্য ছুটে এসেছে গিরস্ত বাড়ির পোলাপান, ভয় পেয়ে মাঠ পাথালে ছুটতে শুরু করেছে সে। ছুটতে ছুটতে একসময় যেন পড়েছে চতুর মানুষের কবজায়। ধরা পড়ার পর ক্লান্তিতে যেন বুক ফেটে যাচ্ছে তার। কামারবাড়ির উঠানের কোণে দিনভর পড়ে থাকা ব্যস্ত হাপরের মতো যেন বুক তার ওঠানামা করছে। অযথা যেন নূরজাহানের বুকের ভিতর বসে অদৃশ্য এক কামার অবিরাম টেনে যাচ্ছে তার হাপর।
সড়কপার থেকে হালদার বাড়ি, এই পথখানি ছুটে আসার কোন ফাঁকে যে এলোমেলো হয়েছে নূরজাহানের মাথার চুল, চোখের দৃষ্টি কোন ফাঁকে যে হয়েছে বিষাক্ত সাপ ছোবল দিয়ে ধরবার পর সাপের মুখে অর্ধেক শরীর ঢুকে যাওয়ার পর যেমন চোখ হয় মেঠোহঁদুর আর কোলাব্যাঙের, তেমন। নাকের তলায়, ঘাড়ে গলায় কখন যে তার জমেছে নদীতীরের বালুকণার মতো ঘামকণা, শীতের তেজালো রোদে বালুকণার মতোই ঝিলিক দিচ্ছে যা, নূরজাহান জানে না। পা দুইখানা ধুলায় ধূসর। ঠোঁট দুইখানা শুকনা, কালচে। যেন ঠোঁট আর ঠোঁট নাই নূরজাহানের, যেন ঠোঁট দুইখানা তার শুকনা গাবের বিচি।
নূরজাহানের মুখের দিকে তাকিয়ে নিজের সংসারকর্মের চেহারা দেখা শেষ করেই যেন। নূরজাহানের চেহারাটা দেখতে পেল মরনি। দেখে চমকে উঠল। নিজের অজান্তে কখন যে তক্তা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল, টের পেল না। আকুল গলায় বলল, কী হইছে রে? এমুন করতাছস ক্যা? কই থিকা আইলি?
যেন বহুকাল জনমনিষ্যিহীন কোনও প্রান্তরে নির্বাসিত থাকার পর মানুষের সমাজে ফিরে এসেছে নূরজাহান, যেন বহুকাল পর মানুষের শব্দ পাচ্ছে, এমন উতলা হয়ে মরনির দিকে তাকাল সে। তারপর থাবা দিয়ে মরনির একটা হাত ধরল। ঘরে লন। কইতাছি।
মরনি অবাক হল। ঘরে যামু ক্যা? এহেনে কইতে অসুবিধা কী?
এবার দুইহাতে মরনির হাতটা ধরল নূরজাহান। গায়ের সব শক্তি এক করে পাগলের মতো টানতে লাগল। অসুবিধা আছে। আপনে ঘরে লন। কইতাছি।
মরনি তবু নড়ল না। যেন তার বয়সও নূরজাহানের মতোই, যেন সেও হঠাৎ করে নূরজাহান হয়ে গেছে এমন জেদি গলায় বলল, না তুই আগে ক।
এবার নূরজাহান কেমন ভেঙে পড়ল। মরনির হাত ছেড়ে দিয়ে অসহায়, কাতর চোখে তার দিকে তাকাল। চোখ ভরে পানি এল। তখনও হাঁপাচ্ছিল। তবে ছলছল চোখ আর মুখময় অসহায়ত্বের ছায়ায় ঢাকা পড়ে গেছে হাঁপানো।
কান্নাকাতর গলায় নূরজাহান বলল, আমার খুব বিপদ।
বিপদ কথাটা শুনে বুকটা ধক করে উঠল মরনির। তীক্ষ্ণচোখে নূরজাহানের দিকে তাকিয়ে বলল, কীয়ের বিপদ? কী অইছে তর?
