মরনি তখন ভেবেছে এবার দলের সঙ্গে মিশে যাবে ছা-টা। দলের সঙ্গে কুঁড়া খাবে, দলের সঙ্গে খোয়াড়ে থাকবে। ড্যাকরি হয়ে ওঠার পর নিয়ম মতন ডিম দিবে।
কিন্তু মরনির ভাবনা উলটোপালটা করে দিল সে। কুঁড়ার খাদায় কিছুতেই মুখ দিল না, খোয়াড়ে কিছুতেই ঢুকল না।
সন্ধ্যার মুখে মুখে অন্যান্য মোরগ মুরগি যখন খোয়াড়মুখী হয়ে, আপন ইচ্ছায় খোয়াড়ে ঢোকে, কোনওটা কোনওটাকে তাড়া দিয়ে ঢোকাতে হয়, তখন সে চলে যায় বড়ঘরের সামনে। লাফ দিয়ে ওঠে ঘরের সামনের তক্তায়, সাবধানি ভঙ্গিতে অন্ধকার জমে ওঠা ঘরের ভিতর গলা বাড়িয়ে দেখে তারপর খোলা দরজা দিয়ে পায়ে পায়ে ঢুকে যায় ঘরে।
প্রথম দুই তিনদিন এই দেখে কীরকম এক অপত্যস্নেহ যেন নিজের অজান্তেই নিজের ভিতর জেগে উঠতে দেখল মরনি। ছা-টাকে আর খোঁয়াড়ে রাখার কথা ভাবল না। ঘরেই রাখল। সন্ধ্যার মুখে মুখে অন্যান্য মোরগ মুরগি খোয়াড়ে আটকে ঘরে এসে কুপি জ্বালে, জ্বালিয়ে দেখে পাটাতন ঘরের অন্ধকার কোণে নিজের জায়গায় বেশ গুছিয়ে বসে আছে সে। দেখে বুকের ভিতরটা যে কেমন করে ওঠে মরনির! বুকের শিশুটির মতন তার সঙ্গে আধো স্বরে কথা বলে। ওলে আমাল সোনালে, কুনসুম ঘরে আইছো তুমি? আমি দিহি তোমালে দেখলাম না!
ছা-টা কুনকুন করে মৃদু একটা শব্দ করে। আর মরনির মনে হয় সে যেন তার কথারই জবাব দিচ্ছে।
তারপর উঠানে ফেলে রাখা পলো ঘরে এনে পলোর ঘেরে তাকে আটকে রাখে মরনি। পলোর মুখে বসিয়ে দেয় ছোট্ট জলচৌকি। কী জানি কখন পাটাতনের কোন ভাঙাচোরা দিয়ে ঘরে এসে ঢুকবে আততায়ী বিড়াল। পলোর মুখ বন্ধ না করলে সেই মুখ দিয়ে ভিতরে ঢুকে পলোর ঘেরের ভিতর বসেই হয়তো নিঃশব্দে সাবাড় করবে ছা-টাকে। এক শত্রুর হাত থেকে বাঁচিয়ে আরেক শক্রর হাতে তুলে দেওয়া হবে অবোলা একটি প্রাণ।
এখনও কোনও কোনওদিন পলোটা ঘর থেকে বের করবার কথা মনেই থাকে না। মরনির। ভোরবেলা ছা-টাকে ছেড়ে দেওয়ার পর যেমন থাকে পলো তেমনই পড়ে থাকে। শুধু মুখ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় জলচৌকিটা। আর রাতভর যে দুই-চারবার বিষ্ঠা ত্যাগ করে ছা-টা, হাতের মুঠায় খড়নাড়ার পুঁটলি নিয়ে দুই-চার ঘষায় তা পরিষ্কার করে মরনি। সন্ধ্যাবেলা দেখা যায়, ঘরে ঢুকে নিজেই ছা-টা লাফিয়ে ওঠে পলোর মুখে। তারপর পলোর মুখ গলে লাফিয়ে নামে নীচে। জায়গা মতন গুছিয়ে বসে। মরনি শুধু জলচৌকি দিয়ে মুখটা আটকে দেয়। দুই-চারটা আদুরে কথা বলে।
এই কারণেই কিনা কে জানে, আশ্চর্য এক সম্পর্ক গড়ে উঠেছে দুটি প্রাণীর। একজন মা আর একজন যেন তার শিশু। বাড়ির অন্যান্য মোরগ মুরগির সঙ্গে না মিশে ছা-টা ঘুরে বেড়ায় মরনির পায়ে পায়ে। বাড়ির যেখানেই যাক মরনি সে আছে তার সঙ্গে। বাধুক কুকুর বিড়াল ছাগলছানার মতন।
এই যেমন এখনও মরনির পায়ের কাছে ঘুরঘুর করছে। মরনি তার দিকে তাকিয়েও দেখছে না।
কোনও কোনওদিন সকাল গড়িয়ে যাওয়ার পরও, দুপুর হয়ে আসা পর্যন্ত সংসারের দিকে ফিরে তাকাতে ইচ্ছা করে না মরনির। সকাল হওয়ার পর, ঘুম ভাঙার পর পলো তুলে ছা-টাকে ছেড়ে দেয় ঠিকই, ঘর থেকে বেরোয়, সকালবেলার জরুরি কাজগুলোও সারে কিন্তু কোনও কিছুতেই যেন প্রাণ থাকে না। একেবারেই নিষ্প্রাণ ভঙ্গিতে কাজগুলো করে যায়, তারপর উদাস হয়ে ঘরের সামনের তক্তায় বসে থাকে।
আজও তেমন করে বসে আছে।
এই বাড়িতে যে আরেকজন মানুষ থাকে, পুরুষমানুষ, তার কথা যেন মনেই থাকে না। মরনির। মানুষটা দূরের কেউ না, কাছেরই। তার বড়বোনের জামাই, মজনুর বাপ। মরনি নিজেই তাকে বাড়িতে জায়গা দিয়েছে। সড়কে মাটি কাটার কাজ করতে এসেছিল, এসে একখান গোড়ার আশায় আসছিল মরনির কাছে। সেই ফাঁকে বলেছিল নিজের দুর্দশার কথা। শুনে মায়া মমতায় বুক ভেসে গিয়েছিল মরনির। গোড়া তো দিয়েই ছিল, সব ভুলে বাড়িতে থাকার জায়গাও দিয়েছে।
সেই মানুষের নাম আদিলউদ্দিন। কামারগাঁওয়ের সচ্ছল গিরস্ত, কপালের ফেরে (চক্রে) আজ মাটিয়াল। বাড়ির দক্ষিণের ভিটির দোচালা ঘরখানায় থাকে। মাটির ওপর খড়নাড়া, তার ওপর একখান ছোঁড়াখোঁড়া মোটা কাঁথা ফেলে আরেকখান গায়ে দিয়ে রাত কাটায় সে। রাতের অন্ধকারে কখন এসে ওই ঘরে ঢোকে, ভোরের আলো ফুটে ওঠার আগে কখন বেরিয়ে যায় টের পায় না মরনি। কোথায় খায়, কোথায় গোসল করে কিছু জানে না। এত কাছে থেকেও যেন বা ইচ্ছা করেই মরনির চোখের আড়ালে থাকতে চাইছে আদিলউদ্দিন। যেন বা একদার গৃহস্থ মুখ মাটিয়াল হওয়ার লজ্জায় এতটাই ম্লান হয়েছে, এই মুখ মরনিকে সে দেখাতে চায় না।
আজ ঘরের সামনের তক্তায় বসে মরনি কি সেই মানুষটার কথা ভাবছিল? নাকি ভাবছিল তার ফেলে আসা জীবনের কথা, তার নিজের মানুষটার কথা। নাম ছিল নুরু হালদার। নাকি পেটের না হয়েও যে পেটের ছেলে, নাড়িছেঁড়া ধন না হয়েও যে জড়িয়ে আছে পেটের ভিতরকার সব নাড়ি, শরীরের পরতে পরতে লেগে আছে যে, হৃদয় মন, জীবন মরণ, স্বপ্ন বাস্তব মাখামাখি করে আছে যে, সেই মজনুর কথা ভাবছিল মরনি?
তখনই পাগলের মতন ছুটতে ছুটতে হালদার বাড়িতে এসে উঠল নূরজাহান। কখন, কোন ফাঁকে যে মজনুদের সীমানায় এল, টের পেল না।
