অফিসারের কথার সঙ্গে তাল মিলিয়ে মোতালেব বেশ উৎসাহের গলায় বলল, পুলিশ সাহেব ঠিক কথাঐ কইছে। লন, ধইরা লইয়াহি শালার পো শালারে।
মান্নান মাওলানা ক্রুদ্ধ গলায় বললেন, অরে ধইরা লাব কী? অরে মাইরা লাব কী?
হাবিলদার বলল, কিন্তু অতটুকু মেয়েকে তো ধরা সম্ভব না, মারা সম্ভব না।
ক্যা?
আইনের প্যাঁচ আছে। আপনি বুঝবেন না।
সামান্য সময় কিছু ভাবলেন মান্নান মাওলানা। তারপর শান্ত গলায় বললেন, তাইলে বাদ দেন।
মোতালেব কিছু একটা বলতে চাইল তার আগেই আতাহার বলল, বাদ দিব ক্যা? এমুন একখান কাম করছে ছেমড়ি……
আতাহারের কথা শেষ হওয়ার আগেই হাত তুলে তাকে থামালেন মান্নান মাওলানা। শীতল চোখে ছেলের দিকে তাকিয়ে বুক হিম করা গলায় বললেন, কী করছে না করছে হেইডা পাওয়া যাইবোনে। অহন এই হগল লইয়া চিন্তা করনের কাম নাই। টাইম আছে।
হাবিলদারের দিকে তাকালেন তিনি। গলার স্বর একেবারেই বদলে, হাসিহাসি মুখ করে বললেন, নাদান মাইয়া। কিছু না বুইজ্জা কামডা করছে। আল্লায় কইছে নাদানরে মাপ কইরা দিয়ো। অরা অবুজ। আমি আল্লাপাকের খাসবান্দা। এর লেইগা আমি অরে মাপ কইরা দিলাম। আপনেরা অহন আপনেগো কাম করেন। গোরুচোররে লইয়া যান। মেদিনমণ্ডল গেরামে চোর হ্যাঁচ্চরের জাগা নাই।
মান্নান মাওলানার শেষ কথায় মাকুন্দা কাশেমের কথা মনে পড়ল সবার। এতক্ষণ যেন সবাই তার কথা ভুলে ছিল। সবাই তারপর একসঙ্গেই যেন সড়কের মাটিতে লেছড়ে পেছড়ে বসে থাকা কাশেমের দিকে তাকাল।
কাশেম তখন মরণদশায় আচ্ছন্ন ঘেয়ো কুকুরের মতন ঝিম মেরে আছে। দুনিয়ার কোথায় কী ঘটছে কিছুই যেন টের পাচ্ছে না।
.
দাঁড়কাকের মুখ থেকে ছিনিয়ে রাখা মুরগির ছা-টা বেশ গা ঝাড়া দিয়ে উঠেছে। বুকের ক্ষত একেবারেই মিলিয়ে গেছে। ক্ষতের জায়গায় সাদা কালোয় মিশানো ফুরফুরে সুন্দর ফইর (পালক) গজিয়েছে। দেখতে বেশ লাগে। বাড়ির অন্যান্য মোরগ মুরগির তুলনায় সে খুবই অন্যরকম। অন্যগুলোর সঙ্গে খুবই অমিল। সাধারণ মোরগ মুরগির তুলনায় একটু বেশি পরিপাটি, একটু বেশি ছিমছাম। একটু যেন বেশি লম্বা। ঠোঁট দুইখান একটু বেশি লাল, পা দুইখান একটু বেশি ফরসা। লেজের গঠনটাও অন্যরকম। হঠাৎ করে তাকালে মুরগি মনে হয় না। মনে হয় অচেনা এক পাখি। দূর কোনও বনভূমি থেকে আচমকাই যেন এসে নেমেছে গৃহস্থ বাড়ির নির্জন আঙিনায়।
দেখতে যেমন অন্যরকম স্বভাব চরিত্রও তেমন অন্যরকম ছা-টার। মোরগ না সে, মুরগি, তবু এই বয়সেই বেশ ডাকাবুকা। নিজের বয়সিগুলোকে তো নয়ই, বাড়ির ধাড়িগুলোকে পর্যন্ত তোয়াক্কা করে না, পাত্তা দেয় না। বেশ মেজাজি, বেশ রাশভারী ভঙ্গিতে চলাফেরা করে। অন্যান্য মোরগ মুরগির সঙ্গে বিন্দুমাত্র বনিবনা নাই। কারও দিকেই ফিরে তাকায় না সে, কাউকেই পছন্দ করে না। একা, নিজের মেজাজ মর্জিমতো চরে বেড়ায়। একাকী আধার খায়। অন্যান্য মোরগ মুরগিগুলো তাকে বেশ সমীহ করে।
ভোরবেলা আগেরদিন রাখা ফ্যানের সঙ্গে কুঁড়া মিশিয়ে খাদা ভরতি করে মোরগ মুরগিদের খেতে দেয় মরনি। গোলা ছাতুর মতো থকথকে সেই খাবার দেখেই ঝাঁপিয়ে। পড়ে মোরগ মুরগিগুলো। অনেকক্ষণ ধরে খেয়ে গলা পেট ফুলিয়ে ফেলে। খাবারটা যেন খুবই পছন্দ তাদের। রাতভর যেন এই খাবারের অপেক্ষায়ই থাকে। কখন সকাল হবে, কখন ফ্যানে গোলা কুঁড়া খাবে তারা।
আশ্চর্য ব্যাপার, সেই ছা-টা কুঁড়া মুখে দেয় না। তাকে দিতে হয় চাউল খুদ আর নয়তো ধান কাউন। কুঁড়ার খাদার অদূরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দিতে হয়। সে বেশ রাজকীয় ভঙ্গিতে একাকী খুঁটে খুঁটে খায়। অন্যান্যদের কেউ যদি কুঁড়ার খাদা ফেলে ভুল করে তার খাবারে ভাগ বসাতে আসে, যদি ঠোঁটে তুলে নেয় একটি দানা, বড় ছোট যেই হোক, তার আর রক্ষা নাই। সঙ্গে সঙ্গে তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে। ঠোকরে ঠোকরে আর জোড় পায়ের লাথিতে লাথিতে নাস্তানাবুদ করে দেবে তার খাবারে ভাগ বসাতে আসা শত্রুকে।
দিনে দিনে তার এই স্বভাবের কথা জেনে গেছে বাড়ির অন্য মোরগ মুরগিগুলো। ফলে তারা ভয়ে তার ছায়া মাড়ায় না। তারা সব এক হয়ে চরে বেড়ায়। সে চরে তার মতন, একা।
অন্যান্যদের সঙ্গে খোয়াড়েও থাকে না সে। থাকে বড়ঘরে। মরনির সঙ্গে। মরনি চৌকিতে আর সে পাটাতনের এককোণে, পলোর ঘেরে।
প্রথমদিন মরোমরো অবস্থা দেখে ছা-টাকে মরনি খোঁয়াড়ে রাখেনি। এমনিতেই নড়াচড়ার শক্তি নাই, একপাল মোরগ মুরগির সঙ্গে খোঁয়াড়ে রাখলে জান যেটুকুই বা আছে, ড্যাকরাগুলোর পায়ের চাপে সেটুকুও থাকবে না ভেবে তাকে মরনি ঘরে এনে রেখেছিল। অতিযত্নে পাটাতন ঘরের এককোণে বসিয়ে পলো দিয়ে আটকে রেখেছিল। যদিও হাঁটাচলার শক্তি ছিল না তবু পলো দিয়ে আটকে রেখেছিল মরনি। যেন বা নিজের অজান্তেই রেখেছিল।
পরদিন সকালে দেখা গেল দশা একটু ভালর দিকে। ঠিকঠাক মতন দাঁড়াতে পারে না ঠিকই, তবে দাঁড়াবার চেষ্টা করছে। বুকের ক্ষতে হলুদ চুন বেশ চেপে বসেছে। শুকিয়ে খুঁটে লাগবার দশা।
মরনির মন ভাল হয়ে গিয়েছিল। দুইহাতে কোলের কাছে ধরে, অথর্ব পোলাপানকে যেমন করে ঘর থেকে বাইরে আনেন মা, ঠিক সেই কায়দায় বাইরে এনে রান্নাচালার সামনে আবার আটকে দিয়েছিল পলোর ঘেরে। মুখের সামনে ছড়িয়ে দিয়েছিল একমুঠ ভাতের চাউল। কোনওরকমে খুঁটে খুঁটে তাই খেয়েছিল ছা-টা। এইভাবে কয়েকদিনের চেষ্টায়, মরনির সেবাযত্নে প্রাণ ফিরে পেল সে। গা ঝাড়া দিল, উঠে দাঁড়াল।
