এখন চোখের পলকে উধাও হয়েছে সব।
এই এতক্ষণ প্রকৃতি ছিল প্রকৃতির মতন উদাস, নির্বিকার। এখন নূরজাহানের মনে হয় প্রকৃতি আর উদাস, নির্বিকার নাই। প্রকৃতির শিরায় শিরায় বহতা রক্তস্রোত যেন জটিল এক পানির স্রোতে রূপান্তরিত হয়েছে। হিমশীতল সেই স্রোত যেন গভীর পানির তলায় ডুবিয়ে দিচ্ছে প্রকৃতিকে। শীতের বেলা তেজালো হচ্ছিল, তীক্ষ্ণরোদ উষ্ণ করে তুলছিল দেশগ্রাম। কিন্তু নূরজাহানের মনে হয় বেলা অবেলা বলে কিছুই যেন নাই, রোদ বুঝি উঠেইনি। উষ্ণতা বলেও কিছু যেন নাই কোথাও। চারদিক পানিরতলার কাদার মতন থিকথিকে, হিম।
স্বচ্ছ আকাশ ছুঁয়ে দূর নদীচরের দিকে উড়ে যাচ্ছিল যেসব ভিনদেশি পাখি, নূরজাহানের মনে হয়, ডানা যেন অবশ হয়েছে তাদের। ওড়ার শক্তি হারিয়ে আকাশেই যেন স্থির হয়েছে তারা। পথপাশের হিজল ছায়ায় বসে একাকী ডাকছিল যে ডাহুকি, এইমাত্র যেন তার ঢের (স্বরনালি) কামড়ে ধরেছে চতুর এক পাতিশিয়াল। আর বহুদূরের অচিনলোক থেকে আসছিল যে উত্তরের হাওয়া, হু হু করে বইছিল, আচমকাই যেন বন্ধ হয়েছে তার চলাচল। দুনিয়ার কোথাও যেন এখন কোনও হাওয়া নাই, দুনিয়ার সবখানেই যেন এখন এক শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা।
হাওয়াহীন দুনিয়াতে কেমন করে বাঁচে মানুষ! শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থায় কেমন করে বাঁচে! হাওয়ার আশায়, বাঁচার আশায় নূরজাহান তারপর শস্যের চকমাঠ ভেঙে ছুটতে থাকে। মাকুন্দা কাশেমের কথা শুনে যেমন করে ছুটে আসছিল ঠিক তেমন করেই ছুটে যায়। পিছনে স্তব্ধ হয়ে থাকে সারা গ্রামের মানুষ, থানার পুলিশ আর কুকুরের মতন মার খাওয়া মাকুন্দা কাশেম।
.
ছোঁকরিটা কে?
স্তব্ধ হয়ে থাকা মান্নান মাওলানা বুঝতেই পারলেন না প্রশ্নটা কে করেছে। তবে এই প্রথম মাথাটা নড়ল তার। ফ্যালফ্যাল করে এর ওর মুখের দিকে তাকাতে লাগলেন। দুই ঠোঁটের ঠিক মাঝখানে তখনও লেগে আছে নূরজাহানের ছিটিয়ে দেয়া থুতু।
একজন কথা বলেছে দেখে সবারই যেন স্তব্ধতা ভেঙেছে। মোতালেব ছিল মান্নান মাওলানার কাছাকাছি। আরও কাছে এগিয়ে সে খুবই সহানুভূতির গলায় বলল, মোকে অহনতির ছ্যাপ (থুতু) লাইগ্যা রইছে হুজুর। আমার কাছে নুমাইল (রুমাল) আছে। ধোয়া নুমাইল। কাইলঐ আপনেগো বউ সাপান দিয়া ধুইয়া দিছে। দিমু আপনেরে? মোকখান পোছেন।
এবার ঘটনাটা যেন মনে পড়ল মান্নান মাওলানার। সঙ্গে সঙ্গে চঞ্চল হয়ে উঠলেন তিনি, ছটফট করে উঠলেন। যেন পায়ের কাইয়া লোউঙে (কড়ে আঙুলে) আচমকা কামড় দিয়েছে বিষাক্ত চ্যালা। কিন্তু কথা বললেন না তিনি। ডানহাতের চেটোয় ঠোঁটে লেগে থাকা থুতু দুই-তিন ঘষায় মুছলেন।
আতাহার ছিল দলের পিছন দিকে। তার সঙ্গে আলী আমজাদ, সুরুজ আলমগীর নিখিল। যেন ভারী আমোদ আহ্লাদের কাণ্ড হচ্ছে গ্রামে এমন ভঙ্গিতে ইয়ার দোস্তদের সঙ্গে চাপা গলায় ঠাট্টা মশকরা করতে করতে, আলী আমজাদের টানতে থাকা সিগ্রেট তার হাত থেকে নিয়ে গোপনে টানছিল সে, গোপনে ধোয়া ছাড়ছিল। আতাহার জানে মান্নান মাওলানা জানেন তার ছেলে সিগ্রেট তো বেদম খায়ই, মদও খায়। তবু অত লোকের মধ্যে তার সিগ্রেট খাওয়াটা বাবার চোখে যাতে না পড়ে সেই চেষ্টা আতাহার প্রাণপণে করছিল। কাণ্ডটা ঘটে যাওয়ার পর অন্য সবার মতন আতাহারও এতক্ষণ স্তব্ধ হয়ে ছিল। এখন লোকজনের কথা শুনে, বিশেষ করে মোতালেবের কথায় সিগ্রেট খাওয়ার কথা ভুলে, ইয়ার দোস্তদের ফেলে বাবার কাছে এগিয়ে এল। যেন হঠাৎ করেই বাবার বাবা হয়ে গেছে এমন। স্বরে বলল, পুকরে গিয়া মোক ধুইয়াহেন বাবা। তাড়াতাড়ি যান।
সড়কপারে জাহিদ খাঁ-র ছোট্ট পুকুর। আতাহারের কথা শুনে মনমরা ভঙ্গিতে সেই পুকুরের দিকে নেমে গেলেন মান্নান মাওলানা। আঁজলা ভরা পানিতে তিন-চারবার মুখ বেশ ভাল করে ধুলেন। তারপর পাঞ্জাবির খুঁটে মুখ মুছতে মুছতে আগের জায়গায় ফিরে এলেন। তখুনি তাঁর পাশে পাশে চলা পুলিশের হাবিলদার হাতের সিগ্রেটে শেষটান দিয়ে বলল, কথার উত্তর দিলেন না যে?
তারপর সিগ্রেট পায়ের কাছে ফেলে বুট দিয়ে চেপে দিল।
মান্নান মাওলানার যেন কিছুই মনে নাই এমন গলায় বললেন, কোন কথার?
জিজ্ঞেস করলাম না ছোঁকরিটা কে?
এবার যেন সবকিছুই মনে পড়ল মান্নান মাওলানার। সামান্য লজ্জিত হলেন তিনি। কথাডা তাইলে আপনে জিগাইছেন?
তবে কে?
আমি বোজতে পারি নাই।
হাবিলদার ঠাট্টার গলায় বলল, এখন পারছেন তো?
হাবিলদারের ঠাট্টা গায়ে মাখলেন না মান্নান মাওলানা। সরল গলায় বললেন, জি হ, পারতাছি।
তা হলে বলেন।
ছেমড়ির নাম নূরজাহান।
নূরজাহান? বা বা, একেবারে মোগল সম্রাজ্ঞী!
তার পরই ঠাট্টার সুর বদলাল সে। পুলিশি গলায় বলল, বাপের নাম কী? থাকে কোথায়?
আমগো গেরামেরঐ মাইয়া। বাপের নাম দবির, দবির গাছি।
চলুন ধরে নিয়াসি।
কথাটা যেন বুঝতে পারলেন না মান্নান মাওলানা। অবাক গলায় বললেন, ক্যা?
মান্নান মাওলানার কথা শুনে তার চেয়েও বেশি অবাক হল হাবিলদার। আপনি বুঝতে পারছেন না, কেন? ওর মেয়ে একটি চোরের জন্য গ্রামের সব লোকের সামনে আপনার মুখে থুথু ছিটিয়ে দিয়েছে। অতিবড় অপমান করেছে আপনাকে। বাপটাকে বেঁধে নিয়েসে, ভাল করে প্যাদানি দিলে মেয়েটা সোজা হয়ে যাবে।
