নূরজাহানকে এভাবে সামনে এসে দাঁড়াতে দেখে নিজেদের অজান্তেই যেন দাঁড়িয়ে গেছে সবাই। কাশেমও থেমেছে, থেমে অচেনা মুখ তুলে নূরজাহানের দিকে তাকিয়েছে। সেই মুখের দিকে তাকিয়ে নূরজাহান আবার বলল, কী অইছে?
অনেকক্ষণ ধরে কাঁদছিল না মাকুন্দা কাশেম। ধরা পড়ার পর থেকে, মার শুরু হওয়ার পর থেকে কাঁদতে কাঁদতে কখন যে চোখের পানি শেষ করে ফেলেছে উদিস পায়নি। এখন নূরজাহানের কথা শুনে কোথা থেকে, কেমন করে যেন পানি এল চোখে। চোখের কোণ ভরে গেল। ভাঙাচোরা কাতর গলায় কাশেম বলল, আতাহার দাদারে কইলাম, গেরামের বেবাক মাইনষেরে কইলাম, কেঐ বিশ্বাস করলো না মা, কেঐ আমার কথা বিশ্বাস করলো না। কত পায় হাতে ধরলাম, কত কানলাম, কেঐ বিশ্বাস করলো না।
কাশেম শব্দ করে কেঁদে ফেলল। কাঁদতে কাঁদতে বলল, এই গেরাম ছাইড়া আমি কোনওদিন যাইতে চাই নাই। এই গেরোমে আমার কেঐ নাই, খালি গেরামডা আছিলো আমার। গেরামের গাছগাছলা, বাড়িঘর, ক্ষেতখোলা, তোমগো লাহান কয়েকজন মানুষ আর ঐ গরুডি, এই হগল লইয়া এই গেরামে জীবনভর পইড়া থাকতে চাইছি আমি। অইলো না, এই গেরামে, তোমগো কাছে থাকন আমার অইলো না। গরুডির কাছে থাকন অইলো না। আইজ এই গেরাম ছাইড়া আমার যাইতে অইতাছে। তাও চোর অইয়া। মা, মাগো আমি কোনও দোষ করি নাই মা। কের লগে কোনওদিন খারাপ ব্যভার করি নাই, গাইল দেই নাই কেরে, মিছাকথা কই নাই। তাও আমার কপাল এমুন অইলো!
গভীর কষ্টের কান্নায় রুদ্ধ হয়ে এল কাশেমের গলা। মাথা নিচু করে চোখের পানি সামলাতে লাগল সে। ভেঙে ঝুলে পড়া ডানহাত অতিকষ্টে তুলে চোখ মুছতে চাইল। পারল না। তার আগেই দড়ি ধরা পুলিশকে মান্নান মাওলানা বললেন, যান আউগগান। কী হোনেন অর কথা! চোরে তো কত কথাই কয়!
মাকুন্দা কাশেমের কথা শুনে বুক তোলপাড় করছিল নূরজাহানের। চোখ ভরে আসছিল পানিতে। মান্নান মাওলানার কথা শুনে সেই ভাব কেটে গেল। বুকের ভিতর ফুঁসে উঠল তীব্র ঘৃণা। ইচ্ছা হল একহাতে মুঠ করে ধরে মান্নান মাওলানার দাঁড়ি, অন্যহাতে সর্বশক্তি দিয়ে একটার পর একটা থাবড় মারে তার দুইগালে। মেরে গাল মুখ ফাটিয়ে ফেলে। দাঁতে দাঁত চেপে বলে, তুই তো মানুষ না। তুই অইলি শুয়োরের বাচ্চা। তুই অইলি কুত্তার বাচ্চা।
নূরজাহান তা করল না। ফণা তোলা জাতসাপের মতো একদৃষ্টে খানিক তাকিয়ে রইল মান্নান মাওলানার মুখের দিকে, তারপর কোনও কিছু না ভেবে মাকুন্দা কাশেমের মাথার উপর দিয়ে থু করে একদলা থুতু ছিটিয়ে দিল মান্নান মাওলানার মুখ বরাবর। থুতু গিয়ে লাগল মান্নান মাওলানার দুই ঠোঁটের ঠিক মাঝখানে। এমন আচমকা ঘটল ঘটনা, মান্নান মাওলানা স্তব্ধ হয়ে গেলেন। ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইলেন নূরজাহানের মুখের দিকে।
মাকুন্দা কাশেমের পিছনে দাঁড়ানো শয়ে শয়ে লোকও তখন মাওলানা সাহেবের মতন স্তব্ধ হয়ে আছে। স্তব্ধ হয়েছে দারোগা পুলিশরা, স্তব্ধ হয়েছে বেদম মার খাওয়া মাকুন্দা কাশেম। চোখে পলক ফেলতে ভুলে গেছে সবলোক, নড়তে ভুলে গেছে, শ্বাস ফেলতে ভুলে গেছে। যেন সাত আসমান ভেঙে মাথায় পড়ছে তাদের, যেন আশ্চর্য এক জাদুমন্ত্রে মাটির মতো মৌন হয়েছে তারা।
তখন প্রকৃতি ছিল প্রকৃতির মতন উদাস, নির্বিকার। শীতের বেলা তেজাল হচ্ছিল। তীক্ষ্ণরোদ উষ্ণ করে তুলছিল দেশ গ্রাম। স্বচ্ছ আকাশ ছুঁয়ে দূর নদীচরের দিকে উড়ে যাচ্ছিল ভিনদেশী পাখি। পথপাশের হিজল ছায়ায় বসে একাকী ডাকছিল এক ডাহুকী। আর বহুদূরের কোন অচিনলোক থেকে আসা উত্তরের হাওয়া বইছিল হু হু করে।
.
প্রথম পর্ব সমাপ্ত
২.১ শীতকালের ফিঙেপাখি
দ্বিতীয় পর্ব
শীতকালের ফিঙেপাখি কেমন করে ওড়ে!
নদীর ঢেউয়ের মতন! একবার আকাশের দিকে ওঠে, একবার নামে শস্যমাঠের দিকে। ওড়ার তালে ডানা কাঁপে তার, লেজ নাচে। কখনও কখনও মৃদুস্বরে ডাকে পাখি।
আজও মাঠ পাথালে উড়ছে এক ফিঙে। সেই পাখির ডানা থেকে সড়কপারে ছিটকে আসে একটুখানি ছায়া, নূরজাহানের চোখের তারায় এসে লাগে। তারপর যেন নিজেকে চিনতে পারে নূরজাহান, তারপর যেন নিজের মধ্যে ফিরে আসে।
ছোবল মারার আগে ভয়ংকর কালজাত (কালো গোখরো) যেমন করে ফণা তোলে, যেমন করে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে শিকারের দিকে, মান্নান মাওলানার মুখের দিকে তেমন করে তাকিয়ে থেকে, ওই ঘৃণিত মুখ দেখতে দেখতে যেন বা আশ্চর্য এক ঘোর লেগে গিয়েছিল নূরজাহানের চোখে। যেন বা নিজের অজান্তেই থুতুটা সে ছিটিয়ে দিয়েছিল। যার জন্য এই ঘৃণা ক্রোধ, সেই মানুষটার কথাও মনে ছিল না। মাকুন্দা কাশেম।
মানুষজন স্তব্ধ হয়ে যাওয়ার পর ঘোর কেটে যায় নূরজাহানের। বুকের ভিতর ফুঁসে ওঠা। কালজাত বুকের ভিতরই মুখ লুকায়। শরীর হিম হয়ে আসে।
খানিক আগে, এই শীতসকালেও নূরজাহানের শরীর জুড়ে ছিল চুলার ভিতরকার নাড়ার তলায় লুকিয়ে থাকা আগুনের মতন ধিকিধিকি উষ্ণতা। ধাউন্না মরিচ (ধেনোমরিচ) চিবিয়ে খেলে কান মুখ যেমন ঝাঁ ঝাঁ করে, তেমন ঝাঁ ঝাঁ করছিল কান মুখ। দুরন্ত বেদের ফাঁদে আটকা পড়া পানকৌড়ি যেমন হাঁসফাঁস করে, বুক জুড়ে নূরজাহানের ছিল তেমন হাঁসফাসানি। হাত পায়ের তলা ছিল তার ওমে বসা মুরগির পেটের মতন। গরম পানি ঢেলে দেওয়ার পর গর্ত থেকে যেমন করে বেরিয়ে আসে বিষাক্ত কালজাত, মাথার তালু ফুটা করে তেমন করে তার বেরুতে চেয়েছিল মগজের কোষে আটকা পড়া ভয়াবহ এক উষ্ণতা। পাখির ডিমের মতন ফেটে যেতে চাইছিল দুইচোখ। নদীর চোরাস্রোতের মতন শিরায় শিরায় বইছিল যে রক্তস্রোত, আশ্চর্য কোন এক মন্ত্রবলে যেন রুদ্ধ হয়েছিল সেই স্রোতধারা।
