এবার হঠাৎ একটা দৌড় দিল নূরজাহান। ছনুবুড়ির মৃত্যুর কথা শুনে যেমন দৌড় দিয়েছিল ঠিক তেমন করে দৌড়ে চকে নেমে গেল। পিছন থেকে চিৎকার করে হামিদা তাকে ডাকল। নূরজাহান শুনল না, নূরজাহান ফিরে তাকাল না।
দবির বলল, যাউক, ডাইক্কো না। কাইশ্যারে শেষ দেহা দেইক্কাহুক।
মুখ ঘুরিয়ে স্বামীর দিকে তাকাল হামিদা। এইডা কেমুন কথা কইলা! শেষ দেহা দেখবো ক্যা? মাকুন্দা কি মইরা গেছেনি! জেলে গেলে মানুষ মইরা যায় না, ফিরা আহে।
দবির আবার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। কাইশ্যা আইবো না। কেমতে আইবো কও! মানুষ জেলে গেলে চেষ্টা তদবির কইরা, টেকা পয়সা খরচা কইরা তারে ছাড়াইয়া আনতে অয়। কাইশ্যার লেইগা চেষ্টা করবো কে! টেকা পয়সা খরচা করবো কে! আছে কেডা অর!
হামিদা কথা বলল না। চিন্তিত চোখে স্বামীর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
বাঁশঝাড়ের মাথায় রোদ ঝলমল নীল আসমান। সেই আসমানের দিকে তাকিয়ে উদাস গলায় দবির বলল, কাইশ্যা আর কোনওদিন ফিরত আইবো না। কাইশ্যার লগে আমগো আর কোনওদিনও দেহা অইবো না। দিনে দিনে দিন যাইবো। পয়লা পয়লা দুই চাইরদিন কাইশ্যার প্যাচাইল পাড়বো দেশ গেরামের মাইনষে। তারবাদে ভুইল্লা যাইবো। কে কারে কয়দিন মনে রাখে, কও! ছনুবুজির কথা কেডা মনে রাখছে। কাইশ্যার কথাও কেঐ মনে রাখবো না। এই গেরামে যে কাশেম নামে একজন মানুষ আছিলো, মাইনষে যে তারে কইতো মাকুন্দা কাশেম, এই কথা কেঐ মনে রাখবো না। কোনও কিছুই বেশিদিন মনে রাখে না মাইনষে। মা বাপ মইরা গেলে দুই চাইরদিন বাদে ভুইল্লা যায়, কইলজার টুকরার লাহান পোলাপান মইরা গেলে ভুইল্লা যায়। জামাই মইরা গেলে বউয়ে ভুইল্লা যায় তার কথা। বউ মইরা গেলে তার কথা ভুইল্লা জামাই আবার বিয়া করে। কেঐ কাঐরে মনে রাখে না। মানুষ এই রকমঐ।
.
১.৬৫
হাঁটতে না পারা আতুর লুলা মানুষ যেমন করে পথ চলে, সড়কের মাটিতে তেমন করে ছেড়ে ছেছড়ে আগাচ্ছে মাকুন্দা কাশেম। তার মুখ আর মানুষের মুখ নাই, শরীর আর মানুষের শরীর নাই। মাথার কত জায়গায় ফেটেছে, কত জায়গা ফেটে যে রক্ত বের হয়েছে কে জানে। গোসল করবার পরও কোন কোনও সৌখিন গিরস্ত যেমন করে তেল দেয় মাথায়, মাথার চুলে সর্বক্ষণ যেমন থাকে তাদের ভিজা ভিজা ভাব, মাকুন্দা কাশেমের মাথা তেমন করে ডিজে আছে রক্তে। কোথাও কোথাও রক্ত শুকিয়ে জট বেঁধেছে চুল। ডানদিককার জুলপির পাশ দিয়ে কখন নেমেছিল কাইয়া লউঙের (কড়ে আঙুল) মতন মোটা একখান রক্তের ধারা, কখন শুকিয়ে কালে চটচটে হয়েছে সেই রক্ত, কাশেম নিজেও তা জানে না। কপালের তিনচার জায়গা গানের মুচির মতন ফুলে আছে। বাইল্লামাছের মতন সাদা গাল থুতনি কালচে, থেতলানো। ছাল চামড়া উঠে থকথক করতাছে সারামুখ। দুইচোখের কোলও গাল থুতনির মতনই। থেতলে ফুলে চোখ দুইটা প্রায় ঢেকে দিয়েছে। বাঁ দিককার কান ছিঁড়ে ঝুলে পড়েছে। নাকের ডগা ভেঙে মিশে গেছে ওপরের ঠোঁটের লগে। নিচের ঠোঁট যে গরুর খুরে থেতলে যাওয়া টুকটুকি (টিকটিকি)। মুখের ভিতর, সামনের মারির এ দাঁতটাও নাই। কদুবিচির মতন কখন খসে পড়েছে সব। জিভবান হয়েছে ফালা ফালা। কদিন আগে কিনা নতুন পিরন লুঙ্গি ছিঁড়ে ফেঁসে একাকার। পিরনের বুকের কাছে একটাও বুতাম নাই। একটা হাতা কোথায় উড়ে গেছে। লুঙ্গি আর লুঙ্গি নাই। ত্যানার টুকরার মতন ঝুলে আছে মাজায়। তবে লুঙ্গির গিট শক্ত করে দেওয়া। এত মারের পরও গিটটা কেন যে খোলেনি!
লুঙ্গি পিরনের ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে কাশেমের শরীর, কালসিটে, রক্তাক্ত, থকথকে। লাঠির বাড়িতে গুড়া হয়েছে দুইহাতের কনই, দুইপায়ের হাঁটু গুড়গুড়া। হাত পায়ের চার পাঁচখান চারি উধাও হয়ে গেছে।
এমন মারও মানুষ মানুষকে মারে! এত মার খেয়েও বেঁচে থাকে মানুষ। কেমন করে বেঁচে আছে মাকুন্দা কাশেম!
কাশেমের দুইপাশে দুইজন পুলিশ। মাজায় প্যাঁচিয়ে যে দড়ি দিয়ে বাঁধা হয়েছে তাকে সেই দড়ির মাথা ধরে রেখেছে একজন পুলিশ। বিরক্তিতে মুখ হেঁয়ে আছে পুলিশটির। তাদের লগে তাল মিলিয়ে চলতে পারছে না বলে কাশেমের ওপর বেদম রেগেছে সে। প্রায়ই বুট পরা পা তুলে লাথথি মারছে। যা তা ভাষায় গালিগালাজ করতাছে। এই সব তুচ্ছ গালিগালাজ আর সামান্য মার এখন গায়ে লাগছে না কাশেমের। সে তার মতো আগাচ্ছে।
পুলিশ দারোগার ভয়ে কাশেমের সামনে কোনও লোক নাই, পিছনে ভেঙে পড়েছে সারা গ্রামের লোক। মান্নান মাওলানা আছেন কাশেমের একবারে পিঠের কাছে, ঘাড়ের ওপর। যেন ঘাড় পিঠ ঠেলে ঠেলে তিনিই মাকুন্দা কাশেমকে বের করে দিচ্ছেন গ্রাম থেকে।
মান্নান মাওলানার পাশে আছে আরেকজন পুলিশ। বোধহয় অন্য দুইজনের তুলনায় সে একটু বড়। দারোগা। হাসিমুখে তোয়াজের স্বরে তার লগে কথা বলছেন মান্নান মাওলানা। দারোগা সাহেব ফুক ফুক করে সিগ্রেট টানছেন আর মান্নান মাওলানার কথা শুনে মাথা দোলাচ্ছেন।
নূরজাহান এসবের কিছুই দেখল না, কিছুই খেয়াল করল না। পাগলের মতন ছুটতে ছুটতে কাশেমের একেবারের সামনে এসে দাঁড়াল। দারোগা পুলিশের ভয়ে যে কাশেমের আগে আগে কেউ হাঁটছে না, সবাই হাঁটছে পিছন পিছন, নূরজাহান তাও খেয়াল করল না। সব জেনেও, সব বুঝেও আকুল গলায় বলল, কী অইছে কাশেম কাকা? কী অইছে আপনের?
