ততক্ষণে কাশেম আর কাশেম নাই, চেহারা বদলে গেছে তার। নাক ফেটে দরদর করে রক্ত পড়ছে, ঠোঁট কেটে ঝুলে পড়েছে। দাঁতের গোড়ায় গোড়ায় রক্ত। বুঝি জিবলাও কেটেছে। মুখের এদিক ওদিক শালুকের মতো ফুলে উঠেছে। কাশেমের মুখ আর মানুষের মুখ মনে হচ্ছে না।
তবু কাঁদল না কাশেম। জড়ানো কাতর গলায়, দুইহাত মোনাজাতের ভঙ্গিতে তুলে মান্নান মাওলানাকে বলল, বিশ্বাস করেন হুজুর, আমারে আপনে বিশ্বাস করেন। আমি মিছাকথা কই নাই। আমি চুরি করতে আহি নাই। গরুডিরে না দেইক্কা থাকতে পারি না, মায়া লাগে দেইক্কা আহি। চুরি করলে তো আগে ঐ করতাম! মায়া না লাগলে এই রকম শীতের রাইত্রে কেঐ আইয়া গোয়াইলে হানদে! আপনের বাইত্তে নাইলে থাকতে না দেন অন্য বাইত্তে তো থাকতে পারতাম!
এবার মান্নান মাওলানা আর কথা বলবার সুযোগ পেলেন না। কথা বলল আতাহার। ভেক ধরছে হালার পো, যা বুজাইবা তাঐ বুজুম আমরা! যত মায়া লাগুক রাইত্রে আইয়া মাইনষে কোনও দিন গরুর লগে থাকে!
মাকুন্দা কাশেম আবার কী বলতে চাইল, তার আগেই আতাহারের দিকে তাকিয়ে মান্নান মাওলানা বললেন, এত প্যাচাইল পারতাছস ক্যা তুই? পিডাচ না ক্যা! গিড়ায় গিড়ায় পিড়া, নল্লি ভাইঙ্গা দে। জিন্দেগীতে যেন উইট্টা খাড়ইতে না পারে। পিডা।
কাশেম এবার মান্নান মাওলানার স্ত্রীর দিকে তাকাল। আম্মা, আম্মা আপনে হুজুররে বুজান। আপনে আতাহার দাদারে বুজান। ছোডকাল থিকা আপনেগো বাইত্তে থাকি। আপনে তো আমারে চিনেন! আপনে তো জানেন আমি চোর না! আমি মিছাকথা কই না। আপনে তাগো বুজান।
কাশেমের কথা শেষ হওয়ার আগেই, স্ত্রীকে কোনও কথার বলবার সুযোগ না দিয়েই আতাহারের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে উঠলেন মান্নান মাওলানা। কী কই তরে! পিডাচ না ক্যা! পিডাইয়া লুলা কইরা হালা। বিয়ান অউক, দারগা পুলিশ দিয়া এরাই দিমুনে।
এইবার দুইহাতে লোহা কাঠের ডাণ্ডাটা তুলল আতাহার। কোনওদিকে না তাকিয়ে প্রচণ্ড জোরে কাশেমের ডানহাটু বরাবর একটা বাড়ি দিল। পলকের জন্য আঘাতটা যেন বুঝতে পারল না কাশেম। তারপরই চিকুইর দিয়া উঠল। আল্লারে!
আতাহার তা গ্রাহ্য করল না। আবার বাড়ি মারল। আবার, আবার।
মাকুন্দা কাশেমের বুকফাটা আর্তনাদে তখন স্তব্ধ হয়েছিল জেগে ওঠা মানুষ, ভেঙে খান খান হয়ে যাচ্ছিল শীতরাত্রির নিস্তব্ধতা। মাকুন্দা কাশেমের আর্তনাদে তখন কাঁদতে ভুলে গিয়েছিল আচমকা ঘুমভাঙা শিশু, রুদ্ধ হয়েছিল উত্তরের হাওয়া। মাকুন্দা কাশেমের আর্তনাদে তখন চৌচির হচ্ছিল সাত আসমান, কেঁপে কেঁপে উঠছিল আল্লাহতালার আরশ।
.
১.৬৪
খালি ভার ঘরের ছনছায় নামিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল দবির। অসহায় ভঙ্গিতে পিড়ায় বসে মন খারাপ করা গলায় বলল, একখান খারাপ সমবাত আছে।
উঠানের কোণে জলচৌকিতে বসে রোদ পোহাচ্ছে নূরজাহান। বেলা হয়েছে তবু শীত কমেনি। গায়ে চাদরের মতো জড়িয়ে রেখেছে আকাশি রঙের পাতলা কাঁথা। বাড়ির পুবদিককার নামায় যে কদু উসসির ঝাঁকা সেই ঝাঁকার ঝকমকে রোদে টুকটুক করে লাফাচ্ছে একজোরা ভাত শালিক। আনমনা চোখে তাকিয়ে তাকিয়ে শালিক দেখছিল নূরজাহান। কথা শুনে দবিরের মুখের দিকে তাকাল। অলস গলায় বলল, কী?
কাইশ্যা ধরা পড়ছে।
কথাটা শুনে চমকাল নূরজাহান। থতমত খেল। অলস আনমনা ভাব কেটে গেল। এই নামের মানুষটাকে জন্মের পর থেকে চিনার পরও যেন এখন আর চিনতে পারল না। বলল, কোন কাইশ্যা?
মাকুন্দা।
এবার যেন চিনল নূরজাহান। আকুল গলায় বলল, কই ধরা পড়ছে?
মাওলানা সাবের বাইত্তে গরু চুরি করতে গেছিলো।
মাজায় লাঠির বাড়ি খেয়ে যেমন করে লাফিয়ে ওঠে নিরীহ আরজিনা ঠিক তেমন করে লাফিয়ে উঠল নূরজাহান। গা থেকে গাছের পাতার মতো খসে পড়ল কথা। নূরজাহান ভ্রুক্ষেপ করল না। চারপাশের ডালিমরাঙা রোদ ম্লান করে তীক্ষ্ণকণ্ঠে বলল, না না, না। কাশেম কাকায় চুরি করতে যায় নাই। ক্যান গেছে আমি জানি। কাকায় আমারে বেবাক কথা কইছে।
তারপর গরুদের লগে কাশেমের রাতযাপনের ঘটনা অস্থির গলায় দবিরকে বলল নূরজাহান। হামিদা ছিল রান্নাচালায়, কখন এসে দাঁড়িয়েছে নূরজাহান আর দবিরের সামনে ওরা তা খেয়াল করল না।
মেয়ের কথা শুনে দবির তখন বোবা হয়ে গেছে। নূরজাহানের মুখের দিকে খানিক তাকিয়ে থেকে বলল, কচ কী তুই! আ,কচ কী! কাইশ্যা তো তাইলে নির্দোষ! কাইশ্যা তো তাইলে চোর না!
হ, হ। একদোম নির্দোষ। হেয় চোর না। মাওলানা সাবে ইচ্ছা কইরা তারে ধরছে।
দবির করুণ গলায় বলল, খালি ধরলে তো ভাল আছিলো, বাপেপুতে মিল্লা যেই মাইরডা দিছে!
এই হগল মাওলানা সাবের চালাকি। বদমাশি। ছনুফুবুর জানাজা পড়তে আইছিলো দেইক্কা কাশেম কাকার উপরে হেয় চেইত্তা আছিলো। বহুত রাগ অইয়া আছিলো কাশেম কাকার উপরে। মাইরা ধইরা বাইত থিকা খেদাই দিয়াও রাগ মিডে নাই। আইজ গরুচোর বানাইয়া, পিডাইয়া আড্ডিগুড্ডি ভাইঙ্গা হেই রাগ মিডাইতাছে।
এতক্ষণ নূরজাহানের মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল হামিদা। মেয়ের কথা শেষ হতেই স্বামীর দিকে তাকিয়ে চিন্তিত গলায় বলল, মাকুন্দা অহন কো?
রান্নাচালার পিছন দিককার বাঁশঝাড়ের মাথার ওপর দিয়ে রোদে ভেসে যাওয়া আসমানের দিকে তাকাল দবির। দারগা পুলিশে ধইরা লইয়া যাইতাছে। মাইরের চোডে হাত পায়ের গিড়া (গাট) ভাইঙ্গা গেছে। হাঁটতে পারে না কাইশ্যা। আতুড় লুলা মাইনষের লাহান হেউড়াইয়া হেউচভূইয়া যাইতাছে। তার মইদ্যেও মাজায় দড়ি বানছে পুলিশে। য্যান দড়ি না বানলে দৌড় দিয়া পলাই যাইবো কাইশ্যা। আহা রে, কাইশ্যার কি আর দৌড় দেওনের জোরবল আছে! জিন্দেগি ছেমড়ার বিনাশ কইরা দিছে মাওলানা সাবে টুন্ডা (অথর্ব) কইরা দিছে।
