টর্চের আলোয় গোয়ালঘরের মাঝখানটা আলোকিত হয়েছে। সেই আলোয় দেখা গেল মাকুন্দা কাশেম বসে আছে দুইতিনটা গাই গরুর মাঝখানে। গায়ে নতুন লুঙ্গি পিরন আর তুস রঙের নতুন চাদর। বুকের কাছে দুইহাতে জড়িয়ে রেখেছে গোয়ালের সবচেয়ে ছোট বাছুরটা। টর্চের আলো পড়ায় বাছুরটা আর সে একই রকমের হতবাক চোখে তাকিয়ে আছে মান্নান মাওলানার দিকে।
পরিস্কার দেখেও যেন মাকুন্দা কাশেমকে চিনতে পারলেন না মান্নান মাওলানা। শরকি আগের মতোই বাগিয়ে রেখে বললেন, খবরদার! সাবধান! লড়লেঐ শরকি দিয়া পাড় দিমু।
মান্নান মাওলানার কথা মতন ততক্ষণে তার নিজের কাজ করে ফেলেছেন স্ত্রী। আতাহার ও হাফিজদ্দিকে ডেকে তুলেছেন। বাংলাঘর থেকে কাছা মেরে বেরিয়ে এসেছে তাগড়া জোয়ান আতাহার আর হাফিজদ্দি। আতাহারের হাতে লোহা কাঠের ডাণ্ডা। এই ডাণ্ডা মাথার কাছে নিয়ে শোয় সে। হাফিজদ্দির হাতে ছিল বাঁশের লাঠি। গোয়ালঘরের সামনে এসে বিশাল একখান হাঁক দিল সে। কে কোনহানে আছেন, আউগগান। চোর ধরছি।
হাফিজদ্দির লগে গলা মিলিয়ে চিৎকার দিতে গিয়েছিল আতাহার তার আগেই মান্নান মাওলানা বললেন, আগে ধর তারবাদে চিকুইর দে।
ততক্ষণে মাকুন্দা কশেমকে চিনে ফেলেছে আতাহার। চিনে বেকুব হয়ে গেছে। চোর ধরার উত্তেজনা নাই হয়ে গেছে তার। মান্নান মাওলানার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, ও বাবা, কো চোর? এইডা তো মাকুন্দা!
আতাহারের মতো মাকুন্দা কাশেমকে তিনিও চিনছিলেন। তবু ছেলেকে একখান ধমক দিলেন। মাকুন্দা অইছে কী অইছে! ও কি অহন আর আমগো বাড়ির গোমস্তা? ও চোর অইতে পারে না! ও তো আমার গরু চুরি করতেঐ আইছে। দেহচ না বাছুরডারে কেমতে প্যাচাইয়া ধরছে। ধর শুয়োরের পোরে, বান, পিডা।
এবার যেন ব্যাপারটা বুঝতে পারল আতাহার, বুঝে লাফ দিয়ে গোয়ালে ঢুকল। একহাতে খামচে ধরল মাকুন্দা কাশেমের গলার কাছের পিরন চাদর, শূন্যি (শূন্য) করে তাকে নিয়ে এল গোয়ালের বাইরে। আতাহারের আচরণে কাশেমের চেয়েও যেন বেশি ভয় পেল বাছুরটা, ছটফট করে মায়ের পেটের কাছে গিয়ে দাঁড়াল সে। তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতে লাগল তাদের প্রিয় মানুষটাকে নিয়ে অন্য কয়েকটা মানুষের কায়কারবার।
মান্নান মাওলানা আতাহার আর হাফিজদ্দির চিল্লাচিল্লিতে বাড়ির প্রতিটা ঘরে মানুষ জেগে উঠেছে, জ্বলে উঠেছে কুপিবাতি। দুয়ার জানালা খুলে বাইরে তাকিয়েছে বাড়ির বউঝিরা, পোলাপানরা। শীতে কাঁপতে কাঁপতে কেউ কেউ এসে দাঁড়িয়েছে উঠানে। মান্নান মাওলানা কাউকে খেয়াল করলেন না, কারও দিকে তাকালেন না, আতাহারকে বললেন, বান শুয়োরের পোরে।
গোয়াল ঘরের বাইরের দিককার একটা খুঁটির লগে কাশেমের চাদর দিয়েই কাশেমকে শক্ত করে প্যাচিয়ে বাঁধতে লাগল আতাহার। ততক্ষণে যেন হতবাক ভাব কেটেছে মাকুন্দা কাশেমের। ব্যাপারটা যেন বুঝতে পেরেছে সে। বুঝতে পেরে দিশাহারা গলায় বলল, আমারে বান্দেন ক্যা? আমি তো চোর না! চুরি করতে আহি নাই।
মান্নান মাওলানা এগিয়ে গিয়ে ধাম করে একটা লাথি মারলেন মাকুন্দা কাশেমের পেট বরাবর। চুরি করতে না আইলে রাইত দোফরে আমার বাইত্তে আইছস ক্যা! তুই এই বাড়ির কে? গোয়াইলে আইয়া হানছচ ক্যা? বাছুরডারে এমতে প্যাচাইয়া ধরছিলি ক্যা? বাছুরডারে কুলে লইয়া তো উইট্টা খাড়ইছিলি! শরকি হাতে আমি সামনে আইয়া না খাড়ইলে, টচ না মারলে তো এতুক্ষুণে বাছুরডা লইয়া পলাইতি। শরকি দিয়া পাড় দিমু দেইক্কা লড়তে পারচ নাই। বইয়া পড়ছস।
যে রকম একখান লাথথি খেয়েছে তাতে কেঁদে ফেলবার কথা কাশেমের। কিন্তু অবস্থা যা দাঁড়িয়েছে, এই অবস্থায় কান্না আসে না মানুষের। এই অবস্থায় অস্থির লাগে, সাঁতার না জানা মানুষের মতন পানিতে ডুবে যাওয়ার সময় যেমন লাগে তেমন লাগে। কাশেমেরও লাগছিল। অসহায় চোখে মান্নান মাওলানার মুখের দিকে তাকাল সে। আতাহার আর আতাহারের মায়ের মুখের দিকে তাকাল। কাতর গলায় বলল, না না। বাছুর কুলে লইয়া খাড়ই নাই আমি। বাছুরডারে বুকে প্যাচাই ধইরা, এই চাইর দিয়া। প্যাচাইয়া বইয়া রইছিলাম। আইজ বহুত শীত পড়ছে। শীতে বহুত কষ্ট পাইতাছিল বাছুর। আমি চোর না। চুরি করতে আহি নাই। গরুডির লেইগা মায়া লাগে দেইক্কা আইছি। দিনে আপনে আইতে দেন না দেইক্কা রাইত্রে আহি। রোজ রাইত্রে আইয়া গরুডির লগে থাকি। আমি চোর অমু ক্যা! আমি তো কনটেকদার সাবের মাইট্টাল অইছি। ভাল টেকা রুজি করি। এই যে দেহেন না নতুন লুঙ্গি পিরন কিনছি, চাইদ্দর কিনছি।
এক ফাঁকে শরকিটা গোয়াল ঘরের একপাশে দাঁড় করিয়েছে মান্নান মাওলানা, হাতের টর্চ দিয়েছেন স্ত্রীর হাতে। দুই হাতই মুক্ত এখন। আর টর্চ এখন জ্বালবারও দরকার নাই। ঘর থেকে আসা কুপিবাতির আলোয় আলোকিত হয়ে গেছে বাড়ি। সেই আলোয় গোয়ালঘরের খুঁটির লগে বাধা মাকুন্দা কাশেমকেও গরুর মতোই অবলা দেখায়। যেন সে কোনও মানুষ না, যেন সেও গরু, গিরস্তের গোয়ালে বাঁধা।
কিন্তু কাশেমের কথা বিন্দুমাত্র পাত্তা দিলেন না মান্নান মাওলানা। ক্ষ্যাপা ষাঁড়ের মতন গো গো করতে লাগলেন। দুইহাঁতে অবিরাম চড়থাবড় কিল ঘুষি মারতে লাগলেন কাশেমকে। লাথথি কন্নি মারতে লাগলেন। চোর না, তুমি চোর না শুয়োরের পো! তুমি সাদু! রাইত দোরে গোয়াইল ঘরে হানছো গৰুডির লেইগা মায়া লাগে দেইক্কা। আমারে ভোদাই (বোকা) পাইছো! যা বুজাইবা তাই বুজুম আমি! আরে চুতমারানির পো, তরে তো আমি চিনি! চুন্নির জানাজায় গেছস দেইক্কা তরে আমি বাইত থিকা খেদাই দিছি। বাইত্তে আর আইতে দেই নাই। তুই আইছস হেই শোদ লইতে। আমার বাছুর চুরি কইরা শোদ লবি তুই। বাছুর হাজার টেকার কম দাম অইবো না। চুরি করতে পারলে বড়লোক অইয়া যাইতি তুই। মাইট্টালগিরি করন লাগতো না। বুজি, বেক বুজি আমি। তয় আমার বাড়ির জিনিস চুরি করন এত সোজা না। দোয়া পইড়া বাড়ি বাইন্দা থুইছি। আমি। চোর আইলে ধরা পড়বোঐ। আল্লার কুদরত। তুইও পড়ছস।
