তখন শীত বিকালের পদ্মার পানির মতন আলো মুছে দিচ্ছিল দিনশেষের অন্ধকার, কুয়াশা। কুয়াশায় অন্ধকারে আস্তেধীরে মিলিয়ে যাচ্ছিল একজন মানুষ।
.
১.৬৩
রাত দুপুরে মান্নান মাওলানা শোনেন তার গোয়ালঘরে কী রকম একটা নড়াচড়ার শব্দ! গরুগুলো যেন একটু বেশি নড়ছে, লেজ নেড়ে, কান লতর পতর করে একটু বেশি শব্দ করতাছে।
কনকনা শীতের রাতে গরুদের আচরণও হয় মানুষের মতে। নড়াচড়া কম করে তারা, শব্দ কম করে। যেখানে দাঁড়ায় তো দাঁড়িয়ে থাকে, বসে তো বসেই থাকে। জাবর কাটে না। নাদে কম, চনায় কম। শীতের হাত থেকে গরুদের বাচাবার জন্য গোয়াল ঘরে পুরু করে খড়নাড়া বিছিয়ে দেয় গিরস্তরা। শীত কাতরে কোনও কোনও গরুর পিঠে মোটা ছালার চট বেঁধে দেয়। এই বাড়িতে এমন শীত কাতুরে গরু নাই একটাও। পিঠে ছালার চট বাঁধবার দরকার হয়নি কোনও গরুর। তবে গোয়ালঘরে খড়নাড়া বিছানো হয়েছে। দুইতিন দিন আগে কাজটা করেছে নতুন গোমস্তা হাফিজদ্দি। শীত আরও পড়েছে বলে গরুরা খুব কষ্ট পাচ্ছিল।
এরকম শীতের রাতে গরুরা কেন আজ নড়াচড়া করতাছে! ব্যাপারটা কী! মশায় কামড়াচ্ছে! এই শীতে তো মশা থাকবার কথা না! যা আছে সন্ধ্যাবেলা ধুপ দেওয়ার পর এইমুখি হওয়ার কথা না! মাকুন্দা কাশেমের মতো হাফিজদ্দিও তো ধুপ দেওয়া শুরু করেছে। আজ সন্ধ্যায়ও তো দিল! তাহলে?
লেপের তলা থেকে মাথা বের করলেন মান্নান মাওলানা। জোড় বালিশ শিথান দিয়ে শোয়ার অভ্যাস তার। কাত হয়ে শুয়ে ছিলেন বলে এককান চাপা পড়ে আছে আর এককান খোলা। এককানে শোনা শব্দ ঠিক নাও হতে পারে। বালিশ থেকে মাথা উঁচু করে দুইকান খাড়া করলেন তিনি। হঠাৎ করে ঘুম ভেঙেছে বলে প্রথমে একটু দিশাহারা। ছিলেন। সেইভাব কাটিয়ে পরিষ্কার শুনতে পেলেন গরুদের নড়াচড়ার শব্দ।
না, মশার কামড়ে এমন নড়াচড়ার কথা না গরুদের। শিয়াল ঢোকেনি তো গোয়ালে! নাকি বাঘদাসা ঢুকেছে।
কচি নরম বাছুঁড়ের লোভে কখনও কখনও গিরস্তের গোয়ালে হানা দেয় শিয়াল। একলা না, দল বেঁধে। চতুর জীব তো, দল বেঁধে গোয়ালে ঢুকে তাগড়া জোয়ান গাই গরুগুলিকে ত্যক্ত করতে থাকে কয়েকটাতে। কোনওটায় পা কামড় দিয়ে ধরে কোনও গরুর, কোনওটায় লাফ দিয়ে ওঠে পিঠের দিকে। শিং বাগিয়ে তাদেরকে তাড়া করতে ব্যস্ত হয় গরুগুলি আর সেই ফাঁকে তিনচারটা শিয়ালে মিলে বাছুরটাকে কায়দা করে ফেলে। কেউ কামড় দিয়ে ধরে ঢোর, কেউ এই ঠ্যাং ওই ঠ্যাং। তারপর টেনে নিয়ে যায় চকে।
গোয়ালে শিয়াল ঢুকলে বেশ একটা হুড়াহুড়ির শব্দ হয়! গরুদের নাকমুখ দিয়ে বেরয় রাগ ক্রোধের ভোসভোসানি। এখনকার শব্দটা তেমন না। যদি বাঘদাসাও ঢুকে থাকে, রাগ ক্রোধের শব্দ তো গরুরা করবেই। করতাছে না তো!
বাঘদাসা সাহসী জীব। বাঘের দাস তো, বাঘের মতো না হলেও শিয়ালের মতো, সাহস শিয়ালদের চেয়ে অনেক বেশি। ক্ষুধার জ্বালায় পাগল হয়ে একাই কখনও কখনও হানা দেয় গিরস্তের গোয়ালে। পাঁচ দশটা গরুর সামনেই হয়তো আক্রমণ করে বসে বাছুরকে। খাবলা দিয়ে মাংস তুলে ফেলে।
তেমন হলে তো বাছুড়টার আর্তনাদে লগে লগে জেগে যাবে বাড়ির লোক। কোনও বাছুর তো তেমন আর্তনাদ করতাছে না! তাহলে!
তারপরই মান্নান মাওলানার মাথায় এল অন্য চিন্তা। গরুচোর ঢোকেনি তো তার গোয়ালে! রাত দুপুরে গোয়ালে অচেনা মানুষ দেখে নড়াচড়া করতাছে না তো গরুগুলি!
বিছানায় উঠে বসলেন মান্নান মাওলানা। পাশে শোয়া স্ত্রীকে ধাক্কাতে লাগলেন। তবে শব্দ করে ডাকলেন না তাকে।
দুই তিনবার ধাক্কাতেই সাড়া দিলেন স্ত্রী। কী অইছে! এমুন করেন ক্যা?
স্ত্রীর কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে মান্নান মাওলানা বললেন, চুপ। কথা কইয়ো না। চোর আইছে।
চোর আসছে শুনে ভয়ে প্রায় আর্তনাদ করে উঠতে গিয়েছিলেন স্ত্রী, মান্নান মাওলানা তার মুখ চেপে ধরলেন। কইলাম যে চুপ! হোনো, গরুচোর। গোয়াইল ঘরে হানছে। গরু চোররা কইলাম এক দুইজনের বেশি আহে না। ইচ্ছা করলেই ধরন যায়। আমি আইজ ধরুম। ওড়ো তুমি। উইট্টা আমার লগে বাইর অও। আমি একহাতে শরকি লমু। আরেক হাতে টচ (টর্চ) লাইট। তুমি এমুন কইরা দুয়ার খোলবা য্যান আওজ না অয়। আমি তারবাদে, গোয়াইলের সামনে গিয়াঐ, টচ মাইরা শরকি দিয়া একজনরে গাইত্তা (গেঁথে) হালামু। আর তুমি আতাহাররে ডাক দিবা, হাফিজদ্দিরে ডাক দিবা।
বাড়িতে চোর আসার পর, চোর কোনও ঘরে থাকার পরও যে এত ঠাণ্ডা মাথায় চোর ধরার ফন্দি করতে পারে তাঁর স্বামী, এত এত বছর ধরে মানুষটার লগে সংসার করার পরও, মানুষটার হাজার রকমের কায়কারবার দেখবার পরও মান্নান মাওলানার স্ত্রীর তা বিশ্বাস হচ্ছিল না। কী রকম একটা ঘোর লেগে গেল তার। স্বামীর কথা মতন নিঃশব্দে বিছানা থেকে নামল সে।
ততক্ষণে শক্ত করে লুঙ্গি কাছা মেরেছেন মান্নান মাওলানা, বালিশের তলা থেকে পাঁচ ব্যাটারির টর্চ বের করে হাতে নিয়েছেন আর মাথার কাছে, ঢেউটিনের বেডার। এককোণে দাঁড় করিয়ে রাখা শরকি নিয়েছেন। তাঁর কথা মতো সাবধানে দুয়ার খুলেছেন স্ত্রী, মান্নান মাওলানা ঘর থেকে বেরুলেন।
বাইরে আজ প্রচণ্ড শীত, হাড্ডিগুড্ডির (হাড়গোড়ের) ভিতর পর্যন্ত কাঁপন ধরে যায় এমন। মান্নান মাওলানার গায়ে হাফহাতা গেঞ্জি। এমনিতে শীত কাতুরে লোক তবু কিছুমাত্র শীত টের পেলেন না। বরং শরীর তার ফেটে পড়ছিল গরমে। শরকি বাগিয়ে সাবধানী পায়ে গোয়ালঘরের সামনে এসে দাঁড়ালেন। আচমকা টর্চ জ্বেলেই চিৎকার করে উঠলেন, খবরদার! দৌড় দিলেঐ শরকি দিয়া গাইত্তা হালামু।
