সপ্তাহ নেওয়ার সময় গোঁড়া হাতে লাইন ধরে দাঁড়ায় মাটিয়ালরা। বদর তাদের লাইন ঠিক করে দেয়। আগপিছ নিয়ে কেউ কোনও ঝামেলা করলে সেইসব মিটায়। বেশ একখান মাতাব্বরি ভাব থাকে তার। যেন হেকমতের পরই তার জায়গা, সে কোনও সাধারণ মাটিয়াল না। সাহেব তাকে দিয়ে অন্যান্য কাজ করায় বলে সেও যেন। ছোটখাট একজন ম্যানেজার। আর ফুর্তিবাজ মানুষ বদর, শরীরে সারাক্ষণই আমুদে ভাব। ফলে মাটিয়ালরা তাকে পছন্দও করে। সে কোনও ঝামেলা মিটালে, অন্যায় ভাবেও যদি মিটায় কেউ প্রতিবাদ করে না!
সেই বদর কয়েকদিন ধরে একেবারেই অন্যরকম, একেবারেই চুপচাপ। স্বভাব বদলে গেছে তার। দুই তিনদিন ধরে কাজই করে না। কথাও বলে না কারও সঙ্গে। উদাস হয়ে চকে বসে থাকে। সাহেবের জন্য আজ চেয়ার আনতে যায়নি। মাটিয়ালদের লাইন ঠিক রাখার জন্য হামতাম (হম্বিতম্বি) করতাছে না। মরার মতো সবার শেষে দাঁড়িয়ে আছে। হাতে ছোঁড়া, চোখ আসমানের দিকে। একজন করে টাকা নিয়ে বিদায় হচ্ছে, লাইন আগায়, বদর আগায় না।
এই ব্যাপারটা খেয়াল করল আদিলদ্দি। সে ছিল লাইনের মাঝামাঝি। নিজের সপ্তাহ নিয়ে বের হয়ে যাওয়ার সময় দেখে লাইন অনেকখানি আগিয়েছে তারপর বেশ ফাঁক, ফাঁকের শেষে একা উদাস হয়ে দাঁড়িয়ে আছে বদর। দেখে যা বোঝার বুঝে গেল সে। নিঃশব্দে এসে দাঁড়াল বদরের পাশে। আস্তে করে ধাক্কা দিল বদরকে। খাড়ই রইলেন ক্যা! যান, আউগগান।
প্রথমে একটু চমকাল বদর, আদিলদ্দির মুখের দিকে তাকাল তারপর পা ফেলল। আদিলদ্দি বুঝে গেল টাকা হাতে না পাওয়া তরি বদরের লগে তার থাকতে হবে। সময় নষ্ট হবে, হোক। চদরি বাড়ির ছাপড়া ঘরে গিয়ে, পুকুরে ডুব দিয়েই রান্না বসাতে বসাতে আজ দেরি হয়ে যাবে, হোক। মনমরা ছেলেটার লগে থাকা দরকার।
আদিলদ্দি রইল।
বদরের লগে আদিলদ্দিকে দেখেই শিয়ালের মতন খ্যাক খ্যাক করে উঠল আলী আমজাদ। ঐ চুতমারানির পো, তুই না টেকা নিলি? আবার লাইনে খাড়াইছস ক্যা?
আদিলন্দি নরম গলায় বলল, আমি লাইনে খাড়ই নাই সাব। বদরের লগে আছি।
ক্যা? বদইরা কি নতুন মাইট্টাল! বোজে না কিছু, না টেকা পয়সা চিনে না? সর তুই। সর এহেন থিকা।
আদিলদ্দি একপাশে সরে দাঁড়াল।
একপলক বদরের দিকে তাকিয়ে হেকমতের দিকে তাকাল আলী আমজাদ। কোলে রাখা প্রায় শেষ হয়ে আসা টাকার ব্রিফকেস বন্ধ করতে করতে বলল, বদইরা তো কয়দিন ধইরা ঠিকঠাক মতন কাম করে না। বইয়া থাকে, আসমানের মিহি চাইয়া থাকে। আমার আহান চক্কু, বেবাক দেখি আমি। দেইক্কাও কিছু কই নাই। কমু ক্যা, কেঐর ইচ্ছা অইলে কাম করবো, ইচ্ছা অইলে করবো না। কামে ফাঁকি দিবো, আমার চকে পড়বো তাও আমি কিছু কমু না। খালি টেকাডা দেওনের সমায় দেইক্কা লমু।
বদরকে না হেকমতকে আলী আমজাদ বলল, হেকমইত্তা, ক কয়দিন ঠিক মতন কাম করতাছে বদইরা আর কয়দিন ফাঁকি দিছে।
হেকমত বলল, এই হপ্তায় ঠিক মতন কাম করতাছে তিনদিন। তারপর থিকা ফাঁকি দিছে। কাম করে তো করে না, গোড়া মাথায় উডায় তো উড়ায় না, বইয়া থাকে। একলা একলা কথা কয়। যারে সামনে পায় তারেই কয়, কন, আমি বলে চোর!
একথা শুনে ভুরু কুঁচকাল আলী আমজাদ। এক পলক বদরের দিকে তাকাল তারপরই স্বাভাবিক হয়ে গেল। যা ইচ্ছা কউক গা। ঐ হগল হুইন্না আমার লাব নাই। আমারে আসল কথা ক, ঠিক মতন কাম করতাছে তিনদিন।
হ।
পয়সা পাইবো তিনদিনের। বাকি চাইর দিনের পয়সা দিমু না।
মনে মনে বদরের রোজ হিসাব করে ব্রিফকেস খুলে টাকা বের করল আলী আমজাদ। হেকমতের হাতে দিল। তারপর ব্রিফকেস বন্ধ করে চেয়ারের ওপর রেখে উঠে দাঁড়াল। কোটের পকেট। বকে প্যাকেট বের করে সিগ্রেট ধরাল। ধরিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে টানতে লাগল।
কাতর চোখে বদর তখন তাকিয়ে আছে আলী আমজাদের দিকে। হেকমতের হাতে তার টাকা, সেদিকে খেয়াল নাই। টাকাটা হেকমত তার দিকে বাড়িয়ে দিতেই, টাকা না ধরে, হেকমতের দিকে না তাকিয়ে ভাঙা গলায় আলী আমজাদকে ডাকল। সাহেব।
বদরের দিকে তাকাল না আলী আমজাদ, কথাও বলল না। সিগ্রেটে টান দিয়ে হেকমতকে বলল, কইয়া দে, দাপড়াইয়া মইরা গেলেও আর একটা পয়সা দিমু না আমি।
কথার লগে নাকমুখ দিয়ে ধুমা বের হল। হেকমত সেসব খেয়াল করল না। আলী আমজাদের কথাগুলি বদরকে বলবে, তার আগেই আলী আমজাদকে বদর বলল, আমি সাহেব পয়সা চাই না।
চমকে বদরের মুখের দিকে তাকাল আলী আমজাদ। তয়?
তিনদিনের পয়সা দিছেন হেইডাও আপনে রাইক্কা দেন।
আলী আমজাদ তো হলই, বদরের কথা শুনে হেকমত আর দূরে দাঁড়ান আদিলদ্দিও অবাক হয়ে গেছে। সিগ্রেটে টান দিতে গিয়েছিল আলী আমজাদ, সিগ্রেট ধরা হাত মুখের সামনে উঠে থেমে থাকল, আর হেকমত এবং আদিলদ্দি ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইল বদরের দিকে।
বদর কারও দিকেই তাকাল না। আগের মতোই ভাঙা গলায় বলল, আমি কোনও পয়সা চাই না সাহেব। আমার কোনও পয়সার লোব নাই। তিনদিন কাম করছি না সাতদিন করছি আমি কোনও ইসাব (হিসাব) করুম না। কয়টেকা পামু না পামু ইসাব করুম না। টেকাডি আপনে রাইক্কা দেন। তাও আপনে কন, আমি চোর না। আমি আপনের পয়সা চুরি করি নাই।
কথা বলতে বলতে ভাঙা গলা জড়িয়ে এল বদরের, চোখ ভরে গেল পানিতে। কারও মুখের দিকে আর তাকাল না সে। একহাতে অসহায় ভঙ্গিতে ধরা মোড়াখান, অন্যহাতে চোখ মুছতে মুছতে পশ্চিম দিককার চকে নেমে গেল। এই চক পাড়ি দিয়ে, ধান আর তিল কাউনের বিল পাড়ি দিয়ে নিজগ্রামে ফিরে যাবে বদর।
