তছি ভয়ার্ত গলায় বলল, তাইলে আমি যে তোমারে কইয়া হালাইছি।
আমারে কইছস কী অইছে! আমি কী কেঐরে কমুনি?
একহাতে কেচি অন্যহাতে থাবা দিয়ে মায়ের একটা হাত ধরল তছি। কাতর অনুনয়ের গলায় বলল, কইয়ো না মা, কের তুমি কইয়ো না। কইলে কইলাম দারগা পুলিশে আইয়া ধরবো আমারে। জেল অইবো আমার, ফাঁসি অইবো।
তছির কথা শুনে বুকটা হু হু করে উঠল মায়ের। চোখ ছলছল করে উঠল। কথা বলতে পারল না সে। অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে চোখের পানি সামলাতে লাগল।
তছি সেসব খেয়াল করল না। বলল, আমিও কেরে আর কোনওদিন কমু না। মইরা গেলেও কম না। কম কেমতে! ঘর থনেঐত্তো বাইর অমু না! কের লগে তো দেহাই অইবো না আমার! কেথা চাড়া দিয়া, ঘরের ঝাঁপ বন্দ কইরা হারাদিন হারারাইত হুইয়া থাকুম। তুমি বইয়া থাকবা আমার শিথানে। দুই একখান কথা কইলে তোমার লগে কমু।
চোখের পানি সামাল দিয়ে মা বলল, হারাদিন কেমতে তর শিথানে বইয়া থাকুম আমি! আমার কাম কাইজ নাই!
থাকলে থাকবো, কাম কাইজ তুমি করতে পারবা না।
তারপর আগের মতন কাতর গলায় বলল, মাগো, তুমি শিথানে বইয়া না থাকলে আমার বহুত ডর করবো। খালি মনে অইবো অহনে পুলিশ দারগায় আইয়া ধইরা লইয়া যাইবা আমারে। অহনে ফাঁসি দিবো। তুমি শিথানে বইয়া থাকলে তারা আমারে ধরতে পারবো না। ফাঁসি দিতে পারবো না।
শুনে আবার চোখ ভরে পানি এল মায়ের।
তছি বলল, দিন দোফরে আর কোনওদিনও ঘর থনে বাইর অমুনা আমি। ঘরের ভিতরে থাকুম, কেথার নিচে থাকুম। খাওন দাওন পেশাব পাইখানা নাওন ধোন বেবাক করুম রাইত্রে, বেবাকতে ঘুমাই যাওনের পর, চুপ্পে চুপ্নে। দিনে দোফরে ঘর থনে বাইর অইলেঐ মাইনষের লগে কথা কইতে ইচ্ছা করবো আমার, বাইত থনে বাইর অইয়া যাইতে ইচ্ছা করবো। কথা কইতে গিয়া করে আমি এই কথা কইয়া হালামু! বাইত থনে বাইর অইয়া গেলে কোনহানে পুলিশে দারগায় আমারে দেইক্কা হালাইবো। এর লেইগাঐ নাইড়া অইয়া যামু। নাইরা অইয়া গেলে ঘরথনে বাইর অইতে শরম করবো আমার। মাইনষের সামনে যাইতে, মাইনষের লগে কথা কইতে শরম করবো। দেও, চুলডি আগে কেচি দিয়া কাইট্টা দেও মা। গোড়া থিকা কাইট্টা, এই যে সাপান (সাবান) পানি আছে, মাথায় সাপান ঘইষ্যা, ফেনা উড়াইয়া এই বেলেড দিয়া ছাইচ্ছা (চেঁছে) দেও।
এবার ব্যাপারটা বুঝল মা, বুঝে হতভম্ব হয়ে গেল। ভয়ে আতংকে ভিতরে ভিতরে পাগলামি বেড়ে গেছে তছির। মাথা নাইড়া করার চিন্তা পাগলামি ছাড়া কিছু না। এই পাগলামি থেকে মেয়েটাকে এখন কেমন করে ফিরাবে সে! এই বয়সী মেয়ে নাইড়া হয়।
তছিকে বুঝ দেওয়ার গলায় মা বলল, ঘর থনে বাইর নাইলে না অইলি, যেমতে যা করতে চাছ কর, নাইড়া অওনের কাম কী! সিয়ানা মাইয়ারা কোনওদিন নাইড়া অয়?
না অয় না। আমি অমু। নাইড়া না অইলে হারাদিন কেথার তলে থাকতে ইচ্ছা করবো না আমার। বাইত থনে বাইর অইয়া যাইতে ইচ্ছা করবো। নেও তাড়াতাড়ি করো।
কেচিটা মায়ের দিকে এগিয়ে দিল তছি।
কিন্তু মা নড়ে না। যেমন বসেছিল, বসে থাকে।
তছি বলল, নাইড়া অওনের আরেকখান দরকারও আছে মা। হেদিনের পর থিকা মাথাডা বহুত গরম অইয়া রইছে। চুলার আগুনে হাড়ির ভাত যেমুন বলকায়, আমার মাথাডা অমুন বলকায়। নাইড়া অইলে বলকানিডা কমবো। উকুনে খাইয়া হালাইলো মাথা, উকুনডিও কমবো। এক কামে ম্যালা কাম অইবো। নেও ধরো কেচিড়া।
কেচি তবু ধরল না মা। আগের মতন বুঝ দেওয়া গলায় বলল, মাথায় তেল দিয়া দেই মা তাইলে মাথার বলকানি কমবো। কাকই দিয়া এচড়াইয়া দিমুনে, উকুন মাইরা দিমুনে। নাইড়া অওনের কাম নাই।
এবার চট করে রেগে গেল তছি। গদে ঢোকা চোখ ধ্বক করে জ্বলে উঠল। দাঁত মুখ খিচে সাপের মতো হিসহিস করে বলল, ঐ মাগি এতো প্যাচাল পারফ ক্যা! নাইড়া করতে কইছি কর, নাইলে তরে আমি নাইড়া কইরা দিমু। নে ধর কেচি।
জোর করে মায়ের হাতে কেচি ধরিয়ে দিল তছি। মাথা এগিয়ে দিল তার দিকে।
তছির এই রাগারাগিতে না, নিজেকে লুকিয়ে রাখবার চেষ্টায়, বাঁচিয়ে রাখবার আশায় পাগল মেয়ের যে অসহায় চেষ্টা সেই কথা ভেবে পানিতে আবার চোখ ভরে গেল তছির মায়ের। চোখের পানিতে ভাসতে ভাসতে তছির চুলে ঘ্যাচ ঘ্যাচ করে কেচি চালাতে লাগল সে।
.
১.৬২
সড়কের মাঝখানে চেয়ার নিয়ে বসেছে আলী আমজাদ। আজ শুক্রবার, মাটিয়ালদের সপ্তাহ দেওয়ার দিন। শেষ বিকালে কাজটা করে সে। যখন দিনের মাটিয়ালদের কাজ শেষ, রাতের মাটিয়ালদের কাজ শুরু।
অন্যান্য দিন বাড়ি যাক না যাক, শুক্রবার দুপুরের দিকে কাজের সাইট ঘুরে, হেকমতের কাছ থেকে মাটিয়ালদের টাকা পয়সার হিসাব বুঝে বাড়িতে চলে যায় আলী আমজাদ। গিয়ে নাওয়া খাওয়া সেরে, হাতে একখান অল্পদামী ব্রিফকেস, বেশ একটা ভাব ধরে বিকালের মুখে ফিরে আসে। খুব বেশি টাকা পয়সা নিজের লগে রাখে না সে। টাকা রাখে বাড়িতে। সপ্তাহে এই একদিন গিয়ে ব্রিফকেস ভরে নিয়ে আসে।
আলী আমজাদের হাতে ব্রিফকেস দেখে খুশিতে ফেটে পড়ে মাটিয়ালরা। তারা জানে ব্রিফকেসে কী! সপ্তাহ পেয়ে কী করবে না করবে, মনে মনে হিসাব করে। ফলে প্রত্যেকেই থাকে কমবেশি আনমনা। এসবের ফাঁকেই, আলী আমজাদ সাইটে আসবার আগেই হেকমতকে বলে আশপাশের বাড়ি থেকে একখান চেয়ার জোগাড় করে রাখে বদর। সাহেব এসে আরাম করে বসবেন চেয়ারে, কোলে ব্রিফকেস নিয়ে টাকা শুনে দেবেন মাটিয়ালদের। সরাসরি নিজ হাতে দিবেন না, পাশে ছাতা হাতে দাঁড়িয়ে থাকবে হেকমত, মাটিয়ালের মুখ দেখে, তার রোজ মনে করে নিজে একবার শুনে টাকাটা দেবেন হেকমতের হাতে। হেকমত আর একবার শুনে তবে দেবে মাটিয়ালকে। দুইজন মানুষের চোখ হাত ফাঁকি দিয়ে এক টাকা বেশি যাওয়ার পথ নাই কারও হাতে।
