পাগলরা পানি ভয় পায়, পানি পছন্দ করে না। তছি করে। শীতকাল নাই খরালিকাল নাই গোসলটা সে নিয়মিত করে। শীতকালে গোসল করে হাত পায়ে না হলেও মুখে এক খাবলা সউষ্যার তেল সে মাখেই। ফলে মুখটা খুব কালচে দেখায়, তবে তেলতেল করে। শুকিয়ে আমসি হয় না মুখ, খড়ি ওঠে না। ঠোঁট দুইখান তাজা থাকে।
সেদিনের পর থেকে গোসল করে না তছি, ঠোঁটে মুখে তেল ছোঁয়ায় না। ফলে মুখখানা খড়িওঠা, সাদাটে ঠোঁট প্রচণ্ড খরায় শুকিয়ে যাওয়া মাঠের মতো। পাকা আমড়ার আঁশের মতো দাগ পড়েছে ঠোঁটে।
তছির মাথার চুল কাউয়া চিলের বাসার মতন। চুল ভর্তি উকুন। দুই চারদিন পর পর উকুনের জ্বালায় পাগল হয়ে তছি নিজেই চপচপ করে তেল দেয় মাথায়। তেল দিয়ে চুল ভিজিয়ে, একপাশে সরু দাঁত অন্যপাশে একটু মোটা এমন একখান কালো বেঁটে কাঁকুই দিয়ে অনেকক্ষণ ধরে চুল আঁচড়ায়। কাঁকুইয়ের দাঁতে আটকে পড়া উকুন পিছার শলা দিয়ে খুঁচিয়ে বের করে মারে।
সেদিনের পর থেকে কাজটা তছি আর করেনি। সারাক্ষণই শুয়ে আছে বলে চুল হয়েছে কাউয়ার বাসা। এই যে তছি এখন বসে আছে, হঠাৎ করে তার মাথার দিকে তাকালে মনে হয় এটা কোনও যুবতী মেয়ের মাথা না। এ এক গ্রাম্য অনাথ বালিকার মাথা। চুলা জ্বালবার আশায় মাথায় করে শুকনা কচুরির বোঝা বয়ে নিচ্ছে সে। মাথার চারপাশ দিয়ে ঝুলে পড়েছে কচুরির বিষণ্ণ কালো ছোবা।
তছি আবার ফিসফিস করে বলল, কী অইলো! ও মা।
এবার তব্দ (স্তব্ধ) ভাব ভাঙল মায়ের, চোখে পলক পড়ল। একটু নড়ল সে, একটু ব্যস্ত হল। কী কচ?
তছি অস্থির গলায় বলল, কী কইছি হোনো নাই তুমি! আমার চুলডি কাইট্টা দেও। নাইড়া (ন্যাড়া) কইরা দেও আমারে।
একথায় মা একেবারে দিশাহারা হয়ে গেল। হায় হায় কচ কী? নাইড়া অবি ক্যা?
মায়ের গলা একটু চড়ে গিয়েছিল, শুনে ভয় পেল তছি। দুয়ারের দিকে তাকিয়ে হিসহিস করে বলল, আস্তে আস্তে কথা কও। কেঐ হুনবো!
গলা নামাল মা। হুনলে কী অইবো! আমগো বাইত্তে তো অন্যমানুষ নাই!
না থাউক, আইতে কতুক্ষুণ!
তারপর ভাউয়া (কোলা) ব্যাঙের মতো একখান লাফ দিল তছি, লাফ দিয়ে দুয়ারের সামনে গেল। দ্রুত হাতে ঝাপ লাগাল। তোমারে না কইছি ঘরের ঝাপ সব সমায় লাগায় রাখবা। খোলা রাখছো ক্যা?
আমি ইট্টু বাইরে গেছিলাম।
বাইরে কম কম যাইবা তুমি। হারাদিন এইঘরে বইয়া থাকবা। আমি কেথা মুড়াদা হুইয়া থাকুম তুমি থাকবা আমার শিথানে বইয়া। ঘরের ঝাঁপ বন্দ রাখবা য্যান বাইরে থিকা দেইক্কা কেঐ উদিস না পায় এই ঘরে মানুষ আছে। বাইরে গেলেও ঝাঁপ বন্দ কইরা রাইক্কা যাইবা। বাড়ির বেবাকতেরে কইয়া দিবা দারগা পুলিশে যুদি আমারে বিচড়াইতে আহে কইয়া দিব তছি বাইত্তে নাই। পাগলনি তো, কই জানি গেছে গা! কেরে কিছু কইয়া যায় নাই।
তছির কথা শুনে বুক তোলপাড় করে উঠল মায়ের। পাগল মেয়ে, ঝাঁপ বন্ধ করে কাঁথার তলায় লুকিয়ে থাকলে কী দারোগা পুলিশে তাকে খুঁজে পাবে না! তারা কী এত সোজা জিনিস, বাড়ির মানুষের কাছে শুনবে তছি বাড়িতে নাই আর সেইকথা বিশ্বাস করে ফিরে যাবে! মাথথি মেরে তছির ঘরের ঝাঁপ খুলবে না তারা। কাঁথা তুলে দেখবে না কে শুয়ে আছে।
একথা তছিকে বলা যাবে না। বললে এতই ভয় পাবে সে, বাড়ি ছেড়ে কোথায় কোথায় চলে যাবে। হয়তো আর কোনওদিন ফিরেই আসবে না। যুবতী মেয়ে কোথায় কার হাতে গিয়ে পড়বে, কে খাবলা (খুবলে) দিয়ে খাবে মেয়েটাকে। এক রুস্তমকে মেরে নিজেকে রক্ষা করেছে সে। দেশে তো রুস্তমের আকাল নাই। কতজনকে মারবে তছি! তারচেয়ে যেভাবে ঘরে লুকিয়ে আছে সেভাবেই থাকুক। আর যাই হোক মায়ের চোখের সামনে তো রইল! দারোগা পুলিশের হাতে ধরা পড়া যদি কপালে থাকে, ধরা সে পড়বেই। ফাঁসি যদি কপালে থাকে, ফাঁসি তার হবেই। কপালের লেখা কে খণ্ডাতে পারে!
আনমনা গলায় মা বলল, দারগা পুলিশের কথা কেঐরে আমি কমু না।
কথাটা যেন বুঝতে পারল না তছি। বলল, ক্যা?
কেঐ তো জানে না বেডারে তুই মাইরা হালাইছস!
তুমি তো জানো! আমি তোমারে বেবাক ঘটনা কইছি না! বড়দাদায়ও তো হুইন্নাইছে!
মা বুঝল এই কথাটা তছি একেবারেই অস্বাভাবিক ভাবে বলছে। কথা বেশিরভাগ সময় সে স্বাভাবিক ভাবেই বলে। স্বাভাবিকভাবে বলতে বলতে নিজের অজান্তেই এক সময় অস্বাভাবিক হয়ে যায়, তছি তা বুঝতে পারে না। ওটাই তার পাগলামি। এখন সেই পাগলামিটা তছি করতে শুরু করেছে। তবে এইসব সময় তছির কথার বিরোধিতা করা মুশকিল। সে যা বলবে তাই মেনে নিতে হবে, সেই মতো কথা বলতে হবে। নয়তো কথার পাগলামি বাদ দিয়ে অন্যরকম পাগলামি শুরু করবে তছি। মা ভাই বুঝবে না, ছেলে বুড়া বুঝবে না, মারামারি লাগিয়ে দেবে।
এখন অবশ্য সেই ভয় নাই। তছি আছে বিরাট ভয়ে। এখন কথার পিঠে বুঝিয়ে কথা বলতে পারলে স্বাভাবিক মানুষের মতন সেই কথার ভালমন্দ বোঝার চেষ্টা করবে।
মা বলল, আবদুল হোনছে খালের মইদ্যে একবেডার লাচ পাওয়া গেছে। বেডারে যে তুই মারছস হেইডা হোনছেনি?
তছি বিজ্ঞের মতো বলল, না, কার কাছে হোনবো! আমি তো বড়দাদারে কই নাই।
কোনওদিন কইচও না। খালি আবদুলরেঐ না, দুইন্নাইর কেঐরেঐ কইচ না। কইলে এককান দুইকান কইরা বেবাকতে জাইন্না যাইবো। পুলিশ দারগায়ও জানবো। জানলে আর রক্ষা নাই।
