মাকে ঘটনা বলার পরদিন, সারাদিন কিছু মুখে দেয়নি তছি। আবদুলের কথায় রাতেরবেলা তছির ভাতপানি এনে তার মাথার কাছে রেখেছে মা। রেখে অনেকক্ষণ ডাকাডাকি করেছে মেয়েকে। ওট মা। উইট্টা ভাতপানি খা। কপালে যা আছে তাই অইবো। কপালের লেখন কেঐ খাইতে পারে না। ওট।
তছি সাড়া দেয়নি, নড়েনি। ভাতপানি ঢেকে শুয়ে পড়েছে মা। কিন্তু ঘুমায়নি। গভীর রাতে শোনে অন্ধকার ঘরে যতটা সম্ভব শব্দ বাঁচিয়ে কাঁথার তলা থেকে বেরুচ্ছে তছি। বেরিয়ে, গিরস্তবাড়ির পালা (পোষা) বিড়ালকে ঠিকঠাক মতো খেতে না দিলে, রাতের অন্ধকারে ক্ষুধার্ত বিড়াল যেমন নিঃশব্দে এসে ঢেকে রান্নাঘরে, যেমন নিঃশব্দে যা পায় তাই খায়, তেমন করে ভাত খাচ্ছে তছি। মাটির বাসনে ভাত সালুন মাখায় এমন সাবধানে, যেন চারির আগা (নখের ডগা) বাসনে লেগে শব্দ না হয়। ভাতের লোকমা মুখে দিয়ে এমন সাবধানে চাবায়, যেন চাবায় না, যেন নিঃশব্দে গিলে ফেলছে ভাত। পানি খাওয়ার সময় গলায় এক ধরনের কোৎ কোৎ শব্দ হয় তছির। সেই শব্দটাও অতি সাবধানে লুকাতে চাইছে সে।
প্রথমে তছিকে মা বলতে চেয়েছে, আন্দারে খাইতে বইলি ক্যা? মাছের কাডাকোড়া গলায় বিনবো! কুপি আঙ্গা।
তারপরই ভেবেছে, বললে ভয় পেয়ে যাবে তছি, দিশাহারা হয়ে যাবে। হয়তো খাওয়া শেষ করবে না, হয়তো পেটের খিদা পেটে নিয়েই, হাত মুখ না ধুয়েই ঢুকে যাবে কাঁথার তলায়। সারারাত কুঁকড়ে থাকবে ক্ষুধার কষ্টে। পাগল মেয়ে কিছুতেই বুঝতে চাইবে না মাকে কোনও ভয় নাই। বুক দিয়ে মা তাকে আগলে রাখবে। আঁচলের তলায় লুকিয়ে আড়াল করবে দুনিয়া থেকে।
তারপর গভীর কষ্টের এককান্না বুক ঠেলে উঠেছে তছির মায়ের। পাগল মেয়েটাকে নিয়ে এমনিতেই ছিল তার বিরাট দুঃখ। বয়স হয়েছে মেয়ের, এই বয়সী মেয়েদের কত আগেই বিয়াশাদি হয়ে যায়। স্বামী সন্তান নিয়ে সুখ দুঃখের সংসার করে তারা। তছির জীবন কখনও তেমন হবে না। কে বিয়া করবে পাগল মেয়েটিকে! জেনেশুনে কে সংসার করবে এই মেয়ের লগে! তছি পাগল একথা চেপে রেখে চালাকি করে যে তার বিয়া দিবে, দুইদিন পর জামাইবাড়ির লোক যখন বুঝে যাবে বউটা তাদের পাগলনি, আর কিছু না ভেবেই বাপের বাড়িতে ফিরত পাঠাবে মেয়েটাকে। লাভের লাভ কিছুই হবে না, টাকা পয়সা যাবে। জামাইকে ঘড়ি আংটি দিতে হবে, কাপড় চোপড় দিতে হবে। নগদ টাকাও দিতে হতে পারে। মেয়ে ফিরত পাঠাবার সময় ওইসব তো আর ফিরত পাঠাবে না তারা! আর একটা ডরও আছে। ভরন্ত শরীরের যুবতী মেয়ে, দুইদিনের স্বামী সহবাসেই যদি পেট হয় তাহলে হবে আর এক যন্ত্রণা। সারাজীবন বাপছাড়া সন্তানকে টানতে হবে পাগল মেয়েটার। সুতরাং তছির বিয়াশাদির কথা ভাবাই যায় না। জীবন কাটবে তার এইভাবেই। মা যতদিন বেঁচে আছে আগলে রাখবে মেয়েকে। যেমন করে পারে ঘর সংসারের মধ্যে আটকে রাখবে। মা মরবে তো পাখির মতন স্বাধীন হয়ে যাবে তছি। যখন যেদিকে ইচ্ছা উড়াল দিবে। কেউ ফিরেও তাকাবে না তছির দিকে। ভাইরা, ভাইর বউ পোলাপানরা যে থাকবে যাকে নিয়ে। কে তাকাবে তছির দিকে! আর মা না থাকলে তছিও গনায় ধরবে না কাউকে। ইচ্ছা হলে বাড়ি ফিরবে, ইচ্ছা হলে ফিরবে না। দিনে দিনে গ্রামের হাটবাজার রাস্তাঘাটে ঘুরে বেডানো, গাছতলায় বসা থাকা পাগলনি হয়ে যাবে। গায়ে কাপড় থাকবে না। দুষ্ট ছেলেরা চাকা মারবে।
তছির মায়ের এইসব দুঃখ চাপা পড়ে গেছে খুনের ঘটনায়। এখন যেন আর দুঃখ বলে কিছু নাই তার, এখন বুকে সারাক্ষণের এক উদ্বেগ। খালি মনে হয় এই বুঝি দেশ গ্রামের লোকে জেনে গেল, এই বুঝি দারোগা পুলিশে জেনে গেল রুস্তম রিকশাআলাকে খুন করেছে তছি। কেন করেছে সেই কথা কেউ শুনতে চাইবে না, বুঝতে চাইবে না। খুন করেছে জানাজানি হওয়ার পরই ধরবে মেয়েটাকে। ধরা পড়ার পর কিছুদিন জেলে থাকবে মেয়ে। তারপর ফাঁসি হবে। এই যে সারাদিন তছির পিছনে লেগে আছে মা, তছিকে আগলে আগলে রাখছে, তখন আর এইসবের দরকার হবে না। রাতেরবেলা। মায়ের একপাশে তছি, আরেক পাশে বারেক, বারেক ঠিকই থাকবে, তছির পাশটা থাকবে খালি।
কিন্তু মেয়েটা যদি না থাকে তাহলে সারাদিন কার পিছনে লেগে থাকবে মা! কাকে আগলাবে! রাতেরবেলা ঘুম ভেঙে যখন দেখবে তছির পাশটা খালি, বিছানা বালি, অন্ধকার ঘরে সেই শূন্যতা কেমন করে সহ্য করবে সে! বুকটা হু হু করবে না তার!
দুইদিন ধরে এই ভাবনায়, এই উদ্বেগে বেঁচেও যেন মরে আছে তছির মা। কাঁথার তলায় নিঃসাড় হয়ে থাকে তছি আর মা বসে থাকে তার মাথার কাছে। কেউ কোনও কথা বললে সহজে বুঝতে পারে না। ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে মানুষটার মুখের দিকে।
তছির মুখের দিকেও তেমন করেই তাকিয়ে ছিল।
তছির হাতে জংধরা পুরানা একখান কেচি (কাটি)। ঘরের মেঝেতে, যেখানে সে বসে আছে তার পাশে চলটা ওঠা, ভাঙাচোরা একখান টিনের বাটি। বাটিতে একটু পানি। বাটির পাশে ছোট্ট এক টুকরা বাংলা সাবান আর কাগজে প্যাচানো একখান ব্লেডের অর্ধেক। জিনিসগুলি দেখেও কেন কিছুই বুঝতে পারল না তছির মা। যেমন তাকিয়ে ছিল তেমন তাকিয়ে রইল মেয়ের দিকে।
মাত্র দুই তিনদিনে মেয়েটা যেন একেবারেই বদলে গেছে, একেবারেই অন্যরকম হয়ে গেছে। চোখ ঢুকেছে গদে (গর্তে)। চোখের কোলে এমন করে কালি পড়েছে, যেন কোনও শিও মায়ের কাজলদানি থেকে চুরি করে কাজল দিতে গিয়ে জায়গা মতো লাগাতে পারেনি কাজল, চোখের সামনে পেটে দিয়েছে। পাগল হলেও অচেনা কেউ তছির মুখ দেখে তাকে পাগল ভাবতে পারবে না। ঢলঢলে, ভরাট সুন্দর মুখ তছির। এই বয়সি গিরস্তঘরের স্বাভাবিক মেয়েদের যেমন হয় তেমন। মাত্র দুইতিন দিনে সেই মুখ ভেঙে গেছে।
