আর কী কথা! বেবাকঐত্তে কইছো!
তারপর নূরজাহানকে ডাকল হামিদা। তুই উট্টা আয়। আইয়া হুইয়া পড়।
নূরজাহানও একই কথা বলল। তুমি ঘুমাও।
তারপর দবিরকে বলল, তোমারে একখান কথা জিগাই বাবা। রাজাকার কয় কারে?
দবির হাসল। তুই জান না? না জাইন্না মাওলানা সাবরে কইলি কেমতে?
মাইনষের কাছে হুনছি মওলানা সাবে রাজাকার। হুইন্না বুজছি রাজাকার জিনিসটা খারাপ। এর লেইগাঐ কইছি।
আসলেঐ রাজাকাররা খারাপ। তর জন্মের আগে এই দেশটা বাংলাদেশ আছিলো, আছিল অন্য একখান দেশ। হেই দেশের নাম পাকিস্তান। তয় পাকিস্তান আছিলো আবার দুইখান। পশ্চিম পাকিস্তান আর পূর্ব পাকিস্তান। বাংলাদেশটা আছিলো পূৰ্ব্ব পাকিস্তান। পশ্চিম পাকিস্তান আছিল ম্যালা দূরে, হিন্দুস্তান ছাড়াইয়া। ঐ অত দূর থিকা আইয়া পশ্চিম পাকিস্তানীরা আমগো শাসন করত, আমগো দেশের মাইনষের ওপরে অইত্যাচার করতো আর আমগো দেশের ধন সম্পদ টেকা পয়সা বেবাক লইয়া যাইতো। অগো ভাষা অইলো উরদু আর আমগো বাংলা। একবার আমগো ভাষাড়াও কাইরা নিতে চাইছিলো অরা। পারে নাই। ঢাকার রাস্তায় গুল্লি কইরা মানুষ মারছিলো। এই হগল দেইক্কা একাত্তোর সালে স্বাধীনতা যুইদ্ধের ডাক দিছিলো শেকসাবে, শেক মজিবর রহমান সাবে। পাকিস্তানীগো লগে বাঙ্গালীর যুইদ্ধ লাইগা গেছিলো। তিরিশলাক বাঙ্গালী শহীদ অইছিলো হেই যুইদ্ধে। নয়মাস চলছিলো যুইদ্ধ, তারপর দেশ স্বাদীন অইলো। বাংলাদেশ অইলো। স্বাধীন করনের লেইগা যারা যুইদ্ধ করতাছে তারা অইলো মুক্তিযোদ্ধা। আর যারা স্বাধীনতা চায় নাই, বাঙ্গালী অইয়াও পাকিস্তানীগো পক্ষে আছিলো, বাঙ্গালীগো মারছে, মুক্তিযোদ্ধাগো মারছে, মা বইনের ইজ্জত নষ্ট করতাছে, তারা অইলো রাজাকার। যুইদ্ধের সময় মাওলানা সাবে এই কাম করছে।
নূরজাহান বলল, বুজছি। তাইলে তো মাওলানা সাবে রাজাকারঐ।
হ। তয় অহন আর কেঐ তারে রাজাকার কয় না।
ক্যা?
ডরে। রাজাকারগো অহন ম্যালা জোর। মাওলানা সাবরে দেইক্কা বোজচ না?
হ বুজি। ও বাবা, মাওলানা সাবের লাহান রাজাকার কি বাংলাদেশে আরও আছে।
আছে, ম্যালা রাজাকার আছে। দেশটার মইদ্যে অহনও যে অশান্তি এই হগল অশান্তি করতাছে রাজাকাররা।
এত রাজাকার বাইচ্চা থাকলো কেমতে? দেশ যহন স্বাদীন অইলো, মুক্তিযোদ্ধারা রাজাকারগো মারে নাই।
বেবাকরে মারতে পারে নাই। ম্যালা রাজাকার এইমিহি ঐমিহি পলাইয়া গেছিলো গা। পাঁচ ছয় বচ্ছর পর ধীরেসুস্তে ফিরত আইছে। আইয়া আবার আগের লাহান জোর পাইয়া গেছে।
কেমতে।
এই হগল তুই বুজবি না মা। রাজনীতির প্যাঁচ।
ও বাবা, স্বাধীনতার পর মান্নান মাওলানাও পলাইছিলো?
হ।
কই?
হেইডা কইতে পারি না।
ফিরত আইছে কবে?
ম্যালাদিন বাদে। তহন মুক্তিযোদ্ধারা তারে ধরে নাই ক্যা? মাইরা হালায় নাই ক্যা?
ততদিনে মুক্তিযোদ্ধাগো জোর কইম্মা গেছে। রাজাকারগো জোর অইয়া গেছে। বেশি। কেমতে মারবো?
নূরজাহান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ইস মান্নান মাওলানারে যুদি মাইরা হালাইতো, মান্নান মাওলানা যুদি না থাকতো তাইলে আমগো গেরামডা ঠাণ্ডা থাকতো। বহুত ভাল থাকতো গেরামডা।
দবির উদাস গলায় বলল, মাওলানা সাবের লাহান কোনও রাজাকারই যুদি না থাকতো তাইলে পুরা দেশটাই ঠাণ্ডা থাকতো। বহুত ভাল থাকতে দেশটা।
ঠিক তখনই শীতরাত্রির গভীর নির্জনতা ভেঙে কোন গৃহস্থবাড়ির মাটির খোয়াড়ে বসে বাগ দিল একটা মোরগ। সেই বাগ ছড়িয়ে গেল চারদিকে। তারপরই যেন জেগে উঠল গ্রাম গৃহস্থের প্রতিটির বাড়ির খোয়াড়বন্দি মোরগ। যে যার মতো করে গলা খুলল, বাগ দিতে লাগল। মোরগদের নিয়মই এই, একজন গলা খুললে, একজনের সাড়া পেলে সবাই সাড়া দেয়। শিয়ালদের মতো।
মোরগের বাগ শুনে নূরজাহান একটু চঞ্চল হল। হাঃ হায় রাইত পোয়াইয়া গেলনি? ও বাবা, ঘুমাইবা না তুমি?
দবির মৃদু হাসল। নাগো মা, আর ঘুমাণের টাইম নাই। অহনঐ বাইর অওন লাগবো।
চৌকির ওপর কাঁথা মুড়া দিয়ে তখন বেড়োরে ঘুমাচ্ছে হামিদা।
১.৬১-৬৫ তছি ফিসফিস করে বলল
১.৬১
তছি ফিসফিস করে বলল, তুমি আমার চুলডি কাইট্টা দেও মা।
কথাটা বুঝতে পারল না তছির মা। দুইদিন ধরে খুবই আনমনা সে, খুবই চিন্তিত। প্রথমে তছির মুখে, তারপর আবদুলের মুখে ঘটনা শোনার পর থেকে তছির চিন্তায় না খেতে পারে, না ঘুমাতে পারে। একপাশে বারেক আর একপাশে তছিকে নিয়ে শুয়ে থাকে ঠিকই ঘুম আসে না।
বারেক ছেলেমানুষ, সারাদিন টো টো করে ঘোরে, শোয়ার লগে লগেই ঘুমে কাদা হয়ে যায়। আগে তছিও ছিল বারেকের মতোই। শোয়ার পরই ঘুমিয়ে যেত। যে রাতে মাকে ডেকে তুলে ঘটনাটা বলল সে রাত থেকে ঘুমায় না। মোটা কাঁথায় শরীর ঢেকে এমনভাবে শুয়ে থাকে যেন গভীর ঘুমে ডুবে আছে। দুনিয়াদারির খবর নাই। কানের কাছে টিকারা (গয়না নৌকায় ব্যবহারের ঢোল বিশেষ) বাজালেও যেন এই ঘুম ভাঙবে না।
কিন্তু মা জানে, তছি আসলে ঘুমায় না। তছি আসলে সংসার থেকে, মানুষের কাছ থেকে নিজেকে আড়াল করে রাখছে। একটু শব্দ সে করতে চাইছে না, কোনও ভাবেই জানাতে চাইছে না সে আছে এই সংসারে, সে আছে এই ঘরে! সারাদিন মোটা কাঁথার তলায় নিজেকে আসলে লুকিয়ে রাখছে তছি। যেন কাথা থেকে বের হলেই লোকে জেনে যাবে রিকশাআলা রুস্তমকে খুন করেছে সে। দারোগা পুলিশ এসে ধরবে তাকে, হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে যাবে। তারপর খুনের দায়ে ফাঁসি হবে তছির।
