তারপরই ভয় পেয়ে গেল দবির। বুকটা হিম হয়ে এল তার। মেয়েমানুষের এত সাহস ভাল না। তাও নূরজাহানের মতো কিশোরী মেয়ের, যেখানে সেখানে ঘুরে বেডানো মেয়ের। মান্নান মাওলানা যে ধরনের লোক, মেয়েটার কী না কী ক্ষতি করে দেয়! বয়স যাই হোক, গায়ে এখনও শুয়োরের মতন শক্তি তার। লজ্জা শরম কিছুই নাই। মান্নান মাওলানা পারে না এমন কাজ দুনিয়াতে নাই। গ্রামের কোন নির্জনে পেয়ে চেপে ধরবে নূরজাহানের মুখ। নিজে না পারলে লাগিয়ে দেবে ছেলেকে। সর্বনাশ হয়ে যাবে মেয়েটার।
এসব ভেবে নিজের অজান্তেই মেয়েকে বুকের কাছে চেপে ধরল দবির। ভয়ার্ত গলায় বলল, এইডা তুই ভাল করচ নাই মা, এইডা তুই ভাল করচ নাই।
দবির গাছির হঠাৎ উত্তেজনায় নূরজাহান অবাক হল। কান্নার আর একটা হেচকি তুলল। তারপর রাগ অভিমানের গলায় বলল, ভাল করুম না ক্যা? আমার সামনে আমার বাপের নাম খারাপ কইরা কইবো ক্যা? আতাহার দাদার সামনে তার বাপরে তুমি যদি কও মননাইন্না, হেয় তোমারে ছাইড়া দিবো!
দবির কাতর গলায় বলল, অরা আর আমরা এক না মা
এক না ক্যা! অগ বাপ বাপ, আর আমগো বাপ বাপ না!
মেয়ের রাগটা বুঝল দবির, অভিমানটা বুঝল। বুঝেও অন্যভাবে বুঝ দেওয়ার চেষ্টা করল মেয়েকে। মেয়ের মাথায় পিঠে হাত বুলাতে বুলাতে বলল, এই দুইন্নাইতে যাগো যত জাগাজমিন, যাগো যত টেকা পয়সা, তাগো তত জোর। জোর তারা দেহায় গরিব মাইনষের লগে, গরিব মাইনষের উপরে। নিজেগো লাহান জাগাজমিনআলা মাইনষের লগে, টেকা পয়সাআলা মাইনষের লগে দেহাইতে পারে না। মাওলানা সাবের জাগাজমিনের আকাল নাই, টেকা পয়সার আকাল নাই। একপোলা থাকে জাপানে। মাসে লাক লাক টেকা পাড়ায়। আরেক পোলা অইলো গুণ্ডাপাণ্ডা, ডাকাইত। দুইন্নাইর কেরে ডরায় না। এর লেইগা মান্নান মাওলানার জোরের কমতি নাই। এই জোরডাই হেয় আমগ লাহান গরিব মাইনষের লগে দেহায়। তয় জোরের উপরে দিয়াও তো জোর আছে। খাইগো বাড়ির মাইনষের সামনে কইলাম মান্নান মাওলানা আবার মিচাবিলাই (ভেজা বিড়াল) হইয়া থাকে। খাইগো টেকা পয়সা জাগাজমিন মান্নান মাওলানার থিকা অনেক বেশি। তারা মান্নান মাওলানারে গনায় ধরে মা।
নূরজাহান ঝাঁঝাল গলায় বলল, গনায় আমিও ধরতাম না যদি আল্লায় খালি আমারে পোলা বানাইতো।
দবির হাসল। পোলা বানাইলেতোঐত্তো অইতো না। জাগাজমিন, টেকা পয়সাও থাকন লাগতো।
না থাকলেও অইতো। পোলা অইলে শইল্লে বেশি শক্তি থাকতো আমার। যে কোনও মাইনষের লগে মারামারি করনের ক্ষমতা থাকতো। জাগাজমিন, টেকা পয়সার জোর আমি শইল দিয়া ঠেকাইতাম। কাশেম কাকারে যেমতে ইচ্ছা অমনে মারছে। মাওলানা সাবে। কাশেম কাকার জাগায় আমি অইলে মাইর খাইতাম না। মইরা গেলে যাইতাম তাও মাওলানা সাবরে মাইর দিয়া দিতাম। তোমার জাগায়ও যুদি আমি অইতাম বাবা, মাওলানা সাবের বাইত্তে খাড়াইয়া রসের দাম তার কাছে থিকা আদায় কইরা আনতাম। আমার গরদানে ধাক্কা দিলে আমিও তার গরদানে ধাক্কা দিতাম। বেবাক কথা হোননের পর আমার খালি একটাই দুক্কু লাগছে বাবা, আল্লায় আমারে পোলা বানাইলো না ক্যা! আল্লায় আমারে মাইয়া বানাইলো ক্যা!
মেয়ের মাথায় পিঠে আবার হাত বুলাতে লাগল দবির। নরম মায়াবি গলায় বলল, এই হগল দুক্কু করণ ভাল না মা। আল্লায় যা করে মাইনষের ভালর লেইগাই করে।
একটু থেমে বলল, অহন থিকা বাইতথন তুই ইট্টু কম বাইর অবি মা। একলা একলা যেহেনে ওহেনে যাবি না। মাওলানা সাবের লগে দেহা অইলেও তার মিহি চাবি না। তার লগে কথা কবি না। খবরদার তারে কোনওদিন আর গাইলইল দিচ না। রাজাকার কইচ না। তাইলে কইলাম সব্বনাশ অইয়া যাইবো। তাইলে কইলাম আর বাচন নাই। এইবার খালি রসের দামডা গেছে, গাইল খাইছি, গরদানে ধাক্কা খাইছি, আবার যুদি মাওলানা সাবরে তুই কিছু কচ তাইলে আমারে হেয় জানে মাইরা হালাইবো। তর যে কোন সর্বনাশ করবো তুই চিন্তাও করতে পারবি না! সাবদান মা, সাবদান। আমারে মারিচ না, নিজের সব্বনাশ করিচ না।
নূরজাহান কথা বলল না। কান্নার রেশ কেটে গেছে তার, বন্ধ হয়েছে হেচকি। চৌকিতে শুয়ে আছে মা, খানিক আগে কথা বলছিল, এখন জেগে আছে না ঘুমিয়ে কে জানে। নূরজাহানের মনে এখন ঘুরপাক খাচ্ছে বাবার কথাগুলি। আজকের এইরাত দুপুরের আগে কখনও এমন অনুনয়ের স্বরে নূরজাহানের লগে কথা বলেনি বাবা। এমন কাতর হয়নি বেঁচে থাকার জন্য, এমন কাতর হয়নি মেয়ের সর্বনাশ ঠেকাতে।
মান্নান মাওলানার ওপর জমে থাকা রাগ ক্রোধ তারপর পানি হয়ে গেল নূরজাহানের। রাগ ক্রোধের জায়গায় জমে উঠল গভীর এক দুঃখ বেদনা। দীর্ঘ একখান শ্বাস ফেলে নূরজাহান বলল, আল্লার দুইন্নাইডা জানি কেমুন বাবা! দুইন্নাইর মানুষটি জানি কেমুন! কেঐ খালি মারে, কেঐ খালি মাইর খায়। তয় তোমার কথাডি আমি মনে রাখুম বাবা। মাওলানা সাবের মিহি কোনও দিন চক্কু উড়াইয়া চামু না। ভাল মন্দ কিছুই কোনওদিন তারে আর কমু না।
দবির কথা বলবার আগেই চৌকির ওপর পাশ ফিরল হামিদা। ঘুমজড়ান গলায় স্বামীকে বলল, এলা হুইয়া পড়ো। রাইত বিয়ান অইয়া আইলো। ইট্টু বাদেই তো আবার উঠবা!
দবির বলল, তোমার ঘুম তুমি ঘুমাও আমার ঘুম আইতাছে না। আমি মাইয়াডার লগে কথা কই।
