নূরজাহান কথা বলতে পারল না। বাবার বুকের কাছে মুখ গুঁজে ঙো ঙো করে কাঁদতে লাগল।
হামিদা শুয়েছিল চৌকির ওপর। কান্নার শব্দে হঠাৎ করেই ঘুম ভাঙল তার। ধরফর করে বিছানায় উঠে বসল। কী অইছে, আঃ কে কান্দে
দবির শান্ত গলায় বলল, নূরজাহান।
ক্যা?
কইতে পারি না।
কুনসুম উটলো নূরজাহান? কুনসুম গেল তোমার ওহেনে?
কী জানি! ঘুমের মইদ্যে উদিস পাইলাম আমার গরদানে কে হাইততাইতাছে আর নিঃসাড়ে কানতাছে। বোজলাম নূরজাহান। তারবাদে উটছি।
আবার মেয়ের দিকে মন দিল দবির। কী অইছে ক আমারে। কানতাছস ক্যা?
নূরজাহান তবু কথা বলে না, নূরজাহান তবু কাঁদে।
মেয়ের মাথায় পিঠে হাত বুলাতে বুলাতে দবির বলল, আমি থাবড় মারছিলাম দেইক্কা কানতাছো মা! হেইডা তো ম্যালাদিন অইলো! এতদিন পরের কান্দন আইজ কানতাছে! এই রাত দোফরে হেই দুক্কে আইজ কানতাছো?
নূরজাহান কাঁদতে কাঁদতে বলল, না।
তয়?
আমি আগে হুনি নাই, আইজ হুনছি।
কী হোনছো তুমি? কী হোনছো মা?
মাওলানা সাবের কথা।
কী করছে মাওলানা সাবে?
তোমার বকাবাজি করতাছে, তোমার গরদানে ধাক্কা দিছে। আমার লেইগা বহুত অপমান কাছে তোমারে।
দবির একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। কী করুম মা! তকদিরে অপমান লেখা আছিলো, অইছি।
আমার লেইগা, বেবাক আমার লেইগা অইছে।
দবির কথা বলল না।
চৌকিতে বসা হামিদা বুঝে গেল বাপের অপমানের কথা শুনে ঘুমাতে পারেনি নূরজাহান। মায়ের পাশ থেকে উঠে বাপের কাছে চলে গেছে। মানুষটার ঘাড়ে ধাক্কা দিয়ে বাড়ির নামায় ফেলে দিয়েছিল মান্নান মাওলানা, এই জন্যে তার ঘাড়ে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল নূরজাহান। বাড়িতে এসে হামিদাকে কথাগুলি বলার পর স্বামীর অপমানের দৃশ্যটা যেমন করে চোখের ওপর দেখতে পেয়েছিল হামিদা, যে দৃশ্য দেখে বুক ফেটে গিয়েছিল তার, চোখ ফেটে গিয়েছিল, স্বামীর মাথা বুকে জড়িয়ে ধরে যেমন করে কেঁদেছিল সে, নূরজাহানেরও বুঝি তাই হয়েছে। বাবার ঘাড়ে ধাক্কা দিয়েছেন মান্নান মাওলানা, নিশ্চয় ঘাড়ে খুব ব্যথা পেয়েছে বাবা, এই ভেবে নিশিরাতে উঠে তার ঘাড়ে এমন করে হাত বুলাচ্ছিল সে। সেই ফাঁকে বাবার অপমানের দৃশ্য চোখে দেখে কেঁদে বুক ভাসিয়েছে। বাপ মায়ের জন্য অতিরিক্ত টান থাকলে, অতিরিক্ত মায়া মমতা থাকলে এমনই তো হয় সন্তানের! বাইরে থেকে যা-ই মনে হোক ভিতরে ভিতরে নূরজাহান খুব নরম মনের মেয়ে। মানুষের জন্য তীব্র মায়া মমতা তার।
তারপরই আর একটা কথা মনে হল হামিদার। মান্নান মাওলানার বাড়ি থেকে অপমান হয়ে আসার পর, নূরজাহানকে থাবড় মারার পর বাবা মেয়ের মধ্যে যে অভিমান জমেছিল আজ এই রাতদুপুরে তা ভেঙে যাচ্ছে। মেয়ের চোখের পানিতে, বাপের আদরে সোহাগে বরফের মতো জমে ওঠা অভিমান গলে যাচ্ছে। এক সংসারের তিনজন মানুষের দুইজনই যদি নিজেদের মান অভিমান নিয়ে থাকে, কেউ কথা বলে না কারও লগে, সেটা হয় বেকায়দার সংসার। তৃতীয় মানুষটা থাকে কষ্টে। সে পড়ে যায় দুইজনের মাঝখানে।
এইদিক যেতে পারে সে, না ওইদিক। হামিদা ছিল সেই অবস্থায়। আজ সেটা ভেঙে গেল। এখন বাপ মেয়ে যত ইচ্ছা আদর আল্লাদ করুক, যত ইচ্ছা রাগ দুঃখ করুক হামিদার কী! সে এখন নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারে।
কাঁথা মুড়া দিয়ে হামিদা তারপর শুয়ে পড়ল। তবে কান খাড়া করে রাখল বাপ মেয়ের দিকে। কী কথা বলে তারা, কেমন করে দূর হয় দুইজন মানুষের অভিমান, জানতে ইচ্ছা করে তার!
ততক্ষণে কান্না থেমে গেছে নূরজাহানের। অনেকক্ষণ গুঙিয়ে গুঙিয়ে কান্নার পর কান্না থামলেও তার রেশ থাকে। থেকে থেকে হেচকি মতন ওঠে। এখন তেমন উঠছে নূরজাহানের। গলা আছে রুদ্ধ হয়ে। তবু জড়ান অস্পষ্ট গলায় কথা বলছে সে। ও বাবা, মাওলানা সাবে বহুত জোরে ধাক্কা দিছে তোমার গরদানে? তুমি খুব দুক্কু পাইছো, না? দেহি কোন জাগায় ধাক্কা দিছে।
বাবার ঘাড়ের কাছে আবার হাত বুলায় নূরজাহান। আমি বুজি নাই, আমি কিছু বুজি নাই বাবা! কোনওদিন দেহি নাই তুমি আমার শইল্লে হাত উডাইছো! রস বেইচ্চা বাইত্তে আইয়া কথা নাই বার্তা নাই থাবড় মারলা আমারে। শইল্লে দুক্কু পাইলাম কি পাইলাম না উদিস পাইলাম না। মনডা কেমুন জানি অইয়া গেল।
মেয়ের কথা শুনে দীর্ঘশ্বাস ফেলল দবির। কোনও কোনও মাইর আছে শইল্লে লাগলেও শইল্লে তা লাগে না, লাগে মনে। মাওলানা সাবে যে ধাক্কাডা দিছে ধাক্কাডা গরদানে লাগে নাই আমার, লাগছে মনে। এর লেইগাঐ বাইত্তে আইয়া থাবড়ডা তরে মারলাম। অতজোরে একখান থাবড় খাইয়াও তুই কানলি না। আমার মিহি চাইয়া রইলি। তারপর চুপচাপ বাইতথন বাইর অইয়া গেলি। আমি বোজলাম থাবড় তর শইল্লে লাগে নাই, লাগছে মনে। শইল্লের মাইর দুই একদিনের মইদ্যে ভুইল্লা যায় মাইনষে। মনের মাইর ভোলে না।
একটু থেমে দবির বলল, মাওলানা সাবরে তুই রাজাকার কইছিলি ক্যা?
আবার একখান হেচকি তুলল নূরজাহান। তোমার লেইগা।
দবির খুবই অবাক হল। আমার লেইগা?
হ।
ঘটনা খুলে বলল নূরজাহান। শুনে স্তব্ধ হয়ে গেল দবির। বাপের নাম বিকৃত করে বলেছে বলে এমন জাঁদরেল লোক মান্নান মাওলানার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে ছিল নূরজাহান! সারা গ্রাম যার ভয়ে কাঁপে, যাকে তোয়াজ করে, যার মুখের সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলার সাহস নাই কারও, এতটুকু একটা মেয়ে দাঁড়িয়েছে তার মুখামুখি! তাও এই সামান্য কারণে। যে কথা গ্রামের সাহসী মানুষরা পর্যন্ত এখন আর বলার সাহস পায় না, গ্রামের মুক্তিযোদ্ধারা পর্যন্ত চেপে রাখে যে কথা, নির্ধিধায় সেইকথা বলে দিয়েছে। এই সাহস মেয়েটা পেল কোথায়!
