খোঁচাটা হজম করল ছনুবুড়ি। যেন বউর সঙ্গেই কথা বলছে এমন স্বরে বলল, কে কইছে চোক্কে দেহি না! অল্পবিস্তর দেহি।
বানেছা বলল, আইজ যে অহনতরি বাইত্তে। আইজ যে অহনতরি পাড়া বেড়াইতে বাইর অয় নাই?
বাইর অইতাছিলাম।
তয়?
ছনুবুড়ি বুঝে গেল বানেছার আওয়াজটা ভাল না। এখনই কাইজ্জাকিত্তন লাগাবে। বুড়ি আর বানেছার উদ্দেশ্যে কথা বলল না। হামেদকে বলল, ও হামেদ, আমারে ইট্টু বউয়া দে। বিয়ানে আমারও তো খিদা লাগে!
হামেদ কথা বলবার আগেই বানেছা তেড়ে উঠল। ইস একদিন পোলাপান লইয়া ইট্টু বউয়া খাইতে বইছি তাও মাগির সইজ্জ অয় না। অরে দেওন লাগবো এক থাল! এই মাগি, বাইর অইলি বাইত থন!
বানেছার কথা শুনে ছনুবুড়িও তেড়ে উঠতে গিয়েছিল, কী ভেবে সামলাল নিজেকে। গলা নরম করে সরাসরি বানেছাকে বলল, এমুন কইরো না বউ। কয়দিন পর আহুজ পড়বো, এই সমায় ময়মুরব্বিগ বড়দোয়া (বদদোয়া) লইতে অয় না। একবার আহুজ পড়ন আর একবার মউতের মুক থিকা ফিরত আহন এক কথা।
একথায়ও বানেছার মন গলল না। আগের মতোই রুক্ষ গলায় বলল, এত আল্লাদ দেহানের কাম নাই। মউতের মুখে আমি পোত্যেক বচ্ছরঐ যাই, আবার ফিরতও আহি। তোমার বড়দোয়ায় আমার কিচ্ছু অইবো না। হকুনের দোয়ায় গরু মরে না। তাইলে দুইন্নাইতে আর গরু থাকতো না। খালি হকুনঐ থাকতো।
নয় দশ বছরের হামেদ তখন খাওয়া শেষ করেছে। ছেলেটা আমুদে স্বভাবের। এই বয়সেই বয়াতীদের গান শুনে সেই গান ভাল গাইতে পারে। কয়েকদিন আগে তালুকদার বাড়িতে গিয়ে খালেক না মালেক দেওয়ানের দেহতত্ত্বের গান শুনে আসছে। স্মরণশক্তি ভাল। একবার দুইবার শোনা গান একদম বয়াতীদের মতো করেই গায়। মা দাদীর কথা কাটাকাটির মধ্যেও গলা ছেড়ে গান শুরু করল সে।
মালো মা ঝিলো ঝি বইনলো বইন করলাম কী
রঙ্গে ভাঙ্গা নৌকা বাইতে আইলাম গাঙ্গে।
নাতির গান শুনে ক্ষুধার কষ্ট আর বউর করা অপমানে বহুকাল পর বুকের অনেক ভিতর থেকে ছনুবুড়ির ঠেলে উঠল গভীর কষ্টের এক কান্না। পিড়ায় বসে এখন যদি কাঁদে ছনুবুড়ি ওই নিয়েও কথা বলবে বানেছা। হয়তো আরও অপমান করবে। অপমানের ভয়ে চোখে পানি নিয়েই উঠে দাঁড়াল ছনুবুড়ি। বাড়ির নামার দিকে হাঁটতে লাগল। ঘরের ভিতর হামেদ তখন গাইছে,
নৌকার আগা করে টলমল
বাইন চুয়াইয়া ওঠে জল
কত ভরা তল হইলো এই গাঙ্গে
ভাঙ্গা নৌকা বাইতে আইলাম গাঙ্গে।
.
১.০৯
শক্ত করে কুট্টির হাত ধরেছেন মিয়াবাড়ির কর্ত্রী রাজা মিয়ার মা। ধরে খুবই সাবধানে বড়ঘরের সিঁড়ি ভাঙছেন। একটা করে সিঁড়ি ভাঙছেন, একটু দাঁড়াচ্ছেন। দাঁড়িয়ে গাভীন গাইয়ের শ্বাস ফেলার মতো করে শ্বাস ফেলছেন। সিঁড়ি ভেঙে ওঠার সময় মানুষ না হয় ক্লান্ত হয়, নামার সময়ও যে হয়, তাও মাত্র চার পাঁচটা সিঁড়ি, কুট্টি ভাবতেই পারে না। মোডা অইলে যহন এতই কষ্ট তাইলে মোড়া অওনের কাম কী! কে কইছে এত মোডা অইতে!
শেষ সিঁড়ি ভেঙে মাটিতে পা দিলেন রাজা মিয়ার মা, স্বস্তির শব্দ করলেন। যেন পুলসুরাত পেরিয়ে আসছেন এমন আরামদায়ক ভাব। তারপরই কুট্টির মুখের দিকে তাকালেন, বাজখাঁই গলায় বললেন, জলচকি দিছস?
কুট্টি বলল, দিছি বুজান। জলচকি না দিয়া আপনেরে ঘর থিকা বাইর করুমনি? আমি জানি না উডানে নাইম্মা খাড়ইতে পারেন না আপনে! লগে লগে বহন লাগে। এর লেইগা আগেঐ জলচকি দিছি, তারবাদে আপনেরে ঘর থিকা বাইর করছি।
ভাল করছস। তায় আমি তো আইজ উডানে বহুম না।
বলেই কুট্টির কাঁধে কলাগাছের মতো একখানা হাত রাখলেন। শরীরের ভার খানিকটা ছেড়ে দিলেন। সেই ভারে কুট্টি একটু কুঁজা হল। বিশ একুশ বছরের কাহিল মেয়ে কুট্টি, তার পক্ষে এরকম একখানা দেহের একটুখানি ভারও বহন করা মুশকিল।
কুট্টির ইচ্ছা হল কথাটা বুজানকে বলে। কিন্তু বলার উপায় নাই। রাজা মিয়ার মার দেহ মেজাজ দুইটাই এক রকম। রাগ করতে পারেন এমন কোনও কথা মুখের উপর, আড়ালে আবডালে বললে, সেই কথা যদি তার কানে যায় তাহলে আর কথা নাই। লগে লগে বাড়ি থেকে বের করে দেবেন। তার আগে যে গালিগালাজ করবেন সেই গালিগালাজ শুনে গর্তে গরম পানি ঢেলে দেওয়ার পর যেমন ছটফটা ভঙ্গিতে বের হয় সাপ তুরখুলা (এক ধরনের বড় পোকা) ঠিক তেমন করে কবর থেকে বের হবে কুট্টির সব মরা আত্মীয়। তাতে অবশ্য কুট্টির কিছু আসবে যাবে না কিন্তু এই বাড়ির বান্ধা কাজ হারালে কুট্টির কোথাও দাঁড়াবার জায়গা থাকবে না। না খেয়ে মরণ। আর ক্ষুধার কষ্ট কী যেনতেন কষ্ট! সব কষ্ট সহ্য করা যায় ক্ষুধার কষ্ট সহ্য করা যায় না। সেই কষ্টের চেয়ে এই ভার বহন করা হাজার গুণ ভাল।
কুঁজা শরীরেও মুখটা হাসি হাসি করল কুট্টি। বলল, আমি জানি আপনে আইজ কই বইবেন।
রাজা মিয়ার মাও হাসলেন। ক তো কো?
আমরুজ (জামরুল) তলায়।
হ ঠিকঐ কইছস।
এর লেইগা জলচকিডা আমরুজ তলায় দিছি।
এই বাড়ির রান্নাঘর উঠানের একেবারে মাঝখানে। দক্ষিণের ভিটায় দোতালা বিশাল একখানা টিনের ঘর। ঘরটার নিচের তলাও পাটাতন করা। দুইতলাতেই রেলিং দেওয়া বারান্দা। দূর থেকে গাছপালার মাথা ছাপিয়ে মিয়াবাড়ির দোতালা ঘর দেখা যায়।
বাড়ির পশ্চিম আর উত্তরের ভিটায় আছে আরও দুইখান পাটাতন ঘর। সারাবছর তালামারা থাকে ঘর দুইটা। এতদিন হল এই বাড়িতে আছে কুট্টি এক দুইবারের বেশি ঘর দুইটা খুলতে দেখে নাই। বন্ধই যদি থাকবো ঘর তাইলে রাখনের কাম কী?
