তিনখান ঘরের প্রত্যেকটার থেকে পাঁচসাত কম করে জায়গা হবে বাদ দিয়ে পুবের ভিটায় রান্নাঘর। রান্নাঘর অবশ্য কায়দার। দেশ গ্রামের রান্নাঘরের লগে মিলে না। মাথার ওপর টিনের চালা নাই, টালির ছাদ দেওয়া।
এই রান্নাঘরের পিছনেই মাঝারি মাপের একটা জামরুল গাছ। বাড়ি এলে কোনও কোনও সময় জলচৌকি পেতে জামরুল তলায় বসে আরাম পান রাজা মিয়ার মা। শীতকাল, গরমকাল সব সময়ই দেহে তার গরম ভাব। দুই চারকদম হাঁটলেই ঘামে বজবজ করে শরীর। ভিতর থেকে ঠেলে বের হয় গরম। জামরুল তলায় বসলে গরম কমে। জায়গাটা সব সময়ই ঠান্ডা। জামরুলের পাতায় ঝিরিঝিরি হাওয়া সব সময়ই থাকে। আজ সকালে, বেশ খানিকটা বেলা হয়ে যাওয়ার পর কুট্টির কাঁধে ভর দিয়ে জামরুল তলার দিকেই যাচ্ছেন রাজা মিয়ার মা। গাভিন গাইয়ের মতন দেহ বলে তাঁর হাঁটাচলা খুবই ধীর। চোখের পলকে যাওয়া যায় এমন জায়গায় যেতেও সময় লাগে।
এখনও লাগছে।
তবে হাঁটতে হাঁটতে কথা বলছেন রাজা মিয়ার মা। গলার আওয়াজও তার দেহ মেজাজের মতোই। ভালমন্দ যে কোনও কথা বললেই কলিজা কাঁপে। অনেকদিন ধরে এই বাড়িতে থাকার পরও, এখনও কলিজা কাঁপছে কুট্টির। বুজান বাড়িতে এলে সারাক্ষণই আতঙ্কে থাকে সে। ভিতরে ভিতরে অপেক্ষা করে কবে বাড়ি থেকে যাবেন তিনি, কবে হাঁপ ছেড়ে বাঁচবে কুট্টি।
রাজা মিয়ার মা বাড়িতে না থাকলে বাড়ির মালিক কুট্টি। বড়বুজান আছেন, বাঁধা কামলা আছে আলফু। তাতে কিছু যায় আসে না। বড়বুজান বয়সের ভারে পঙ্গু। সারাক্ষণই শুয়ে আছেন বিছানায়। হাঁটাচলা করা তো দূরের কথা, বিছানায় উঠে বসতে পর্যন্ত পারেন না। কথা বলেন হাঁসের ছায়ের মতো চিঁচিঁ করে। আর আলফুকে তো মানুষই মনে হয় না কুট্টির। মনে হয় গাছপালা, মনে হয় ঝোপঝাড়, গিরস্ত বাড়ির সামনে নাড়ার পালা। জ্যাতা (জ্যান্ত) একজন মানুষকে যে কেন এমন মনে হয় কুট্টির! বোধহয় কথা আলফু বলে না বলে। বোধহয় ভালমন্দ সব ব্যাপারেই আলফু নির্বিকার বলে। মুখে ভাষা থাকার পরও আলফু বোবা বলে।
রাজা মিয়ার মা বললেন, বুদ্দিসুদ্দি তর ভালঐ কুট্টি, তারবাদেও সংসার করতে পারলি না ক্যা?
এমনিতেই বুজানের দেহের ভারে কুঁজা হয়ে গেছে কুট্টি, মনে মনে ভাবছে কখন ফুরাবে এইট্টুকু পথ, কখন বুজানকে জলচৌকিতে বসিয়ে হাঁপ ছেড়ে বাঁচবে সে, তার উপর আথকা এরকম একখানা কথা, তাও বাজখাঁই গলায়, কুট্টি ভড়কে গেল। কথাটা যেন বুঝতে পারল না এমন গলায় বলল, কী কইলেন বুজান?
এত কাছে থেকেও তার কথা কেন বুঝতে পারেনি কুট্টি এই ভেবে রাজা মিয়ার মা একটু রাগলেন। গলা চড়ল তাঁর। এই ছেমড়ি (ছুঁড়ি), কানে কম হোনচনি?
না।
তয়?
হুনছি ঠিকই।
কথার তাইলে জব দেচ না ক্যা?
ততক্ষণে জামরুল তলায় পৌঁছে গেছে তারা। জায়গা মত পেতে রাখা জলচৌকিতে রাজা মিয়ার মাকে ধরে বসাল কুট্টি। কুট্টির মতো তিন কুট্টি বসতে পারে যে চৌকিতে সেই চৌকিতে একা বসার পরও চৌকির চারদিক দিয়ে উপচে পড়লেন রাজা মিয়ার মা। ব্যাপারটা খেয়াল করল না কুট্টি। বুজানকে বসিয়ে দেওয়ার পরই ক্লান্তির শ্বাস ফেলল। হাসিমুখে বলল, এমতেই হতিনের সংসার তার মইদ্যে দেয় না ভাত। খিদার কষ্ট আমি সইজ্জ করতে পারি না বুজান।
বাড়ির নামার দিকে অনেকগুলি আমগাছ নিবিড় হয়ে আছে। সেদিকে তাকিয়ে রাজা মিয়ার মা বললেন, বেডা করতো কী?
গিরস্তালী করতো। ছোড গিরস্ত। শিমইল্লা বাজারে মদিদোকানও আছিলো।
তয় তো অবস্তা ভাল। ভাত দিতে পারতো না ক্যা?
সংসারডা বড়। আগের ঘরের ছয়ডা পোলাপান। ভাই বেরাদর আছে চাইর পাঁচজন।
বেডার তো তাইলে বস (বয়স) অনেক।
কুট্টি হাসল। হ আমার বাপের বইস্যা।
এমুন বেডার লগে মা বাপে তরে বিয়া দিল ক্যা?
কী করবো! এতডি বইন আমরা! আমি বেবাকতের বড়। আমার বিয়া না অইলে অন্যডির বিয়া অয় না।
এর লেইগা হতিনের সংসারে মাইয়া দিবো?
কুট্টি কথা বলল না। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল তারপর আনমনা হয়ে গেল।
রাজা মিয়ার মা বললেন, গরিব মাইনষের ঘরে মাইয়া না অওনঐ ভাল। তর অন্য বইনডির বিয়া অইছে?
দুইজনের অইছে।
আর আছে কয়জন?
অহনও দুইজন আছে।
তর বাপে করে কী?
শীতের দিনে লেপ তোশকের কাম করে। খরালিকালে কামলা খাডে।
এতে সংসার চলে?
না চলে না।
তয়?
খাইয়া না খাইয়া বাইচ্চা আছে মানুষটি।
এতডি মাইয়া না অইয়া দুই একটা পোলা অইলে কাম অইতো। জুয়ান পোলা থাকলে রুজি কইরা সংসার চালাইতো।
পোলার আশায়ই বলে এতডি মাইয়া জন্ম দিছে আমার মা বাপে। বুজছে পোলা অইবো, অইছে মাইয়া।
একটু থেমে রাজা মিয়ার মা বললেন, তুই তগো বাইত্তে যাচ না?
না।
ক্যা?
মা বাপে আমারে দেকতে পারে না। বাইত্তে গেলে ধুর ধুর কইরা খেদাইয়া দেয়।
কচ কী?
হ।
ক্যা, এমুন করে ক্যা?
ঐ যে জামাই বাইত থিকা পলাইয়া আইয়া পড়ছি, এর লেইগা।
খাইতে পরতে না দিলে আবি না?
খাইতেও দিবো না পরতেও দিবো না, তার উপরে হতিনের সংসার। ওহেনে মানুষ থাকে কেমতে! একখান কাপোড়ে আমি বচ্ছর কাডাইতে পারি বুজান, হতিনের গনজনা সইজ্জ করতে পারি, স্বামী আমার লাগে না, খালি একখান জিনিসের কষ্ট আমার। খিদা। খিদার কষ্ট আমি সইজ্জ করতে পারি না। পেড ভইরা খাওন পাইলে আমি আর কিছু চাই না। আমার মা বাপে এইডা বোজে না। হেরা মনে করে আমি তাগো মান ইজ্জত ধুলায় মিশাইয়া দিছি। কন তো বুজান, পেডে খিদা লইয়া মান ইজ্জত দেহন যায়নি!
